প্রস্তাবিত ‘ব্যাংক রেজুলেশন আইন ২০২৬’ এ একীভূত হওয়া দুর্বল ব্যাংকের পুরোনো শেয়ারধারীদের কোনো ধরনের জবাবদিহি ছাড়াই আবারও মালিকানায় ফেরার সুযোগ দেওয়ার বিধানকে ‘লুটেরাদের পুনর্বাসনের উদ্যোগ’ বলে মন্তব্য করেছে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি)। সংস্থাটি মনে করে, এই আইনের মাধ্যমে ব্যাংকিং খাত পুনরায় দুর্নীতি ও লুটপাটের অভয়ারণ্যে পরিণত হবে, যা দেশের অর্থনীতির জন্য আত্মঘাতীমূলক।
সোমবার (১৩ এপ্রিল) সংবাদ মাধ্যমে পাঠানো এক বিবৃতিতে টিআইবি উদ্বেগ প্রকাশ করে জানায়, এই আইনের ১৮ (ক) ধারা সংযোজনের মাধ্যমে সরকার সংশ্লিষ্টদের বিচারের পরিবর্তে কার্যত দায়মুক্তির নিশ্চয়তা প্রদান করছে। এর মাধ্যমে ব্যাংকিং খাতের দীর্ঘদিনের অব্যবস্থাপনা, অনিয়ম ও সুশাসনের ঘাটতি দূর করার পরিবর্তে দায়মুক্তি ও বিচারহীনতার পূর্ববর্তী কর্তৃত্ববাদী চর্চাকেই অব্যাহত রাখা হয়েছে।
বিবৃতিতে টিআইবির নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেন, অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সময় জারি করা অধ্যাদেশে বিধান ছিল যে, বিপর্যয়ের জন্য দায়ী ব্যক্তিরা সব অর্থ ফেরত দিলেও মালিকানায় ফিরতে পারবেন না। কিন্তু নতুন আইনে সেই বিধান সংশোধন করা হয়েছে। সরকার যে যুক্তিই দেখাক না কেন, এর মাধ্যমে ব্যাংক খাতের লুটেরাদের জবাবদিহি নিশ্চিত করার বদলে বিশালভাবে পুরস্কৃত করা হয়েছে।
সরকারের এমন পদক্ষেপের কঠোর সমালোচনা করে তিনি বলেন, কর্তৃত্ববাদের পতনের অর্থ যে ব্যাংক খাতে ক্ষমতার অপব্যবহার ও জবরদখলের অবসান নয়, বরং “উইনার টেইকস অল” ফর্মুলায় নীতিদখলের পালাবদলের মাধ্যমে চোরতন্ত্রের সাময়িক বিরতির পর পুনর্বাসনের পথ সুগম রাখা, সরকারের এই পদক্ষেপ তারই দৃষ্টান্ত। এটি বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর নিয়োগের চরম বিতর্কিত সিদ্ধান্তের ধারাবাহিকতা মাত্র বলেও তিনি মন্তব্য করেন।
ড. জামান প্রশ্ন তোলেন, ব্যাংক লুটপাটের হোতারা কোন জাদুবলে এমন শুদ্ধতা অর্জন করলেন যে, তারা মাত্র সাড়ে সাত শতাংশ অর্থ জমা দিয়েই পুনরায় ব্যাংকের মালিকানা ফিরে পাবেন? বাকি ৯২.৫ শতাংশ অর্থ পরিশোধের যে শর্ত দেওয়া হয়েছে, তা বাস্তবে প্রতিপালিত হবে কি না—সেই নিশ্চয়তা দেওয়া বাংলাদেশ ব্যাংকের পক্ষে সম্ভব নয়। বরং এর মাধ্যমে ব্যাংক খাতে গভীরতর দেউলিয়াপনার পথ খুলে দেওয়া হয়েছে, যার চূড়ান্ত বোঝা সাধারণ জনগণকে বইতে হবে।
টিআইবি মনে করে, যথাযথ আইনি প্রক্রিয়ায় দায়ীদের জবাবদিহি নিশ্চিত না করে ঢালাওভাবে মালিকানা ফিরিয়ে দেওয়ার এই উদ্যোগ অব্যাহত থাকলে ব্যাংকিং খাতে কোনো গুণগত পরিবর্তন আসবে না। এই সিদ্ধান্ত ক্ষমতাসীন দলের নির্বাচনী ইশতেহারে দেওয়া ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান খাত সংস্কারের অঙ্গীকারের সঙ্গেও সরাসরি সাংঘর্ষিক।
সংস্থাটি সরকারকে এই আত্মঘাতী সিদ্ধান্ত থেকে সরে এসে দুর্নীতিসহায়ক নতুন বিধানগুলো পুনরায় ভেবে দেখার অনুরোধ জানিয়েছে। টিআইবি মনে করে, আমানত সুরক্ষা ও অর্থনীতির স্থিতিশীলতার দোহাই দিয়ে যদি সুবিধাবাদী গোষ্ঠীতন্ত্রের স্বার্থ রক্ষা করা হয়, তবে তা দীর্ঘমেয়াদে জাতীয় অর্থনীতির মেরুদণ্ড ভেঙে দেবে।













