মূল্যস্ফীতি বনাম নীতিসুদ: বিপদে ব্যবসায়ীরা, গভর্নর অবিচল

ডিএসজে কোলাজ
ডিএসজে কোলাজ

মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কঠোর মুদ্রানীতি ও টানা সুদহার বৃদ্ধির কারণে ব্যবসায়ীরা যখন চরম সংকটে আছেন বলে দাবি করছেন, তখনও গভর্নর আহসান এইচ মনসুরের বার্তা স্পষ্ট; প্রথমে দাম নিয়ন্ত্রণ, পরে সুদে ছাড়। ব্যবসায়ীদের তিনি জানিয়ে দিয়েছেন, যদি চলতি অর্থবছরের মধ্যে মূল্যস্ফীতি ৫ শতাংশে নামিয়ে আনা যায়, তখনই নীতি সুদ ধাপে ধাপে কমানো হবে।

গত সপ্তাহে (৪ ডিসেম্বর) ঢাকায় বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (বিডা) আয়োজিত স্থানীয় অংশীজনদের সঙ্গে বিনিয়োগ সংলাপে ব্যবসায়ী প্রতিনিধি ও বাংলাদেশ ব্যাংক গভর্নরের এ বিষয়ক কথোপকথনের মধ্যেই পরিসংখ্যান ব্যুরো (বিবিএস) জানিয়েছে, মাত্র এক মাসের ব্যবধানে মূল্যস্ফীতি আবারও ঊর্ধ্বমুখী হয়েছে। অক্টোবর মাসে যা বিগত ৩৯ মাসের মধ্যে সর্বনিম্ন ৮.১৭ শতাংশে নেমেছিল, নভেম্বরে তা বেড়ে ৮.২৯ শতাংশে উঠেছে।

বিবিএসের রোববার (৭ ডিসেম্বর) প্রকাশিত মাসিক ভোক্তা মূল্যসূচকে (সিপিআই) আরও জানানো হয়েছে, ২০২৪ সালের নভেম্বরে এ হার ছিল ১১.৩৮ শতাংশ। চলতি বছরের নভেম্বরে খাদ্যপণ্যের দাম আবারও চাপ সৃষ্টি করেছে, আর মজুরি বৃদ্ধির হার সেই চাপ সামলাতে পারছে না। এই চাপ গ্রামাঞ্চলের তুলনায় শহরে বেশি।

বিবিএসের তথ্যে প্রকাশ, এক মাসের ব্যবধানে খাদ্যপণ্যে মূল্যস্ফীতি বেড়ে হয়েছে ৭.৩৬ শতাংশ, যা অক্টোবর মাসে ছিল ৭.০৮ শতাংশ। টানা দুই মাস ধরে খাদ্য মূল্যস্ফীতি ঊর্ধ্বমুখী। তবে গত বছরের নভেম্বরে খাদ্য মূল্যস্ফীতি ছিল ১৩.৮০ শতাংশ—অর্থাৎ বছরান্তরে খাদ্যখাতে চাপ কিছুটা কমেছে। নভেম্বরে খাদ্যবহির্ভূত পণ্য ও সেবায় মূল্যস্ফীতি সামান্য কমে দাঁড়িয়েছে ৯.০৮ শতাংশে; অক্টোবর মাসে এ হার ছিল ৯.১৩ শতাংশ। গত বছরের একই সময়ে তা ছিল ৯.৩৯ শতাংশ।

নভেম্বর মাসে গ্রামাঞ্চলে গড় মূল্যস্ফীতি বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৮.২৬ শতাংশে, যা অক্টোবর মাসে ছিল ৮.১৬ শতাংশ। আর শহরে গড় মূল্যস্ফীতি অক্টোবর মাসের ৮.৩৩ শতাংশ থেকে বেড়ে নভেম্বরে ৮.৩৯ শতাংশ হয়েছে। শহর এবং গ্রামে খাদ্য মূল্যস্ফীতি বাড়লেও খাদ্যবহির্ভূত পণ্যের মূল্যস্ফীতি কমেছে। সার্বিক মূল্যস্ফীতির হার যেখানে ৮.২৯ শতাংশ, সেখানে নভেম্বরে মজুরি বৃদ্ধির হার ছিল ৮.০৪ শতাংশ। এর অর্থ, জীবনের ব্যয় যে হারে বাড়ছে, মানুষের আয় সেভাবে বাড়ছে না।

সবমিলিয়ে সার্বিক মূল্যস্ফীতি গত বছরের চেয়ে কিছুটা কমলেও তিন বছর ধরে উচ্চ মূল্যস্ফীতি দেশের অর্থনীতির বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে আছে। এই বাস্তবতায় সামাজিক ও রাজনৈতিক চাপ বিবেচনায় রেখে গভর্নর আহসান এইচ. মনসুর ধারাবাহিকভাবে বাজারকে দৃঢ় সংকেত দেওয়ার চেষ্টা করে আসছেন। ২০২৪ সালের আগস্টে শেখ হাসিনা নেতৃত্বাধীন আওয়ামী লীগ সরকার পতনের পর গভর্নরের দায়িত্ব গ্রহণ করে প্রথম দিন থেকেই নিজের অগ্রাধিকার স্পষ্ট করেছিলেন এই অর্থনীতিবিদ। তখন থেকেই তিনি বারবার মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ ও বিনিময়হার স্থিতিশীল করতে নীতিগত দৃঢ়তা ও বাজারভিত্তিক ব্যবস্থাপনার কথা বলে আসছেন।

