কোটি মানুষের মাথার ঘাম পায়ে ফেলা জমানো আমানতের নিরাপত্তা ঢাল কি তবে নড়বড়ে হয়ে যাচ্ছে? নাকি বেসরকারি বিনিয়োগের হাত ধরে ধুঁকতে থাকা ব্যাংকগুলো পাবে নতুন প্রাণ? এমন সব তীক্ষ্ণ প্রশ্ন আর বিরোধী দলের তীব্র আপত্তির মুখে আজ ১০ এপ্রিল জাতীয় সংসদে পাস হয়েছে বহুল আলোচিত ‘ব্যাংক রেজ্যুলুশন বিল, ২০২৬’। অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী বিলটি পাসের প্রস্তাব করলে কণ্ঠভোটের মাধ্যমে এটি চূড়ান্ত রূপ পায়, যা দেশের ব্যাংকিং খাতের ভবিষ্যৎ সংস্কারের পথে এক নতুন বিতর্কের জন্ম দিয়েছে।
বিলের ওপর আলোচনায় বিরোধী দলীয় সদস্য সাইফুল আলম খান মিলন সাফ জানিয়ে দেন, ২০২৫ সালের মূল অর্ডিন্যান্সটি ছিল ব্যাংক লুটেরাদের বিরুদ্ধে এক শক্তিশালী দেয়াল। তাঁর মতে, ২০২৫ সালের মে মাসে জারি করা সেই অর্ডিন্যান্সটি কোনো সাধারণ আইনি নথি ছিল না, বরং এটি ছিল কোটি মানুষের আমানতের রক্ষা কবচ। তিনি আশঙ্কা প্রকাশ করেন যে, এই বিলের মাধ্যমে অর্ডিন্যান্সের সংশোধনী বা বাতিল মানেই হলো ব্যাংক খাতের চিহ্নিত লুটেরাদের আইনি ফাঁকফোকর ব্যবহার করে আড়াল হওয়ার সুযোগ করে দেওয়া। বিশেষ করে আড়ালে থেকে বেনামে ব্যাংক নিয়ন্ত্রণ করা ‘ছায়া পরিচালকদের’ জবাবদিহি নিশ্চিত করার যে ঐতিহাসিক ও কঠোর পদক্ষেপ আগের অর্ডিন্যান্সে ছিল, এই সংশোধনীর ফলে তা দুর্বল হয়ে যাওয়ার জোরালো আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
জবাবে অর্থমন্ত্রী দাবি করেন, ব্যাংকিং খাতে সরকারের ওপর যে বিশাল আর্থিক বোঝা চেপে আছে, তা কমাতে এবং ব্যাংকগুলোর মূলধন ঘাটতি পূরণে বেসরকারি উদ্যোগের কোনো বিকল্প নেই। এই বিলের মাধ্যমে একটি ‘বিকল্প সমাধান ব্যবস্থা’ বা নতুন উইন্ডো তৈরি করা হয়েছে, যার মাধ্যমে কোনো ব্যাংক সংকটে পড়লে সরাসরি অবসায়ন বা বন্ধ না করে বিনিয়োগকারীদের সহায়তায় সম্পদ ও দায় পুনরুদ্ধারের সুযোগ তৈরি হবে। এতে একদিকে যেমন দেউলিয়া হওয়ার হাত থেকে ব্যাংক রক্ষা পাবে, তেমনি পুঁজিবাজারে সাধারণ শেয়ারহোল্ডার ও বিনিয়োগকারীদের আস্থা বাড়বে। তিনি স্পষ্ট করে বলেন, আর্থিক খাতে সুশাসন ও শৃঙ্খলা নিশ্চিত করা সরকারের শীর্ষ রাজনৈতিক অঙ্গীকার এবং এই বিল সেই পথকেই সুগম করবে।
বিরোধী দলীয় সদস্য সাইফুল আলম আরও অভিযোগ করেন যে, অতীতে সাধারণ করদাতাদের হাজার হাজার কোটি টাকা ব্যয় করা হয়েছে সংকটে থাকা ব্যাংকগুলোকে বাঁচাতে। আগের অর্ডিন্যান্সটি সরকারি অর্থের অপচয় রোধ করে বেসরকারি উৎস থেকে সমাধানের পথ দেখিয়েছিল। কিন্তু বর্তমান বিলের কিছু সংশোধনী সেই সুরক্ষা ব্যবস্থাকে ধ্বংস করতে পারে, যা আবারও সাধারণ মানুষের ট্যাক্সের টাকাকে ঝুঁকির মুখে ঠেলে দেবে। বিশেষ করে এস আলম গ্রুপের মতো বেনামি মালিকানায় ব্যাংক লুটপাটের যে ইতিহাস রয়েছে, তা ঠেকাতে পূর্বের কঠোর বিধানগুলো শিথিল করার তীব্র সমালোচনা করেন তিনি।
বিলটিতে মূলত সংকটাক্রান্ত ব্যাংকগুলোর ব্যবস্থাপনা, আমানতকারীদের স্বার্থ রক্ষা এবং মন্দা কাটিয়ে ওঠার আইনি প্রক্রিয়াগুলো ছোট ছোট অনুচ্ছেদে সুবিন্যস্ত করা হয়েছে। অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের জারিকৃত ২০২৫ সালের অর্ডিন্যান্সটি বিশেষ কমিটির স্ক্রুটিনি শেষে ১৫টি অধ্যাদেশের সঙ্গে সংশোধিত আকারে এই বিল হিসেবে সংসদে উত্থাপিত হয়। স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমেদের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত এই অধিবেশনে কোনো দফাভিত্তিক সংশোধনী ছাড়াই বিলটি শেষ পর্যন্ত কণ্ঠভোটে পাস হয়। ব্যাংকিং খাতের স্থিতিশীলতা রক্ষায় এটি এক বড় পদক্ষেপ বলে সরকার দাবি করলেও, সাধারণ মানুষের আমানত ও করের টাকা বাস্তবে কতটুকু সুরক্ষিত থাকবে—তা নিয়েই এখন মূল আলোচনা আবর্তিত হচ্ছে।












