মধ্যপ্রাচ্যে ইরান ও ইসরায়েলের মধ্যকার সামরিক সংঘাতের জেরে বিশ্ব জ্বালানি বাজারে অস্থিরতা এবং দেশের অভ্যন্তরীণ অর্থনীতির দুর্বল সূচকগুলোর প্রভাবে রবিবার (১ মার্চ) বড় ধরনের ধসের মুখে পড়েছে বাংলাদেশের পুঁজিবাজার। সপ্তাহের প্রথম কার্যদিবসেই ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের (ডিএসই) প্রধান সূচক ডিএসইএক্স ১৩৮ পয়েন্ট বা প্রায় ২.৫ শতাংশ কমে ৫৪৬১ পয়েন্টে নেমে এসেছে। সূচকের পাশাপাশি শেয়ার কেনাবেচার পরিমাণও উল্লেখযোগ্য হারে কমেছে।
বাজার বিশ্লেষকরা বলছেন, একদিকে বিশ্ব রাজনীতিতে অস্থিরতা এবং অন্যদিকে দেশের বেসরকারি বিনিয়োগ ১১ বছরের সর্বনিম্নে নেমে আসার তথ্য বিনিয়োগকারীদের আত্মবিশ্বাসে বড় ধরনের ধাক্কা দিয়েছে।
রবিবার লেনদেনের শুরু থেকেই বাজারে তীব্র বিক্রয় চাপ দেখা যায়। ডিএসইতে লেনদেন হওয়া ৩৮৯টি সিকিউরিটিজের মধ্যে ৩৫৩টি বা ৯০ শতাংশেরই দাম কমেছে। বিপরীতে বেড়েছে মাত্র ৩০টির এবং অপরিবর্তিত ছিল ছয়টি প্রতিষ্ঠানের শেয়ার দর।
মৌলভিত্তি সম্পন্ন শেয়ারগুলোর দাম কমলেও দেউলিয়া পর্যায়ে যাওয়া কিছু ব্যাংক, এনবিএফআই এবং লোকসানি বন্ধ থাকা উৎপাদনমুখী কিছু কোম্পানির দর অস্বাভাবিক হারে বেড়েছে। মোট বিতরন করা ঋণের ৭৫ শতাংশ খেলাপি হওয়া সত্ত্বেও ন্যাশনাল ব্যাংকের শেয়ার দর বেশ কিছুদিন ধরেই বাড়ছে; রবিবারও ব্যাংকটির শেয়ার দর সর্বোচ্চ ১০ শতাংশ বেড়েছে। এছাড়া আমানতকারীদের অর্থ ফেরত দিতে ব্যর্থ হওয়া ও মূলধন ঘাটতিতে থাকা যে নয়টি ব্যাংকবহির্ভূত আর্থিক প্রতিষ্ঠান অবসায়ন ঝুঁকিতে রয়েছে, সেগুলোর সবকটির দরই ৫-১০ শতাংশ পর্যন্ত বেড়েছে।
সূচকের বড় পতনের দিনে লেনদেনের পরিমাণও আগের দিনের তুলনায় উল্লেখযোগ্য হারে কমেছে। রবিবার ডিএসইতে ৭৭৫ কোটি ৬০ লাখ টাকার শেয়ার হাতবদল হয়েছে, যা আগের কার্যদিবসের (৯৪৭ কোটি ২৮ লাখ টাকা) তুলনায় ১৮ শতাংশ কম।
পর্যালোচনায় দেখা যায়, সাম্প্রতিক সময়ে পুঁজিবাজারের সূচককে টেনে ধরে রাখতে ব্যাংক খাত প্রধান ভূমিকা পালন করেছিল। মূলত লভ্যাংশ ঘোষণার মৌসুম হওয়ায় বিনিয়োগকারীরা এই খাতে আগ্রহী ছিলেন। কিন্তু রবিবার দৃশ্যপট বদলে গেছে। সূচক কমাতে সবচেয়ে বেশি প্রভাব ফেলেছে ব্যাংক, বিমা এবং বড় মূলধনী কোম্পানিগুলো। লভ্যাংশ ঘোষণার সময় ঘনিয়ে আসলেও বর্তমান তারল্য সংকট এবং উচ্চ খেলাপি ঋণের আশঙ্কায় ব্যাংক খাতেও বড় দরপতন দেখা গেছে। বিশেষ করে আগে যে ব্যাংকগুলো সূচক বাড়াতে সহায়তা করেছিল, রবিবার সেগুলোর মুনাফা তোলার প্রবণতা বাজারকে আরও নিচের দিকে ঠেলে দিয়েছে।
