আসন্ন ঈদুল ফিতরকে সামনে রেখে সরকার ও কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নানামুখী তৎপরতা সত্ত্বেও দেশের অনেক শিল্পকারখানায় শ্রমিকদের বেতন-ভাতা ও বোনাস পরিশোধ নিয়ে এখনো পুরোপুরি অনিশ্চয়তা কাটেনি। নির্ধারিত সময়সীমা পেরিয়ে গেলেও এখনো প্রায় এক-চতুর্থাংশ কারখানায় ফেব্রুয়ারি মাসের বেতন বকেয়া রয়েছে এবং অর্ধেক কারখানায় ঈদ বোনাস পরিশোধ করা হয়নি। যদিও পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে কেন্দ্রীয় ব্যাংক বিশেষ ঋণ সুবিধা এবং অর্থ মন্ত্রণালয় বকেয়া নগদ সহায়তা ছাড় করেছে, তবে মাঠপর্যায়ে এর সুফল এখনো সব শ্রমিকের হাতে পৌঁছায়নি।
শিল্প পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, তদারকির আওতাধীন ১০ হাজার ১০০টি শিল্পকারখানার মধ্যে গতকাল সোমবার পর্যন্ত ২৫ শতাংশ বা ২,৫৪৪টি কারখানা ফেব্রুয়ারি মাসের বেতন দেয়নি। সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয় হলো, ৪৫.৫৭ শতাংশ বা ৪,৬০২টি (সংখ্যার সামঞ্জস্য প্রয়োজন) কারখানা এখন পর্যন্ত শ্রমিকদের ঈদ বোনাস বুঝিয়ে দেয়নি। শ্রম ও কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের নির্দেশনা অনুযায়ী, ফেব্রুয়ারি মাসের বেতন ৯ মার্চ এবং ঈদ বোনাস ১২ মার্চের মধ্যে পরিশোধ করার কথা থাকলেও কয়েক হাজার প্রতিষ্ঠান সেই সময়সীমা রক্ষা করতে পারেনি।
শ্রমিকদের পাওনা পরিশোধ সহজ করতে সরকার সম্প্রতি বড় কিছু পদক্ষেপ নিয়েছে। অর্থ মন্ত্রণালয় রপ্তানিমুখী শিল্প খাতের বকেয়া আড়াই হাজার কোটি টাকার নগদ সহায়তা ছাড় করেছে। পাশাপাশি সচল ও রপ্তানিমুখী প্রতিষ্ঠানের জন্য ফেব্রুয়ারি মাসের বেতনের সমপরিমাণ অর্থ সহজ শর্তে ঋণ দেওয়ার ব্যবস্থা করেছে বাংলাদেশ ব্যাংক। এক বছর মেয়াদি এই ঋণে অতিরিক্ত কোনো চার্জ বা ফি আরোপ করা যাবে না এবং ঋণের টাকা সরাসরি শ্রমিকের ব্যাংক বা এমএফএস (বিকাশ/নগদ) অ্যাকাউন্টে যাবে।
বিজিএমইএ সভাপতি মাহমুদ হাসান খান এই উদ্যোগকে স্বাগত জানিয়ে বলেন, “বেতন-বোনাস ও গ্যাস-বিদ্যুৎ বিল পরিশোধের প্রবল চাপের মুখে এই অর্থ বরাদ্দ মালিকদের জন্য বড় স্বস্তি নিয়ে এসেছে।”
তবে বাস্তব চিত্রে কিছু অসংগতি দেখা যাচ্ছে। ইন্ডাস্ট্রিয়াল বাংলাদেশ কাউন্সিলের সাবেক মহাসচিব সালাউদ্দিন স্বপন জানিয়েছেন, কিছু মালিক ইচ্ছা করেই বেতন-বোনাস দেরিতে দিচ্ছেন যাতে শ্রমিকেরা চলতি মার্চ মাসের অগ্রিম বেতন দাবি করতে না পারে। অন্যদিকে বিকেএমইএ সভাপতি মোহাম্মদ হাতেম আশাবাদ ব্যক্ত করে বলেন, বুধ ও বৃহস্পতিবারের মধ্যে ব্যাংক লেনদেনের মাধ্যমে কারখানাগুলো পাওনা পরিশোধ করে ছুটি দেবে। বিজিএমইএ-র তথ্যমতে, তাদের সদস্যভুক্ত অধিকাংশ কারখানায় বেতন পরিশোধ হলেও এখনো ৭৬টি কারখানায় বোনাস এবং ৩৭টি কারখানায় ফেব্রুয়ারির বেতন বাকি আছে। এমনকি ৫টি কারখানায় জানুয়ারি মাসের বেতনও বকেয়া পড়ে আছে।
শিল্পাঞ্চলগুলোতে ইতিমধ্যে ছুটির ঘণ্টা বাজতে শুরু করেছে। গাজীপুরের এইচডিএফ অ্যাপারেলসের মতো কিছু কারখানায় মালিক নিখোঁজ হওয়ায় শতাধিক শ্রমিকের পাওনা নিয়ে অনিশ্চয়তা দেখা দিয়েছে। নারায়ণগঞ্জের একটি কারখানায় বিকেএমইএ নেতারা ব্যক্তিগতভাবে ৩০ লাখ টাকা ঋণ দিয়ে পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখার চেষ্টা করেছেন।
আজ মঙ্গলবার থেকে ধাপে ধাপে ঈদের ছুটি শুরু হচ্ছে; আজ ৬২৫টি এবং আগামীকাল ৮০৩টি পোশাক কারখানায় ছুটি হওয়ার কথা রয়েছে। শেষ মুহূর্তে শ্রমিকেরা তাঁদের ঘামঝরানো পাওনা বুঝে নিয়ে স্বস্তিতে বাড়ি ফিরতে পারবেন কি না, সেটিই এখন দেখার বিষয়।













