ক্ষমতায় গেলে হিসাব সাজিয়ে সংকট ঢাকবে না বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি)। এমনটাই ইঙ্গিত দিয়েছেন দলটির সর্বোচ্চ নীতিনির্ধারণী ফোরাম জাতীয় স্থায়ী কমিটির সদস্য ও সাবেক বাণিজ্যমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী।
বাংলাদেশের অর্থনীতি ও পুঁজিবাজার বর্তমানে ‘অতিরিক্ত নিয়ন্ত্রণে’র যাঁতাকলে পিষ্ট হচ্ছে বলেও মন্তব্য করেছেন দেশের এই শীর্ষ রাজনীতিবিদ ও ব্যবসায়ী। তাঁর মতে, টেকসই অর্থনৈতিক উত্তরণের জন্য ডি-রেগুলেশন বা উদারীকরণ এবং স্বচ্ছ জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা ছাড়া আর কোনো বিকল্প নেই।
রাজধানীর বনানীতে মঙ্গলবার (২০ জানুয়ারি) ব্র্যাক ইপিএল স্টক ব্রোকারেজ আয়োজিত ‘পোস্ট ইলেকশন ২০২৬ হোরাইজন; ইকোনোমি, পলিটিক্স অ্যান্ড ক্যাপিটাল মার্কেট’ শীর্ষক সেমিনারে তিনি এসব নিয়ে কথা বলেন।
আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী দেশের বর্তমান অর্থনৈতিক পরিস্থিতির জন্য নীতিগত বিকৃতি ও অতিরিক্ত আইনকে দায়ী করেন। তিনি বলেন, “বাংলাদেশ বর্তমানে অর্থনৈতিকভাবে অতিরিক্ত নিয়ন্ত্রিত, তাই আমাদের ডি-রেগুলেশনের (উদারীকরণের) পথে হাঁটতে হবে। এতো বেশি নিয়ন্ত্রণ করা যাবে না।”
তিনি আরও বলেন, “অনেকগুলোই (আইন) মুক্তবাজার অর্থনীতির সঙ্গে সাংঘর্ষিক। আপনি হয় বাজারব্যবস্থা রাখবেন, নয়তো রাখবেন না—দুটো একসঙ্গে সম্ভব নয়। বাজারের ওপর আস্থা রাখতে হলে বাজারকে স্বাধীনভাবে চলতে দিতে হবে।”
আমির খসরু বিএনপির আন্তর্জাতিক বিষয়ক উইংয়ের অন্যতম প্রধান ব্যক্তি। দেশের বাণিজ্যিক রাজধানী চট্টগ্রামের পটিয়া ও কোতোয়ালি আসন থেকে একাধিকবার জাতীয় সংসদের সদস্য নির্বাচিত হয়েছেন। তিনি ২০০১ থেকে ২০০৬ সাল পর্যন্ত বিএনপি নেতৃত্বাধীন জোট সরকারের আমলে বাণিজ্যমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।
তাঁর বাবা মরহুম মাহমুদুন্নবী চৌধুরীও একজন প্রখ্যাত রাজনীতিবিদ ও মন্ত্রী ছিলেন। আমির খসরু বিদেশে উচ্চশিক্ষা গ্রহণ করেছেন। রাজনীতিতে আসার আগে এবং পাশাপাশি তিনি একজন সফল ব্যবসায়ী। তিনি চট্টগ্রাম চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির সভাপতি হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেছেন। এখনও তিনি শিপিং, স্টক ব্রোকারেজসহ বিভিন্ন খাতের ব্যবসার সাথে যুক্ত।
দেশের পুঁজিবাজার কেন অকার্যকর এবং কেন ব্যাংকিং খাত বিপর্যস্ত, তার একটি চিত্র তুলে ধরতে গিয়ে আমির খসরু বলেন, “পুঁজিবাজার অকার্যকর হওয়ায় সবাই রাষ্ট্রীয় ও বেসরকারি ব্যাংকের উপর নির্ভরশীল হয়ে পড়েছে, যার ফলে শর্ট-টার্ম ডিপোজিট (স্বল্প মেয়াদী আমানত) ও লং-টার্ম লেন্ডিংয়ের (দীর্ঘ মেয়াদে ঋণ) দিকে গিয়েছে ব্যাংকগুলো।”