রাজনৈতিক অস্থিরতার প্রভাবে ২০২৪ সালের মাঝামাঝি মূল্যস্ফীতি ১১ শতাংশ ছাড়িয়ে গেলে মনসুর সতর্ক করে বলেছিলেন, কঠোর নীতি ছাড়া পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ করা যাবে না। তিনি মুদ্রানীতি কড়াকড়ি রাখার প্রয়োজনীয়তায় জোর দিয়েছিলেন। পরবর্তীতে অক্টোবর মাসে মূল্যস্ফীতি নেমে ৮.১৭ শতাংশে আসার পর তিনি বলেছিলেন, “যদি এই ধারা অব্যাহত থাকে, আমরা ৫ শতাংশে নামাতে পারব।”

এই প্রেক্ষাপটে দাঁড়িয়ে মূল্যস্ফীতির লাগাম টানতে যে পর্যায়ে সুদহার নেওয়া হয়েছে তা ব্যবসায়ীরা আর ‘সইতে পারছেন না’ বলে মন্তব্য করেছেন এপেক্স গ্রুপের এমডি সৈয়দ নাসিম মঞ্জুর। বিনিয়োগ সংলাপে গভর্নরকে উদ্দেশ্য করে তিনি বলেন, “আপনার কাছে একটা বিনীত নিবেদন: বিজনেস পিপলরা এই ইন্টারেস্ট সইতে পারছে না। আমাদের জন্য অসম্ভব হয়ে যাচ্ছে।”

নাসিম আরও বলেন, “স্যার, আমরা সুদের হারের বিপক্ষে না। তবে এখন ব্যবসা করা ভেরি ভেরি ডিফিকাল্ট এবং এই ইন্টারেস্ট রেটটা কীভাবে কমানো যায়। বিশেষ করে আমাদের প্রতিদ্বন্দ্বী দুই দেশ—ভিয়েতনাম এবং ইন্ডিয়া—তাদের সঙ্গে আমরা পারছি না। এই কস্ট অব ক্যাপিটাল ফর ম্যানুফ্যাকচারিং, লং টার্ম, শর্ট টার্ম কীভাবে কমানো যায়।”

জবাবে মনসুর নীতিগত ধারাবাহিকতা বজায় রাখার ওপর জোর দেন। “মূল্যস্ফীতি ৮ বা সাড়ে ৭-এর নিচে এলে সুদের হার সিঙ্গেল ডিজিটে নামতে পারে,” উল্লেখ করে তিনি বলেন, “তো এইটার জন্য আমাদের একটু ধৈর্য ধরতে হবে। হঠাৎ করে প্রশাসনিকভাবে কিছু করাটা খুব মারাত্মক নীতির বিপর্যয় হয়ে যাবে এবং সেটা করা উচিত নয়। দরকার হলে ছয় মাস অপেক্ষা করব আমরা, কিন্তু টেকসইভাবে এটাকে নামিয়ে আনব।”

তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, অগ্রাধিকার হলো মূল্যস্ফীতি স্থিতিশীল করা এবং ইতিবাচক প্রকৃত সুদের হার নিশ্চিত করা—অর্থাৎ প্রথমে দাম নিয়ন্ত্রণ, পরে আর্থিক শিথিলতা। তিনি বলেন, “অতীতে প্রকৃত সুদহার (রিয়েল ইন্টারেস্ট রেট) নেগেটিভ ছিল, যা বাজার অস্থিরতার কারণ হয়ে দাঁড়ায়। এখন সুদহার বাড়ায় বাজার স্থিতিশীল হয়েছে এবং মুদ্রার বিনিময়হারও স্থিতিশীল।”

কঠোর নীতি ছাড়া পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ করা যাবে না বলেই মনে করেন গভর্নর। তাঁর আশা, অর্থবছরের শেষ নাগাদ মূল্যস্ফীতি ৫-এর নিচে নেমে আসবে। টেকসইভাবে তা ৪ বা ৩ শতাংশেও নামানো সম্ভব। ব্যবসায়ীদের অন্য দেশের সুদের হারের সঙ্গে তাদের মূল্যস্ফীতিও বিবেচনায় নেওয়ার পরামর্শ দিয়ে তিনি বলেন, “আমাদের ইনফ্লেশন টার্গেট যদি ভারতের সঙ্গে তুলনা করি, চীনের সঙ্গে তুলনা করি; তাদের ইনফ্লেশনটা কতখানি? ৩, ৪, ১, ০ বা নেগেটিভ। চীনে নেগেটিভ; জাপানে নেগেটিভ হয়, মাঝে মাঝে একটু পজিটিভ হয়; ভারতে হচ্ছে দুই থেকে তিন শতাংশের মতো। আমাদের এখনো ৮। এখানে আমাকে কাজ করতে হবে।”

