মার্কিন চুক্তিতে ঝুঁকি, ইউকে-তে সম্ভাবনা!

ডিএসজে কোলাজ
ডিএসজে কোলাজ

একদিকে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্প্রতি স্বাক্ষরিত বাণিজ্য চুক্তির নেতিবাচক অর্থনৈতিক প্রভাব নিয়ে সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) কঠোর সতর্কবার্তা, অন্যদিকে যুক্তরাজ্যের সঙ্গে গভীরতর বাণিজ্যিক সম্পর্ক তৈরির ইতিবাচক কূটনৈতিক সংবাদ। নতুন সরকারের অর্থনীতির জন্য মঙ্গলবার (১০ মার্চ) দিনটি ছিল এমনই বিপরীতমুখী পরিস্থিতির। দেশের সামষ্টিক অর্থনীতির এই সন্ধিক্ষণে সরকারি নীতি ও আন্তর্জাতিক সম্পর্কের সমীকরণ এখন নতুন আলোচনার জন্ম দিয়েছে।

রাজধানীর ধানমন্ডিতে আয়োজিত এক আলোচনা সভায় সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ জানিয়েছে, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে স্বাক্ষরিত ‘পারস্পরিক বাণিজ্য চুক্তি’-এর কারণে সরকার বছরে প্রায় এক হাজার ৩২৭ কোটি টাকার রাজস্ব হারাবে। সংস্থাটির নির্বাহী পরিচালক ড. ফাহমিদা খাতুন জানান, চুক্তির আওতায় যুক্তরাষ্ট্র থেকে সাড়ে চার হাজার পণ্য শুল্কমুক্ত সুবিধা পাবে এবং আগামী পাঁচ থেকে দশ বছরের মধ্যে আরও দুই হাজার ২১০টি পণ্যে শুল্ক ছাড় দিতে হবে।

বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার নীতির সঙ্গে এই চুক্তির অসামঞ্জস্যতা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে সিপিডি জানায়, এই শর্তের ফলে অন্যান্য সদস্য দেশগুলোকেও একই সুবিধা দিতে বাংলাদেশ বাধ্য হতে পারে, যা ভবিষ্যতের জন্য বড় ঝুঁকি তৈরি করবে। সভায় উপস্থিত সিপিডির সম্মানীয় ফেলো ড. মোস্তাফিজুর রহমান উল্লেখ করেন, বাণিজ্যকে অস্ত্র হিসেবে ব্যবহারের প্রবণতা বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থাকে দুর্বল করে দিচ্ছে এবং এই চুক্তির ভেতরের নেতিবাচক শর্তাবলি ও সার্বভৌমত্বের প্রশ্নটি গুরুত্বের সঙ্গে পুনর্মূল্যায়ন করা প্রয়োজন।

সিপিডির তথ্যমতে, বর্তমানে দেশের রাজস্ব কাঠামো বেশ চাপের মুখে রয়েছে। চলতি অর্থবছরের জানুয়ারি পর্যন্ত রাজস্ব আদায়ের প্রবৃদ্ধি লক্ষ্যমাত্রার তুলনায় অনেক কম। বাজেট ঘাটতি মেটাতে সরকার ব্যাংক খাত থেকে ইতিমধ্যে প্রায় ৬০ হাজার কোটি টাকা ঋণ নিয়েছে, যা বেসরকারি খাতের বিনিয়োগ প্রবাহকে সংকুচিত করছে। একইসঙ্গে বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচি বাস্তবায়নের হার গত ১৫ বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন পর্যায়ে নেমে আসায় সামষ্টিক অর্থনীতির স্থিতিশীলতা বজায় রাখা কঠিন হয়ে পড়েছে বলে সংস্থাটি সতর্ক করেছে।

