দেশের ইতিহাসে প্রথমবারের মতো একজন সক্রিয় ব্যবসায়ীকে বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর হিসেবে নিয়োগ দেওয়ার সরকারি সিদ্ধান্তে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি)। সংস্থাটি মনে করে, এই নিয়োগের ফলে নজিরবিহীন ‘স্বার্থের সংঘাত’ তৈরি হবে এবং কেন্দ্রীয় ব্যাংকের স্বাধীনতা ও নিরপেক্ষতা চরম ঝুঁকির মুখে পড়বে।
বৃহস্পতিবার (২৬ ফেব্রুয়ারি) এক বিবৃতিতে টিআইবি এই নিয়োগকে বর্তমান সরকারের নির্বাচনী অঙ্গীকারের ‘স্পষ্ট লঙ্ঘন’ হিসেবে অভিহিত করেছে।
বিবৃতিতে টিআইবি’র নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেন, নবনিযুক্ত গভর্নর নিজে একজন তৈরি পোশাক ও আবাসন ব্যবসায়ী এবং বড় অঙ্কের ঋণ পুনর্তফসিল সুবিধার গ্রহীতা। ড. জামান উল্লেখ করেন, “যাঁর ব্যাংকিং খাতের অভিজ্ঞতা মূলত ঋণগ্রহীতা ও ঋণখেলাপি হিসেবে এবং পরবর্তীতে বিশেষ বিবেচনায় ঋণ পুনর্তফসিল প্রক্রিয়ার সাথে সংশ্লিষ্ট, তাঁকে নিয়ন্ত্রক সংস্থার প্রধান করা আত্মঘাতী সিদ্ধান্ত।” একজন ব্যবসায়ী গভর্নর হিসেবে নিজের বা নিজ গোষ্ঠীর স্বার্থ রক্ষা করবেন নাকি সাধারণ মানুষের আমানত রক্ষা করবেন, তা নিয়ে বড় প্রশ্ন দেখা দিয়েছে।
বিবৃতিতে বলা হয়েছে, নবনিযুক্ত ব্যক্তি বিজিএমইএ, আটাব এবং ঢাকা চেম্বারের মতো প্রভাবশালী ব্যবসায়ী লবির সক্রিয় অংশ। এছাড়া তিনি ক্ষমতাসীন দলের নির্বাচন পরিচালনা কমিটির সদস্য হওয়ায় কেন্দ্রীয় ব্যাংক আবারও রাজনৈতিক ও গোষ্ঠীস্বার্থ রক্ষার হাতিয়ারে পরিণত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। টিআইবি মনে করে, এই ধরনের ব্যাকগ্রাউন্ড সম্পন্ন ব্যক্তির পক্ষে প্রভাবশালী ঋণখেলাপি মহলের প্রভাবমুক্ত হয়ে কাজ করা প্রায় অসম্ভব।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের স্বাধীনতার ওপর আঘাত
টিআইবি’র মতে, ২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থানের পর একটি স্বাধীন ও শক্তিশালী কেন্দ্রীয় ব্যাংকের যে জনআকাঙ্ক্ষা তৈরি হয়েছিল, এই নিয়োগ তার সম্পূর্ণ বিপরীতমুখী। বিবৃতিতে বলা হয়, নির্বাচনী ইশতেহারে ব্যাংক খাতে সুশাসন ও স্বচ্ছতার যে প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছিল, এই নিয়োগ তার সাথে সাংঘর্ষিক। বিগত সরকারের আমলে তৈরি হওয়া খেলাপি ঋণের পাহাড় ও অর্থপাচার রোধে এই নিয়োগ কোনো ইতিবাচক সংকেত দিচ্ছে না।
একজন ব্যবসায়ী গভর্নর কি ব্যক্তিগত স্বার্থের ঊর্ধ্বে উঠে মুদ্রাস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে কঠোর মুদ্রানীতি বা দুর্বল ব্যাংকের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে পারবেন—এমন প্রশ্নও তুলেছে টিআইবি।
দেশের বর্তমান নাজুক অর্থনৈতিক পরিস্থিতিতে বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণ এবং আর্থিক খাতের স্থিতিশীলতার জন্য কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কঠোর ও নিরপেক্ষ অবস্থান প্রয়োজন। কিন্তু টিআইবি মনে করে, কেন্দ্রীয় ব্যাংক যদি ব্যবসায়িক লবির দখলে চলে যায়, তবে আন্তর্জাতিক মহলে দেশের আর্থিক খাতের ভাবমূর্তি আরও ক্ষুণ্ন হবে।
টিআইবি মূলত ‘পলিসি ক্যাপচার’ বা ‘নীতি দখলের’ আশঙ্কার কথা বলছে। যেখানে রেগুলেটর বা নিয়ন্ত্রক নিজেই যখন নিয়ন্ত্রিত গোষ্ঠীর অংশ হন, তখন আর্থিক খাতের নিরপেক্ষতা বজায় রাখা প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়ে। এটি বর্তমান সরকারের সংস্কার ইমেজের জন্য একটি বড় চ্যালেঞ্জ।
টিআইবি সরকারকে এই নিয়োগের ফলে সৃষ্ট ‘স্বার্থের সংঘাত’ এবং কেন্দ্রীয় ব্যাংকের স্বাধীনতার ওপর সম্ভাব্য নেতিবাচক প্রভাবের বিষয়ে গুরুত্বের সাথে ভেবে দেখার অনুরোধ জানিয়েছে। সংস্থাটি হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেছে, রাজনৈতিক ও ব্যবসায়িক প্রভাবমুক্ত একটি স্বাধীন কেন্দ্রীয় ব্যাংক ছাড়া দেশের বিপর্যস্ত ব্যাংকিং খাত পুনরুদ্ধার করা কোনোভাবেই সম্ভব নয়।