শুরু থেকেই মনসুরের বক্তব্য নীতিগতভাবে ধারাবাহিক ও বাজারমুখী। আন্তর্জাতিক বিনিয়োগকারীদের জন্য এটি ইতিবাচক সংকেত যে বাংলাদেশ মুদ্রানীতিতে ধারাবাহিকতা বজায় রাখতে চায়। তবু বাস্তব চ্যালেঞ্জগুলো সহজ নয়। খাদ্যপণ্যের ওঠানামা, মজুরি‑বৃদ্ধির ধীরগতি বা রাজনৈতিক কারণে লক্ষ্য পিছিয়ে যাওয়ার শঙ্কা রয়েছে। যদি খাদ্যমূল্য আবার দ্রুত বাড়ে, তাহলে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কড়া নীতিও সীমিত প্রভাব ফেলবে এবং সামাজিক চাপ বাড়বে বলে মনে করছেন বাজার সংশ্লিষ্টরা।

বছর কয়েক ধরে বাড়তে থাকা মূল্যস্ফীতির হার ২০২৪ সালের জুলাইয়ে উঠেছিল ১১.৬৬ শতাংশে। মূল্যস্ফীতির হারে লাগাম টানতে বাংলাদেশ ব্যাংক আওয়ামী লীগ সরকারের আগে থেকেই নীতি সুদহার বাড়িয়ে আসছিল। সরকার বদলের পর দায়িত্বে আসা নতুন গভর্নর আহসান এইচ. মনসুরও তা অব্যাহত রেখেছেন; টানা বাড়ানো হয়েছে নীতি সুদহার।

প্রসঙ্গত, বাংলাদেশে কেন্দ্রীয় ব্যাংক দুটি নীতিগত সুদের হার নিয়ন্ত্রণ করে। যার একটিকে রেপো রেট (রিপারচেজ রেট) বলা হয়, যা ব্যাংকিং ব্যবস্থায় অর্থ সরবরাহের জন্য ব্যবহার করা হয়; এবং অপরটি হচ্ছে রিভার্স রেপো রেট।

কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশে নীতিসুদের হার ২০০৮ থেকে ২০২৫ পর্যন্ত গড়ে ৬.৯১ শতাংশ ছিল। এর মধ্যে সর্বনিম্ন ৪.৫০ শতাংশ ছিল ২০০৯ সালের অক্টোবর মাসে। ২০২২ সালের ফেব্রুয়ারিতে রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ শুরুর পর বিশ্বব্যাপী মুদ্রাস্ফীতি বাড়ার প্রেক্ষিতে থেকে বাংলাদেশ ব্যাংক ধাপে ধাপে সুদ বৃদ্ধির চক্রে প্রবেশ করে।

আওয়ামী লীগ সরকার সর্বশেষ ২০২৪ সালের মে মাসে এই হার ৮ শতাংশ থেকে বাড়িয়ে ৮.৫ শতাংশ করে, ২০২২ সালের মে মাসে যা ছিল ৫ শতাংশ। অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর আগস্টে সুদের হার বাড়িয়ে ৯ শতাংশ, সেপ্টেম্বরে ৯.৫ শতাংশ এবং অক্টোবরে ১০ শতাংশ করা হয়। এরপর ১৩ মাস কেটে গেছে।

উচ্চ মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে অন্তর্বর্তী সরকার সুদের হার বাড়ানোর পাশাপাশি বাজার ব্যবস্থাপনায় কিছু পদক্ষেপ নিয়েছে। জাতীয় রাজস্ব বোর্ডও (এনবিআর) কিছু নিত্যপণ্যে শুল্ক‑কর কমিয়েছে। এছাড়া আমদানিপ্রবাহ স্বাভাবিক রাখতে নানা উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। তবুও মূল্যস্ফীতি এখনও কাঙ্খিত পর্যায়ে নামেনি। চলতি ২০২৫–২৬ অর্থবছরের বাজেটে মূল্যস্ফীতি ৬.৫ শতাংশের মধ্যে ধরে রাখার লক্ষ্য ঠিক করেছে সরকার।

লক্ষ্য অর্জন করতে হলে মুদ্রানীতি ছাড়াও খাদ্য সরবরাহ, আয় বৃদ্ধি ও সরকারি নীতির সমন্বয় জরুরি, উল্লেখ করে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের এক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেছেন, “বাংলাদেশে মূল্যস্ফীতি পরিস্থিতি এখন কেবল অর্থনীতির নয়; এটি রাজনৈতিক সহনশীলতা, সামাজিক স্থিতিশীলতা এবং নীতিগত বিশ্বাসযোগ্যতার পরীক্ষা।”

Share this article

আপনারা চাইলে কাস্টম বিজ্ঞাপন এইখানে দিতে পারেন
বিজ্ঞাপনের ছবি বা ভিডিও সাইজ ৩৩৬x২৮০ পিক্সাল হতে হবে

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Scroll to Top