দেশের বাণিজ্যিক রাজধানী চট্টগ্রামে আজ (১৫ মার্চ) বাজার স্থিতিশীলতা রক্ষা এবং বন্দর গতিশীলতা বৃদ্ধির লক্ষ্যে সরকারি পর্যায়ে দুটি বড় ধরনের তৎপরতা লক্ষ্য করা গেছে। একদিকে পাইকারি ও খুচরা বাজারের মূল্যের অযৌক্তিক ব্যবধান খতিয়ে দেখতে উচ্চপর্যায়ের ‘ফ্যাক্ট ফাইন্ডিং কমিটি’ গঠনের ঘোষণা দিয়েছেন বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির, অন্যদিকে কন্টেইনার জট নিরসনে কয়েকশ কন্টেইনার পণ্য নিলামে তোলার বিশাল কর্মযজ্ঞ শুরু করেছে চট্টগ্রাম কাস্টমস হাউস।
আজ রোববার চট্টগ্রামের ঐতিহ্যবাহী খাতুনগঞ্জ পাইকারি বাজার পরিদর্শন শেষে এক মতবিনিময় সভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে বাণিজ্যমন্ত্রী জানান, দেশের বাজারে অনেক সময় পাইকারি ও খুচরা মূল্যের মধ্যে অগ্রহণযোগ্য পার্থক্য দেখা যায়। এই অসংগতি দূর করতে ব্যবসায়ী প্রতিনিধি, প্রশাসন ও পেশাজীবীদের সমন্বয়ে একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হবে যারা বাজার পরিস্থিতি গভীরভাবে পর্যালোচনা করে প্রয়োজনীয় সুপারিশ প্রদান করবে।
মন্ত্রী বলেন, আন্তর্জাতিক বাজারে পণ্যের দাম বাড়লে দেশের বাজারে তার প্রভাব পড়া স্বাভাবিক হলেও অভ্যন্তরীণ অব্যবস্থাপনা বা কৃত্রিম কোনো কারণে যেন জনদুর্ভোগ না বাড়ে সে বিষয়ে সরকার অত্যন্ত সজাগ রয়েছে। বিশেষ করে আপেল, আঙুর ও কমলার মতো সাধারণ মানুষের প্রয়োজনীয় ফলের দাম ক্রয়ক্ষমতার মধ্যে রাখতে প্রয়োজনে নীতিগত পদক্ষেপ নেওয়া হবে বলে তিনি আশ্বস্ত করেন।
তবে মন্ত্রীর এই আশ্বাসের সমান্তরালে দেশের সাধারণ মানুষের ওপর ক্রমবর্ধমান মূল্যস্ফীতির চাপ আরও ঘনীভূত হয়েছে। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর সর্বশেষ তথ্যানুযায়ী, গত ফেব্রুয়ারি মাসে দেশে সাধারণ মূল্যস্ফীতি দাঁড়িয়েছে ৯ দশমিক ১৩ শতাংশে, যা গত নয় মাসের মধ্যে সর্বোচ্চ। জানুয়ারি মাসে এই হার ছিল ৮ দশমিক ৫৮ শতাংশ।
বিশেষ করে খাদ্য মূল্যস্ফীতি ৯ দশমিক ৩০ শতাংশে উন্নীত হওয়ায় দরিদ্র ও নিম্ন আয়ের মানুষের ক্রয়ক্ষমতা উল্লেখযোগ্যভাবে হ্রাস পেয়েছে। আবাসন, পরিবহন ও স্বাস্থ্যসেবা খাতেও ব্যয় বৃদ্ধির ধারা অব্যাহত থাকায় জনজীবনে এক ধরনের অস্থিরতা কাজ করছে। এই কঠিন পরিস্থিতির মধ্যেই রমজান মাসে ভোজ্যতেলের বাজার স্থিতিশীল রাখতে ব্যবসায়ীদের প্রতি ন্যায্যমূল্যের ধারা বজায় রাখার আহ্বান জানিয়েছেন মন্ত্রী।
বাজারের সরবরাহ ব্যবস্থা সচল রাখার প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবে চট্টগ্রাম কাস্টমস হাউস বন্দরে পড়ে থাকা অখালাসকৃত পণ্য সরাতে ব্যাপক উদ্যোগ গ্রহণ করেছে। টিবিএস-এর রিপোর্ট অনুযায়ী, বন্দরের নিরাপত্তা ঝুঁকি কমাতে এবং বাণিজ্যিক গতিশীলতা ফিরিয়ে আনতে ২০২৬ সালের মার্চ মাস জুড়ে ই-অকশন বা ডিজিটাল নিলামের মাধ্যমে ৩৭৮ কন্টেইনার পণ্য বিক্রির প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে।
জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের বিশেষ আদেশে পরিচালিত এই নিলামে কোনো সংরক্ষিত মূল্য নির্ধারিত নেই। প্রথম পর্যায়ে আগামী ৩১ মার্চ ১৮০ কন্টেইনার পণ্যের দরপত্র খোলা হবে, যার মধ্যে কেমিক্যাল, মেশিনারি ও গাড়ির যন্ত্রাংশসহ নানা সামগ্রী রয়েছে। পরবর্তী ধাপে এপ্রিলের শুরুতে আরও ১৯৮ কন্টেইনার শিল্পজাত পণ্য ও মূল্যবান যন্ত্রপাতি নিলামে তোলা হবে।
চট্টগ্রাম কাস্টমস কর্তৃপক্ষের মতে, ডিজিটাল পদ্ধতিতে এই নিলাম পরিচালনার ফলে স্বচ্ছতা নিশ্চিত হবে এবং আগ্রহী ক্রেতারা ঘরে বসেই প্রতিযোগিতামূলক দামে পণ্য কেনার সুযোগ পাবেন। প্রশাসনের এই দ্বিমুখী পদক্ষেপ—একদিকে তদন্ত কমিটির মাধ্যমে বাজার তদারকি এবং অন্যদিকে নিলামের মাধ্যমে সরবরাহ বৃদ্ধি—পবিত্র রমজান মাসে সাধারণ ভোক্তার জন্য স্বস্তির কারণ হয়ে দাঁড়াবে বলে আশা করা হচ্ছে।













