মোস্তাকুর রহমান: ঋণগ্রহীতা থেকে ঋণদাতার নিয়ন্ত্রক

ডিএসজে কোলাজ
ডিএসজে কোলাজ

দেশের ইতিহাসে প্রথমবারের মতো সরাসরি কোনো ব্যবসায়ীর হাতে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কমান্ড তুলে দেওয়া হলো। বাংলাদেশ ব্যাংকের ১৪তম গভর্নর হিসেবে নিয়োগ পেয়েছেন ব্যবসায়ী মো. মোস্তাকুর রহমান। একই সঙ্গে বাতিল করা হয়েছে বর্তমান গভর্নর ড. আহসান এইচ মনসুরের চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ। বুধবার (২৫ ফেব্রুয়ারি) অর্থ মন্ত্রণালয়ের আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগ থেকে এই সংক্রান্ত প্রজ্ঞাপন জারি করা হয়েছে।

দুপুরে অপসারণের খবর ছড়িয়ে পড়ার পর কোনো আনুষ্ঠানিক বক্তব্য ছাড়াই কেন্দ্রীয় ব্যাংক ত্যাগ করেন ড. আহসান এইচ মনসুর। কার্যালয় ছেড়ে যাওয়ার সময় সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে তিনি শুধু বলেন, “আমি পদত্যাগ করিনি, তবে খবরে শুনেছি আমি নেই।” সকালে স্বাভাবিক কর্মসূচিতে যোগ দিলেও অপসারণের খবর প্রচার হওয়ার পর তিনি সহকর্মীদের সঙ্গে কোনো আনুষ্ঠানিক বিদায় না নিয়েই আকস্মিক অফিস ত্যাগ করেন। ৫ আগস্টের পটপরিবর্তনের পর গত ১৩ আগস্ট তাঁকে নিয়োগ দেওয়া হয়েছিল।

নতুন গভর্নর মোস্তাকুর রহমান পেশায় একজন চার্টার্ড ম্যানেজমেন্ট অ্যাকাউন্ট্যান্ট (এফসিএমএ) এবং পোশাক খাতের ব্যবসায়ী। তিনি তৈরি পোশাক রপ্তানিকারকদের সংগঠন বিজিএমইএ-র সদস্য এবং ‘হেরা সোয়েটার্স’-এর ব্যবস্থাপনা পরিচালক। এ ছাড়া তিনি পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত কোম্পানি ‘ইনটেক অনলাইন’-এর একজন উদ্যোক্তা।

নিয়োগ পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই নতুন গভর্নরকে ঘিরে বড় ধরনের বিতর্কের তথ্য সামনে এসেছে। জানা গেছে, মিউচুয়াল ট্রাস্ট ব্যাংকে মোস্তাকুর রহমানের মালিকানাধীন হেরা সোয়েটার্সের ৮৯.০২ কোটি টাকার ঋণ রয়েছে। আরও উদ্বেগের বিষয় হলো, এই ঋণটি সম্প্রতি বিশেষ নীতি সহায়তার আওতায় ‘খেলাপি মুক্ত’ করা হয়েছে। একজন ঋণগ্রহীতা যখন ঋণদাতাদের নিয়ন্ত্রক সংস্থার (রেগুলেটর) প্রধান হন, তখন সেখানে ‘স্বার্থের সংঘাত’ তৈরি হবে কি না—তা নিয়ে ব্যাংকিং খাতে তীব্র আলোচনা শুরু হয়েছে।

