মূলধন প্রত্যাবাসন সহজ করল বাংলাদেশ

ডিএসজে
ডিএসজে

বাংলাদেশে বিদেশি বিনিয়োগকারীদের মুনাফা ও মূলধন নিজ দেশে ফেরত নেওয়ার (ক্যাপিটাল রিপ্যাট্রিয়েশন) প্রক্রিয়া আরও সহজ ও গতিশীল করতে বড় ধরনের সংস্কার এনেছে বাংলাদেশ ব্যাংক। তালিকাভুক্ত নয় এমন প্রাইভেট ও পাবলিক লিমিটেড কোম্পানিতে অনিবাসী বিনিয়োগকারীদের শেয়ার হস্তান্তর ও বিক্রয়লব্ধ অর্থ প্রত্যাবাসনের বিদ্যমান সব নির্দেশনা একীভূত করে একটি সমন্বিত ‘মাস্টার সার্কুলার’ জারি করা হয়েছে।

এর ফলে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের অনুমতি ছাড়াই শেয়ার বিক্রি করে ১০০ কোটি টাকা পর্যন্ত মূলধন ফেরত নিতে পারবেন অনিবাসীরা। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের বিদেশি মুদ্রা বিনিয়োগ বিভাগ থেকে জারিকৃত এই নতুন নির্দেশনাটি ২০১৮ সালের ৬ মে এবং ২০২০ সালের ১৮ জুনের পূর্ববর্তী সার্কুলারগুলোকে প্রতিস্থাপন করবে। এর মাধ্যমে মূলত বিদেশি বিনিয়োগকারীদের জন্য নিয়ন্ত্রক কাঠামো উদার করা এবং মূলধন বহির্গমন প্রক্রিয়াকে আমলাতান্ত্রিক জটিলতামুক্ত করার একটি মাইলফলক পদক্ষেপ নেওয়া হলো।

আগে অনিবাসী বিনিয়োগকারীদের শেয়ার বিক্রির অর্থ প্রত্যাবাসনে অধিকাংশ ক্ষেত্রেই বাংলাদেশ ব্যাংকের পূর্বানুমোদনের প্রয়োজন হতো। ২০২০ সালের সার্কুলার অনুযায়ী এডি (অথরাইজড ডিলার) ব্যাংকগুলো সর্বোচ্চ ১০ কোটি টাকা পর্যন্ত অনুমোদনের ক্ষমতা রাখত। নতুন নির্দেশনায় এই সীমা ১০ গুণ বাড়িয়ে ১০০ কোটি টাকা করা হয়েছে। এখন থেকে স্বাধীন মূল্য নির্ধারক দ্বারা নির্ধারিত ন্যায্য মূল্য থাকলে এডি ব্যাংকগুলো নিজস্বভাবে ১০০ কোটি টাকা পর্যন্ত অর্থ প্রত্যাবাসনের অনুমোদন দিতে পারবে।

এছাড়া, সর্বশেষ নিরীক্ষিত আর্থিক বিবরণীর ভিত্তিতে নির্ধারিত নিট অ্যাসেট ভ্যালু (এনএভি) অতিক্রম না করলে লেনদেনের পরিমাণ ১০০ কোটির বেশি হলেও এডি ব্যাংকগুলোই প্রত্যাবাসন সম্পন্ন করতে পারবে। ছোট বিনিয়োগকারীদের জন্য প্রক্রিয়াটি আরও সহজ করা হয়েছে; এক কোটি টাকা পর্যন্ত লেনদেনের ক্ষেত্রে এখন থেকে কোনো স্বাধীন মূল্যায়ন প্রতিবেদনের প্রয়োজন হবে না।

