ব্যাংকিং এখন ‘জম্বি ফাইন্যান্সিয়াল সিস্টেম’

ডিএসজে প্রদায়ক
ডিএসজে প্রদায়ক

বাংলাদেশের ব্যাংকিংখাত বর্তমানে গভীর নৈতিক ও ব্যবস্থাগত সংকটে নিমজ্জিত বলে মন্তব্য করেছেন যুক্তরাষ্ট্রের নিউ অরলিন্স বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড. কবির হাসান।

তিনি বলেছেন, দেশের ব্যাংকিং ব্যবস্থা কার্যত একটি “জম্বি ফিন্যান্সিয়াল সিস্টেমে” পরিণত হয়েছে, যেখানে বহু ব্যাংক কৃত্রিমভাবে টিকে থাকলেও বাস্তবে অর্থনীতিকে কার্যকর সেবা দিতে ব্যর্থ হচ্ছে।

ড. কবির হাসানের দাবি, বাংলাদেশের ব্যাংকিং ব্যবস্থার প্রায় ৮৫ শতাংশই ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় রয়েছে। ডেসটিনি গ্রুপ কেলেঙ্কারির মাধ্যমে প্রায় ৪৭ কোটি ৫০ লাখ মার্কিন ডলার, ফারমার্স ব্যাংক কেলেঙ্কারিতে প্রায় ১১০ কোটি ডলার এবং ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ লিমিটেডের ক্ষেত্রে আনুমানিক ১৫ বিলিয়ন ডলারের অনাদায়ী ঋণ- এসব ঘটনা ব্যাংকখাতের সংকট কতটা গভীরে প্রোথিত, তার স্পষ্ট প্রমাণ।

সম্প্রতি, সেন্ট্রাল শরীয়াহ বোর্ড ফর ইসলামিক ব্যাংকস অব বাংলাদেশ (সিএসবিআইবি) ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ফিন্যান্স ডিপার্টমেন্টের উদ্যোগে আয়োজিত দুই দিনব্যাপী ‘ইন্টারন্যাশনাল ইসলামিক ফাইন্যান্স অ্যান্ড ব্যাংকিং কনফারেন্স’-এ মূল প্রবন্ধে ড. কবির হাসান এসব কথা বলেন।

রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলোর অবস্থাও উদ্বেগজনক উল্লেখ করে অধ্যাপক হাসান জানান, গড়ে এসব ব্যাংকের প্রায় অর্ধেক ঋণই খেলাপি। পাশাপাশি গত ১৭ বছরে পদ্মাসেতু ও পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রসহ বিভিন্ন মেগা প্রকল্প ঘিরে দুর্নীতি ও অপচয়ের মাধ্যমে আনুমানিক ২৩৪ বিলিয়ন ডলার অর্থনীতির বাইরে চলে গেছে, যা সামগ্রিক আর্থিক স্থিতিশীলতাকে চরমভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করেছে।

ড. কবির হাসানের মতে, এই সংকটকে কেবল তদারকির দুর্বলতা বা ঝুঁকি ব্যবস্থাপনার সীমাবদ্ধতা হিসেবে দেখলে প্রকৃত সমস্যাকে আড়াল করা হবে। তার ভাষায়, এটি মূলত একটি নৈতিক ব্যর্থতার প্রতিফলন। নৈতিকতা ভেঙে পড়লে ঋণ যায় রাজনৈতিকভাবে প্রভাবশালী গোষ্ঠীর হাতে, লাভ ব্যক্তিগতভাবে ভোগ করা হয় এবং ক্ষতির দায় শেষ পর্যন্ত এসে পড়ে সাধারণ মানুষের কাঁধে।

তিনি বলেন, রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ ও নিয়ন্ত্রক সংস্থার স্বাধীনতার অভাবই ব্যাংকখাত সংকটের প্রধান কারণ। দক্ষতার বদলে রাজনৈতিক আনুগত্যের ভিত্তিতে নিয়োগের ফলে সৃষ্টি হচ্ছে ‘রেগুলেটরি ক্যাপচার’, যেখানে নিয়ন্ত্রক প্রতিষ্ঠানগুলো তাদের দায়িত্ব পালনে ব্যর্থ হয়। এর সরাসরি প্রভাব পড়ছে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ, মুদ্রার মান ও সামগ্রিক অর্থনীতিতে।

কনফারেন্সে এএওআইএফআই গভর্ন্যান্স অ্যান্ড এথিকস বোর্ডের চেয়ারম্যান মোহাম্মদ ফররুখ রেজা বলেন, বাংলাদেশে ইসলামী অর্থব্যবস্থার ভবিষ্যত নিশ্চিত করতে হলে বিচ্ছিন্ন কিছু ইসলামী ব্যাংক বা পণ্য নয় বরং একটি সমন্বিত জাতীয় দৃষ্টিভঙ্গি প্রয়োজন। তার মতে, ইসলামী ফিন্যান্স কেবল ব্যাংকিং সেবা নয়; এটি বিশ্বাস, শাসনব্যবস্থা ও অর্থনীতির সমন্বয়ে গঠিত একটি পূর্ণাঙ্গ ব্যবস্থা।