বাজার বিশেষজ্ঞরা জানান, ইরান ও ইসরায়েলের সামরিক সংঘাত বাংলাদেশের মতো জ্বালানি আমদানিনির্ভর দেশের জন্য অশনিসংকেত। হরমোজ প্রণালি দিয়ে বিশ্বের ২০ শতাংশ তেল সরবরাহ হয়। এই পথ বাধাগ্রস্ত হলে তেলের দাম ব্যারেল প্রতি ১০০ ডলার ছাড়িয়ে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। এতে বাংলাদেশের আমদানি ব্যয় ও মূল্যস্ফীতি বেড়ে যাবে—এমন আতঙ্ক বিনিয়োগকারীদের মধ্যে ছড়িয়ে পড়েছে।
ইতিমধ্যেই ইরান হরমোজ প্রণালি বন্ধের ঘোষণা দিয়েছে। গোল্ডম্যান স্যাকস তাদের পূর্বাভাসে জানিয়েছে, এই প্রণালি বন্ধ থাকলে তেলের দাম ১২০ ডলার পর্যন্ত বেড়ে যেতে পারে। আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি তেলের দাম ব্যারেল প্রতি ৫ ডলার বাড়লে বাংলাদেশের আমদানি ব্যয় ৪০০-৫০০ মিলিয়ন ডলার বেড়ে যেতে পারে। দাম ১০০ ডলার ছাড়িয়ে গেলে এই বাড়তি ব্যয়ের বোঝা কয়েক বিলিয়ন ডলারে ঠেকবে। এর ফলে পণ্য পরিবহন, সেচ, উৎপাদন ও বিদ্যুতের ব্যয় বৃদ্ধি পেয়ে মূল্যস্ফীতি সাধারণ মানুষের দুর্ভোগ আরও বাড়িয়ে তুলবে।
তবে এর মধ্যেই সৌদি আরব, রাশিয়া এবং সংযুক্ত আরব আমিরাতসহ ওপেক প্লাসের আটটি দেশ অতিরিক্ত তেল উৎপাদনের ঘোষণা দিয়েছে। এসব দেশ আগামী এপ্রিল মাস থেকে দৈনিক ২ লাখ ৬ হাজার ব্যারেল তেল অতিরিক্ত উৎপাদনের সিদ্ধান্ত নিয়েছে।
পুঁজিবাজারে অস্থিরতার নেপথ্যে অভ্যন্তরীণ অর্থনৈতিক পরিস্থিতিও দায়ী। বিবিএস-এর তথ্যানুযায়ী, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে বেসরকারি বিনিয়োগ জিডিপির ২২.০৩ শতাংশে নেমে এসেছে, যা গত ১১ বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন। এর সাথে যুক্ত হয়েছে পুঁজিবাজার নিয়ন্ত্রক সংস্থা বিএসইসিতে সম্ভাব্য পরিবর্তনের গুঞ্জন। বর্তমান কমিশনের প্রতি আস্থার অভাব এবং সম্ভাব্য নতুন নেতৃত্বের নীতিমালা নিয়ে অস্পষ্টতা বাজারে অস্থিরতা বাড়াচ্ছে।
তবে এই যুদ্ধ দীর্ঘস্থায়ী হবে না বলে মনে করেন প্রাইম ব্যাংক সিকিউরিটিজের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা মো. মনিরুজ্জামান। তিনি ডিএসজে প্রতিবেদককে বলেন, “হরমোজ প্রণালি বন্ধ থাকলে জ্বালানি তেলের দাম উল্লেখযোগ্য হারে বেড়ে যাবে। এতে কারখানার উৎপাদন ব্যয় বাড়বে এবং এভিয়েশনসহ অনেক ব্যবসা ক্ষতির মুখে পড়বে। এমনকি মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোর প্রধান আয়ও সংকটে পড়বে। এসবের প্রভাব পুঁজিবাজারে তাৎক্ষণিকভাবে পড়েছে। যুদ্ধ দ্রুত বন্ধ হলে বাজার আবার ঘুরে দাঁড়াবে।”
রাজনৈতিক পটপরিবর্তন, অর্থনীতির শ্লথগতি এবং যুদ্ধের দামামা—সব মিলিয়ে এক অস্থির সময় পার করছে দেশের পুঁজিবাজার। বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, লভ্যাংশ ঘোষণার পর যদি বাজারে পর্যাপ্ত নগদ প্রবাহ না আসে, তবে মন্দাভাব দীর্ঘস্থায়ী হতে পারে।