ব্যাংক পর্যায়ে অনুমোদন প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা ও সুশাসন নিশ্চিত করতে সার্কুলারে বিশেষ অভ্যন্তরীণ কমিটি গঠনের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। ছোট লেনদেনের ক্ষেত্রে ব্যাংকের প্রধান আর্থিক কর্মকর্তা এবং ১০০ কোটি টাকা পর্যন্ত লেনদেনের ক্ষেত্রে প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তার নেতৃত্বে এই কমিটি গঠিত হবে। কমিটিতে প্রধান অর্থ কর্মকর্তার (সিএফও) মতো পেশাদার সনদধারী সদস্য থাকা বাধ্যতামূলক করা হয়েছে, যারা মূল্যায়ন প্রতিবেদন যাচাই করে চূড়ান্ত অনুমোদন দেবেন। ব্যাংকগুলো গ্রাহকের সঙ্গে আলোচনার ভিত্তিতে এই মূল্যায়নের জন্য যুক্তিসঙ্গত ফি আদায় করতে পারবে।

নতুন নির্দেশনায় মূল্যায়ন পদ্ধতিকে আন্তর্জাতিক মূল্যায়ন মানদণ্ড (আইভিএস) ২০২৫-এর সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ করা হয়েছে। এতে তিনটি নির্দিষ্ট পদ্ধতি—নিট অ্যাসেট ভ্যালু পদ্ধতি, মার্কেট অ্যাপ্রোচ এবং ডিসকাউন্টেড ক্যাশ ফ্লো (ডিসিএফ) পদ্ধতির বিস্তারিত গাইডলাইন দেওয়া হয়েছে। স্বচ্ছতা নিশ্চিতে বলা হয়েছে, মূল্যায়নের জন্য ব্যবহৃত আর্থিক বিবরণী সমঝোতা স্মারক (এমওইউ) স্বাক্ষরের তারিখ থেকে ৬ মাসের বেশি পুরোনো হতে পারবে না। প্রয়োজনে কোম্পানিকে মধ্যবর্তী সময়ের নতুন নিরীক্ষিত বিবরণী প্রস্তুত করতে হবে।

নির্দেশনায় লেনদেনের সময় কমিয়ে আনতে সময়সীমা বেঁধে দিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক। কোনো অসংগতি না থাকলে এডি ব্যাংকগুলোকে ৫ কর্মদিবসের মধ্যে অর্থ প্রত্যাবাসন সম্পন্ন করতে হবে। আর যদি কেন্দ্রীয় ব্যাংকের অনুমোদনের প্রয়োজন হয়, তবে আবেদন পাওয়ার ৩ কর্মদিবসের মধ্যে তা পাঠাতে হবে। সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরের তারিখ বা কেন্দ্রীয় ব্যাংকের অনুমোদনের তারিখ থেকে ৪৫ দিনের মধ্যে শেয়ার হস্তান্তর প্রক্রিয়া সম্পন্ন করা বাধ্যতামূলক। এডি ব্যাংক পর্যায়ে সম্পন্ন হওয়া সব লেনদেনের প্রতিবেদন পরবর্তী ১৪ দিনের মধ্যে বাংলাদেশ ব্যাংকে জমা দিতে হবে।

বিশ্লেষকরা মনে করছেন, বাংলাদেশ ব্যাংকের এই মাস্টার সার্কুলার বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ তৈরির চলমান প্রচেষ্টারই প্রতিফলন। মূলধন প্রত্যাবাসনের সময় ও ব্যয় কমানোর মাধ্যমে বিদেশি বিনিয়োগকারীদের আস্থা বাড়বে। এটি বাংলাদেশকে সরাসরি বিদেশি বিনিয়োগের জন্য একটি প্রতিযোগিতামূলক ও উদার গন্তব্য হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করতে সহায়ক হবে।

Share this article

আপনারা চাইলে কাস্টম বিজ্ঞাপন এইখানে দিতে পারেন
বিজ্ঞাপনের ছবি বা ভিডিও সাইজ ৩৩৬x২৮০ পিক্সাল হতে হবে

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Scroll to Top