এতদিন পর্যন্ত কেন্দ্রীয় ব্যাংকের গভর্নর হিসেবে অর্থনীতিবিদ, আমলা বা পেশাদার ব্যাংকারদেরই দেখা গেছে। এই প্রথম একজন সরাসরি ‘ম্যানুফ্যাকচারার’ বা ব্যবসায়ীকে এই পদে বসানো হলো। বিজিএমইএ-র মতো শক্তিশালী লবি গ্রুপের একজন সদস্য গভর্নর হওয়ায় নীতি নির্ধারণে ব্যবসায়ীদের প্রভাব আরও বাড়বে বলে আশঙ্কা করছেন সংশ্লিষ্টরা। বিশেষ করে নিজের প্রতিষ্ঠানের বড় অঙ্কের ঋণ এবং তা ‘পুনঃতফসিল’ করার বিষয়টি তাঁর নিরপেক্ষতাকে শুরুতেই প্রশ্নের মুখে দাঁড় করিয়েছে।

কেন্দ্রীয় ব্যাংকের গভর্নর হিসেবে সাধারণত অর্থনীতিবিদ বা ক্যারিয়ার ব্যাংকারদেরই দেখা যায়। তবে মোস্তাকুর রহমানের মতো সরাসরি করপোরেট জগৎ বা ব্যবসায়িক ব্যাকগ্রাউন্ড থেকে গভর্নর হওয়ার উদাহরণ বিশ্বে বিরল হলেও একদম নেই তা নয়। যদিও অধিকাংশ ক্ষেত্রেই তা তীব্র বিতর্কের জন্ম দিয়েছে।

যুক্তরাষ্ট্রের বর্তমান ফেডারেল রিজার্ভ চেয়ারম্যান প্রথাগত অর্থনীতিবিদ নন। তিনি দীর্ঘ সময় ‘দ্য কার্লাইল গ্রুপ’-এর মতো বিখ্যাত প্রাইভেট ইকুইটি ফার্মের পার্টনার ও ব্যবসায়ী ছিলেন। তবে পাওয়েল সরাসরি কোনো উৎপাদনমুখী শিল্পের (যেমন সোয়েটার বা পোশাক খাত) মালিক ছিলেন না এবং তাঁর নিয়োগের আগে কোনো বড় ঋণ বিতর্কের খবর ছিল না।

আইসল্যান্ডের সাবেক গভর্নর ডেভিড অডসন একজন লেখক ও ব্যবসায়ী ছিলেন। আইসল্যান্ডের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালনের পর কেন্দ্রীয় ব্যাংকের গভর্নর হন তিনি। কিন্তু ২০০৮ সালের বিশ্বমন্দার সময় তাঁর অদূরদর্শী সিদ্ধান্তের কারণে আইসল্যান্ডের ব্যাংকিং ব্যবস্থা ধসে পড়ে, যা আজও অর্থনীতির ইতিহাসে একটি বড় উদাহরণ।

তুরস্কের হাফিজ গায়ে এরকান গোল্ডম্যান স্যাকস ও ফার্স্ট রিপাবলিক ব্যাংকের মতো বড় করপোরেট প্রতিষ্ঠান থেকে সরাসরি তুরস্কের কেন্দ্রীয় ব্যাংকে আসেন। যদিও তিনি পেশাদার ব্যাংকার ছিলেন, কিন্তু করপোরেট জগতের সঙ্গে অতি-ঘনিষ্ঠতার অভিযোগে তাঁকে নিয়ে রাজনৈতিক বিতর্ক ছিল এবং শেষ পর্যন্ত তিনি পদত্যাগ করতে বাধ্য হন।

জোসে সিনসন ফিলিপাইনের বড় একটি বীমা কোম্পানির সিইও ও ব্যবসায়ী ছিলেন। ফিলিপাইনের কেন্দ্রীয় ব্যাংকের গভর্নর হিসেবে তিনি সফল হলেও তাঁর ব্যবসায়িক সংশ্লিষ্টতা নিয়ে তৎকালীন সময়ে বিরোধীরা তীব্র সমালোচনা করেছিলেন।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের এক কর্মকর্তা ডিএসজে প্রতিবেদককে বলেন, “একজন সরাসরি ব্যবসায়ী যখন কেন্দ্রীয় ব্যাংকের প্রধান হন, তখন ‘কনফ্লিক্ট অব ইন্টারেস্ট’ বা স্বার্থের সংঘাত কিছু ক্ষেত্রে বড় ঝুঁকি তৈরি করে। যেহেতু নতুন গভর্নর নিজেই একজন বড় ঋণগ্রহীতা, তাই তাঁর অধীনে খেলাপি ঋণ আদায়ে কঠোরতা বজায় রাখা নৈতিকভাবে চ্যালেঞ্জিং হয়ে পড়তে পারে।”