তিনি বলেন, ইসলামী অর্থব্যবস্থার সফলতার প্রথম শর্ত হলো, সঠিক নিয়ত। ব্যক্তি, প্রতিষ্ঠান ও রাষ্ট্র- সব স্তর থেকেই এই নিয়ত স্পষ্ট হতে হবে। ইসলামের ন্যায়, দয়া ও নৈতিকতার চেতনা যদি কাঠামোর ভেতরে না থাকে, তবে ইসলামী ফিন্যান্স কেবল নামেই সীমাবদ্ধ থাকবে।

ইন্দোনেশিয়ার উদাহরণ টেনে মোহাম্মদ ফররুখ রেজা বলেন, দীর্ঘদিন দেশটি ইসলামী ফিন্যান্সে কাঙ্ক্ষিত অগ্রগতি করতে পারেনি মূলত সমন্বয়ের অভাবে। পরে একটি জাতীয় মাস্টার প্ল্যান গ্রহণের মাধ্যমে কেন্দ্রীয় ব্যাংক, অর্থ মন্ত্রণালয় ও নিয়ন্ত্রক সংস্থাগুলোর সমন্বয় নিশ্চিত করা হলে খাতটি গতি পায়। তার মতে, কোরআন ও সুন্নাহভিত্তিক অর্থব্যবস্থায় প্রবেশাধিকার মুসলমানদের জন্য কোনো বিশেষ সুবিধা নয় বরং একটি মৌলিক অধিকার।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ফিন্যান্স বিভাগের অধ্যাপক ড. সিদ্দিকুল ইসলাম বলেন, আশির দশকে সীমিত পরিসরে যাত্রা শুরু করলেও বর্তমানে ইসলামিক ব্যাংকিং বাংলাদেশের আর্থিক ব্যবস্থার একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশে পরিণত হয়েছে। তবে এই অগ্রগতিকে টেকসই করতে কাঠামোগত সংস্কার এখন অপরিহার্য।

তিনি বলেন, ইসলামিক ব্যাংকগুলো এখনও অনেকাংশে প্রচলিত ব্যাংকিং আইন ও নীতিমালার আওতায় পরিচালিত হচ্ছে, যা কার্যক্রমে জটিলতা সৃষ্টি করছে। এই বাস্তবতা বিবেচনায় বাংলাদেশ ব্যাংকের পৃথক আইন প্রণয়ন এবং ইসলামিক ব্যাংকিং রেগুলেশন অ্যান্ড পলিসি ডিপার্টমেন্ট গঠন একটি ইতিবাচক উদ্যোগ।

ড. সিদ্দিকুল ইসলাম মানবসম্পদের ঘাটতির বিষয়টিও তুলে ধরেন। তার মতে, ফিন্যান্স ও শরীয়াহ্ উভয় বিষয়ে দক্ষ পেশাজীবীর অভাব ইসলামিক ব্যাংকিংখাতের অন্যতম বড় চ্যালেঞ্জ। পাশাপাশি পণ্যের ব্যাখ্যায় ভিন্নতা গ্রাহকদের বিভ্রান্ত করছে, যা দূর করতে মানবিকীকরণ জরুরি। তিনি আরও বলেন, এসএমই, কৃষি, দারিদ্র্য বিমোচন ও গ্রিন ফিন্যান্সে ইসলামিক ফিন্যান্সের বিপুল সম্ভাবনা থাকলেও তা এখনও পুরোপুরি কাজে লাগানো হয়নি।

কনফারেন্সে যুক্তরাজ্যের ডারহাম বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক হাবিব আহমেদ বলেন, উদ্ভাবন মানবসভ্যতা ও অর্থনৈতিক পরিবর্তনের অন্যতম প্রধান চালিকাশক্তি। ইতিহাসে নতুন ধারণা ও ব্যবস্থা ‘সৃজনশীল ধ্বংস’-এর মাধ্যমে পুরোনো কাঠামোকে প্রতিস্থাপন করেছে। তার মতে, উদ্ভাবন কেবল প্রযুক্তিগত নয়; এর পেছনে রয়েছে নৈতিক ও সাংস্কৃতিক মূল্যবোধও।

তিনি বলেন, গ্লোবাল ইনোভেশন ইনডেক্স অনুযায়ী, ওআইসি দেশগুলো গবেষণা, মানবসম্পদ ও পেটেন্টে বৈশ্বিক গড়ের অনেক নিচে অবস্থান করছে, যা উন্নয়নের বড় বাধা। ইসলামিক ফিন্যান্স যদি কেবল আইনি সম্মতির গণ্ডিতে সীমাবদ্ধ থাকে, তবে তা প্রান্তিকই থেকে যাবে। তবে মাকাসিদুশ শরীয়াহ্ভিত্তিক নৈতিক দর্শনকে কেন্দ্র করে এগোলে ইসলামিক ফিন্যান্স টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা অর্জনেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।

অধ্যাপক হাবিব আহমেদ বলেন, ভবিষ্যত অনুমান করার চেয়ে ভবিষ্যত নিজেই তৈরি করাই সবচেয়ে বাস্তবসম্মত পথ। নৈতিকতা, জ্ঞান ও মানবসম্পদের সমন্বয় ছাড়া কোনো আর্থিক ব্যবস্থাই দীর্ঘস্থায়ী হতে পারে না।

Share this article

আপনারা চাইলে কাস্টম বিজ্ঞাপন এইখানে দিতে পারেন
বিজ্ঞাপনের ছবি বা ভিডিও সাইজ ৩৩৬x২৮০ পিক্সাল হতে হবে

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Scroll to Top