আর্থিক খাতের বিশৃঙ্খলা ও অর্থ পাচার প্রসঙ্গে তিনি বলেন, “ব্যাংকগুলো থেকে যথেচ্ছ ঋণ নেওয়া হয়েছে, যার কিছু অংশ ব্যবসায় ব্যবহৃত হলেও কিছু অংশ বিদেশে পাচার হয়ে গেছে, যা আর্থিক খাতকে বিপর্যস্ত করে তুলেছে। অর্থনীতি ও পুঁজিবাজারের বেশিরভাগ এসব সমস্যার মূল কারণ হলো জবাবদিহিতার অভাব।”
আর্থিক খাতের প্রকৃত চিত্র লুকানোর সংস্কৃতির তীব্র সমালোচনা করে সাবেক এই বাণিজ্যমন্ত্রী বলেন, “আমি এ কথার সঙ্গে একমত যে, বছরের পর বছর ধরে যেসব ‘গারবেজ অ্যাকাউন্ট’ দিয়ে সাজানো হয়েছে, সেগুলো পরিষ্কার করা জরুরি। প্রতিবছর হিসাব সাজিয়ে সমস্যা ঢাকার কোনো মানে নেই; এতে সমস্যা আরও বাড়ছে। ব্যাংকিং খাতের সংকট দিন দিন গভীর হচ্ছে মূলত এই হিসাব সাজানোর সংস্কৃতির কারণেই।”
খেলাপি ঋণ প্রসঙ্গে তিনি সতর্ক করে বলেন, “খেলাপী ঋণের প্রকৃত চিত্র তুলে আনতে হবে। এটি হলে খেলাপী ঋণ ৪০ শতাংশে যেতে পারে। আমরা যেন সঠিক ও বাস্তব আর্থিক চিত্র দেখছি—এটি নিশ্চিত করতে হবে।”
আমির খসরু মনে করেন, একটি সুষ্ঠু নির্বাচনই পারে বিনিয়োগকারীদের হারানো আস্থা ফিরিয়ে আনতে। ১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনের দিকে ইঙ্গিত করে তিনি বলেন, “আগামী দিনের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ এখানেই। এই চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় প্রয়োজন ব্যাপক সংস্কার, উদারীকরণ এবং বাজারমুখী নীতি। হোক সেটা বিনিময় হার, পুঁজিবাজার কিংবা আমদানি–রপ্তানি—সব ক্ষেত্রেই বাজারকে সিদ্ধান্ত নিতে দিতে হবে।”
বিদেশি বিনিয়োগের সম্ভাবনা নিয়ে তিনি বলেন, “নির্বাচিত সরকার আসলে সবাই বিনিয়োগ করবেন। আমাদের বাজার ব্যবস্থাপনায় বিশ্বাস রাখতে হবে। আমাদের সবচেয়ে বড় সমস্যা হলো এই বিশ্বাসের অভাব। আস্থাহীনতার কারণে ডি-রেগুলেটেড (ভুলভাবে নিয়ন্ত্রণ) করা হয়েছে।”
বিএনপির ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা সম্পর্কে আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী বলেন, “আমরা ক্ষমতায় গেলে নিয়ন্ত্রণের উদারীকরণ করবো, স্বচ্ছতা আনবো। সবাইকে একটি জায়গায় আনা হবে জবাবদিহীতার জন্য। আমরা বাজারকে বাজারের মত চলতে দিতে চাই। তাহলে বাজার সঠিক পথে চলবে।”
তিনি আরও উল্লেখ করেন যে, সরকারি সংস্থাগুলো চাইলে সার্বভৌম বন্ড ছেড়ে বড় প্রকল্পের অর্থায়ন করতে পারে এবং সঠিক পরিবেশ তৈরি হলে জেপি মরগানের মতো বৈশ্বিক প্রতিষ্ঠানও বাংলাদেশে বিনিয়োগে আগ্রহী হবে।