অর্থনীতির এমন চাপের মুখে যখন অভ্যন্তরীণ প্রেক্ষাপট উদ্বেগজনক, তখন আন্তর্জাতিক অঙ্গনে নতুন মিত্রতা খোঁজার প্রয়াস চালাচ্ছে সরকার। একই দিনে পাওয়া বার্তার বরাত দিয়ে বাংলাদেশ সংবাদ সংস্থা (বাসস) জানিয়েছে, লন্ডনে বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. খলিলুর রহমান এবং প্রধানমন্ত্রীর পররাষ্ট্র বিষয়ক উপদেষ্টা হুমায়ুন কবীরের সঙ্গে যুক্তরাজ্যের বাণিজ্য বিষয়ক প্রতিমন্ত্রী ক্রিস ব্রায়ান্টের দ্বিপাক্ষিক বৈঠকে নতুন অনেক সম্ভাবনার দুয়ার উন্মোচিত হয়েছে।

বৈঠকে দুই দেশ বাণিজ্য ও বিনিয়োগ সম্পর্ক আরও গভীর করার বিষয়ে ঐকমত্যে পৌঁছেছে। আলোচনায় বাংলাদেশের সুনীল অর্থনীতিতে বিনিয়োগের সুযোগ, ‘বাংলাদেশে তৈরি’ বা ‘মেইড ইন বাংলাদেশ’ ব্র্যান্ডকে আন্তর্জাতিকভাবে বিস্তৃত করা এবং শিক্ষাক্ষেত্রে সহযোগিতা বাড়ানোর বিষয়টি প্রাধান্য পেয়েছে।

যুক্তরাজ্যের বাণিজ্য দূত ব্যারোনেস রোজি উইন্টারটনের সঙ্গে বৈঠকে বাংলাদেশ প্রতিনিধি দল বিমান চলাচল খাতে সহযোগিতা বৃদ্ধির সম্ভাবনা এবং বাংলাদেশকে আঞ্চলিক বিমান চলাচল কেন্দ্র বা এভিয়েশন হাব হিসেবে গড়ে তোলার প্রস্তাব নিয়ে আলোচনা করেছে। বহুপাক্ষিক ফোরামে দুই দেশের বিদ্যমান সহযোগিতার ওপর সন্তোষ প্রকাশ করে আগামীতে অংশীদারিত্ব আরও শক্তিশালী করার প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছে।

একই দিনে প্রাপ্ত এই দুই খবর সরকারের সামনে এক কঠিন চ্যালেঞ্জ ও সম্ভাবনার রূপরেখা তুলে ধরছে। একদিকে সিপিডির সতর্কবার্তা বলছে, রাজস্ব ঘাটতি কমাতে এবং মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে উচ্চাভিলাষী পরিকল্পনা থেকে সরে এসে বাস্তবসম্মত নীতি গ্রহণ জরুরি। অন্যদিকে যুক্তরাজ্যের সঙ্গে নতুন অর্থনৈতিক সম্পর্ক তৈরির সুযোগকে সরকার যদি যথাযথভাবে কাজে লাগাতে পারে, তবে তা দীর্ঘমেয়াদে অর্থনীতির জন্য স্বস্তির কারণ হতে পারে।

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অর্থনীতি বিশ্লেষকদের ভাষ্য অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে হওয়া চুক্তির আর্থিক ঝুঁকিগুলো পুনর্বিবেচনা করা এবং একইসঙ্গে যুক্তরাজ্যের মতো মিত্রদের সঙ্গে বিনিয়োগ ও বাণিজ্য বাড়াতে পারলে তবেই অর্থনৈতিক সংকট কাটিয়ে ওঠা সম্ভব হবে। নতুন সরকারের সামনে এখন বড় চ্যালেঞ্জ—বিদেশের বাজারে বাণিজ্যের নতুন দরজা খোলা রাখা এবং অভ্যন্তরীণ রাজস্ব ব্যবস্থাপনায় কঠোর শৃঙ্খলা বজায় রাখা।

Share this article

আপনারা চাইলে কাস্টম বিজ্ঞাপন এইখানে দিতে পারেন
বিজ্ঞাপনের ছবি বা ভিডিও সাইজ ৩৩৬x২৮০ পিক্সাল হতে হবে

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Scroll to Top