বৈদেশিক ঋণের ফাঁদ এড়াতে পরিকল্পনা উপদেষ্টার কড়া বার্তা

ছবি: বাসস
ছবি: বাসস

বাংলাদেশে বড় প্রকল্পের নামে ‘ঋণ ফাঁদ’ এবং অপ্রয়োজনীয় বৈদেশিক ঋণের ওপর নির্ভরতা কমাতে নীতিগত কঠোরতা অবলম্বনের ঘোষণা দিয়েছে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার।

প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূসের সভাপতিত্বে রবিবার (২৫ জানুয়ারি) অনুষ্ঠিত জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটির (একনেক) সভা শেষে পরিকল্পনা উপদেষ্টা ড. ওয়াহিদউদ্দিন মাহমুদ বলেন, “স্বল্পোন্নত দেশের (এলডিসি) তালিকা থেকে উত্তরণের প্রাক্কালে বাংলাদেশকে ‘ঋণ ফাঁদে’ পড়া থেকে অবশ্যই বিরত থাকতে হবে।”

“অপ্রয়োজনীয় বড় প্রকল্পের জন্য আমরা আর ঋণ নিতে চাই না। বিশ্বব্যাংকের মতো প্রতিষ্ঠান অনেক প্রকল্পের প্রস্তাব দেয়। তার মধ্যে যেগুলো প্রকৃত অর্থে উচ্চ অগ্রাধিকারভুক্ত, সেগুলো বিবেচনায় নেওয়া হবে। তবে এখন থেকে প্রতিটি বিষয় গভীরভাবে আলোচনা ও সতর্কভাবে মূল্যায়ন করা হচ্ছে,” যোগ করেন তিনি।

ড. ওয়াহিদউদ্দিন মাহমুদ সাফ জানিয়েছেন, অপ্রয়োজনীয় বড় প্রকল্পের জন্য সরকার আর বিদেশি ঋণ নিতে আগ্রহী নয়। এলডিসি উত্তরণের ফলে ঋণের সুদের হার বেড়ে যাওয়ায় ভবিষ্যতে ঋণ পরিশোধ অনেক বেশি ব্যয়বহুল হয়ে পড়বে। এই ঝুঁকি এড়াতে সামাজিক খাত, বিশেষ করে শিক্ষা খাতে ঋণের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা কমিয়ে নিজস্ব সক্ষমতায় ছোট পরিসরে প্রকল্প বাস্তবায়নের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।

সভায় ৪৫ হাজার ১৯১ কোটি ২৭ লাখ টাকা ব্যয়ে ২৫টি প্রকল্প অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। অনুমোদিত প্রকল্পগুলোর মধ্যে ১৪টি একদম নতুন এবং বাকি ১১টি সংশোধিত ও মেয়াদ বৃদ্ধিপ্রাপ্ত প্রকল্প। মোট ব্যয়ের বড় অংশ অর্থাৎ ৩২ হাজার ১৮ কোটি টাকা আসবে প্রকল্প ঋণ বা বৈদেশিক সাহায্য থেকে। সরকারের নিজস্ব তহবিল থেকে জোগান দেওয়া হবে ১০ হাজার ৮৮১ কোটি টাকা এবং সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলো নিজস্ব অর্থায়নে ব্যয় করবে ২ হাজার ২৯১ কোটি টাকা। সভায় সড়ক পরিবহন, রেলওয়ে, স্বাস্থ্য, কৃষি ও পানিসম্পদসহ গুরুত্বপূর্ণ খাতের ২৫টি প্রকল্পের অনুমোদন দেওয়া হয়। যার মধ্যে রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের সংশোধিত প্রকল্প এবং উত্তরাঞ্চলে ১,০০০ শয্যার বাংলাদেশ-চায়না ফ্রেন্ডশিপ জেনারেল হাসপাতাল নির্মাণের মতো বড় উদ্যোগ রয়েছে।

প্রকল্প বাস্তবায়নে শৃঙ্খলা নিশ্চিত করতে সব মন্ত্রণালয়কে কঠোর নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। পরিকল্পনা উপদেষ্টা জানান, যেসব প্রকল্পের মেয়াদ জুন বা ডিসেম্বরের মধ্যে শেষ হওয়ার কথা, সেগুলো নির্ধারিত সময়েই শেষ করতে হবে। নির্ধারিত সময়ে কাজ শেষ না হলে সংশ্লিষ্ট প্রকল্পের অর্থায়ন স্থায়ীভাবে বন্ধ করে দেওয়া হবে।

সরকার কেবল সেসব বড় অবকাঠামো প্রকল্পে বিদেশি ঋণ সীমিত রাখবে, যেগুলো সরাসরি বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণ করতে এবং রপ্তানিমুখী শিল্প গড়ে তুলে বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনে ভূমিকা রাখবে। অপ্রয়োজনীয় বিদেশি পরামর্শক ও ব্যয়বহুল যন্ত্রপাতির পেছনে ঋণের টাকা খরচ করার প্রবণতা বন্ধে এই কঠোর অবস্থান নেওয়া হয়েছে বলেও উপদেষ্টা উল্লেখ করেন।

অনুমোদিত প্রকল্পগুলোর মধ্যে চট্টগ্রামের লালখান বাজার হতে বিমানবন্দর পর্যন্ত এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে, দোহাজারী-কক্সবাজার রেললাইন এবং রাঙ্গামাটি-খাগড়াছড়ি মহাসড়ক প্রশস্তকরণ উল্লেখযোগ্য। এছাড়া নদী ভাঙন রোধে পানিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের ছয়টি বড় প্রকল্প অনুমোদন দেওয়া হয়েছে, যা মেহেন্দিগঞ্জ, জাজিরা ও চাঁপাইনবাবগঞ্জ এলাকায় কার্যকর ভূমিকা রাখবে। যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয়ের অধীনে শিক্ষিত তরুণদের ফ্রিল্যান্সিং প্রশিক্ষণের মাধ্যমে কর্মসংস্থান সৃষ্টির প্রকল্পটিও এবারের সভায় বিশেষ গুরুত্ব পেয়েছে।

ড. মাহমুদের মতে, এই সুস্পষ্ট নীতিগত অবস্থান ভবিষ্যৎ সরকারগুলোর জন্যও দিকনির্দেশনা হিসেবে কাজ করবে যেন রাষ্ট্র ঋণের দুষ্টচক্রে আটকে না পড়ে।

Share this article

আপনারা চাইলে কাস্টম বিজ্ঞাপন এইখানে দিতে পারেন
বিজ্ঞাপনের ছবি বা ভিডিও সাইজ ৩৩৬x২৮০ পিক্সাল হতে হবে

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Scroll to Top