মুদ্রানীতি বা ব্যাংক একীভূতকরণের মতো সিদ্ধান্তগুলো কি সাধারণ মানুষের স্বার্থে হবে, নাকি বড় ব্যবসায়ী গোষ্ঠীর স্বার্থে—সেই প্রশ্ন থেকেই যায়। এ ছাড়া বিজিএমইএ-র মতো শক্তিশালী সংগঠনের একজন সদস্য যখন রেগুলেটর হন, তখন ব্যাংকিং খাতের চেয়ে পোশাক খাত বেশি সুবিধা পাবে কি না, সেই শঙ্কা অমূলক নয়।

১৯৬৬ সালে ঢাকায় জন্ম নেওয়া মোস্তাকুর রহমান ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের হিসাববিজ্ঞান বিভাগ থেকে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর সম্পন্ন করেন। তিনি ইনস্টিটিউট অব কস্ট অ্যান্ড ম্যানেজমেন্ট অ্যাকাউন্ট্যান্টস অব বাংলাদেশ (আইসিএমএবি) থেকে এফসিএমএ ডিগ্রিধারী।

তিন দশকেরও বেশি সময় ধরে করপোরেট ফিন্যান্স, আর্থিক ব্যবস্থাপনা এবং প্রাতিষ্ঠানিক সুশাসন নিয়ে কাজ করছেন তিনি। ব্যবসায়ী হিসেবে তৈরি পোশাক ছাড়াও আবাসন ও ট্রাভেল খাতে তাঁর ব্যবসায়িক সম্পৃক্ততা রয়েছে। তিনি ব্যবসায়ীদের শীর্ষ সংগঠন বিজিএমইএ, রিহ্যাব, আটাব এবং ঢাকা চেম্বারের সক্রিয় সদস্য। এ ছাড়া চট্টগ্রাম স্টক এক্সচেঞ্জেও (সিএসই) তাঁর কাজের অভিজ্ঞতা রয়েছে।

অর্থ মন্ত্রণালয় থেকে বুধবার (২৫ ফেব্রুয়ারি) জারি করা প্রজ্ঞাপনে বলা হয়েছে, বাংলাদেশ ব্যাংক আদেশ ১৯৭২-এর ১০(৫) ধারা অনুযায়ী তাঁকে ৪ বছরের জন্য নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। এই পদে যোগদানের আগে তাঁকে অন্যান্য সকল ব্যবসা ও সংগঠনের সঙ্গে কর্ম-সম্পর্ক ত্যাগ করতে হবে। তাঁর বেতন ও অন্যান্য সুযোগ-সুবিধা সরকারের সঙ্গে সম্পাদিত চুক্তি অনুযায়ী নির্ধারিত হবে।

বিশ্বের উন্নত দেশগুলোতে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের স্বাধীনতা রক্ষায় ব্যবসায়ী বা সরাসরি দলীয় রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত ব্যক্তিদের এই পদ থেকে দূরে রাখা হয়। বাংলাদেশের এই পরীক্ষা-নিরীক্ষা দেশের টালমাটাল ব্যাংক খাতকে কোন দিকে নিয়ে যায়, সেটিই এখন দেখার বিষয়।

Share this article

আপনারা চাইলে কাস্টম বিজ্ঞাপন এইখানে দিতে পারেন
বিজ্ঞাপনের ছবি বা ভিডিও সাইজ ৩৩৬x২৮০ পিক্সাল হতে হবে

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Scroll to Top