চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরের প্রথম আট মাসে (জুলাই-ফেব্রুয়ারি) দেশের অর্থনীতিতে বৈদেশিক মুদ্রার প্রবাহ নিয়ে এক উদ্বেগজনক চিত্র ফুটে উঠেছে। অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগের (ইআরডি) সর্বশেষ হালনাগাদ প্রতিবেদন অনুযায়ী, গত অর্থবছরের একই সময়ের তুলনায় এবার বৈদেশিক ঋণের অর্থ ছাড় কমেছে প্রায় ২৬ শতাংশ। বিপরীতে, আগের ঋণের কিস্তি পরিশোধের চাপ বেড়েছে ১০ শতাংশ। সোমবার প্রকাশিত এই তথ্য দেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ ও সামগ্রিক বাজেট ব্যবস্থাপনার ওপর নতুন করে চাপ সৃষ্টি করছে।
তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, গত অর্থবছরের প্রথম আট মাসে যেখানে ৪১৩ কোটি ৪৪ লাখ ডলারের বৈদেশিক ঋণ ছাড় হয়েছিল, চলতি অর্থবছরের একই সময়ে তা কমে দাঁড়িয়েছে মাত্র ৩০৫ কোটি ৩০ লাখ ডলারে। অর্থাৎ, মাত্র আট মাসের ব্যবধানে ঋণ ছাড় কমেছে ১০৮ কোটি ডলারেরও বেশি। প্রকল্প বাস্তবায়নে সক্ষমতার দীর্ঘদিনের ঘাটতি এবং কর্মকর্তাদের নির্বাচনকেন্দ্রিক ব্যস্ততাকে এই স্থবিরতার প্রধান কারণ হিসেবে চিহ্নিত করেছেন ইআরডির কর্মকর্তারা। বিশেষজ্ঞদের মতে, কর্মকর্তাদের মনোযোগের বিভাজন উন্নয়ন প্রকল্পের গতি কমিয়ে দিয়েছে, যার সরাসরি প্রভাব পড়েছে বিদেশি ঋণের ব্যবহারে।
অর্থ ছাড় কমলেও গত এক দশকে নেওয়া মেগা প্রকল্পগুলোর ঋণের আসল ও সুদ পরিশোধের দায় ক্রমেই ভারী হচ্ছে। গত অর্থবছরের জুলাই-ফেব্রুয়ারি সময়ে ঋণ পরিশোধে ব্যয় হয়েছিল ২০৩ কোটি ডলার (অথবা মূল তথ্যের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ সংখ্যা), যা চলতি অর্থবছরে ১০ শতাংশ বেড়ে ২৮৯ কোটি ৯৭ লাখ ডলারে পৌঁছেছে। বাংলাদেশি মুদ্রায় এই অঙ্ক প্রায় ৩৫ হাজার ৩৯৩ কোটি টাকা। এই বিশাল অঙ্কের মধ্যে ১৯৪ কোটি ডলার খরচ হয়েছে আসলের কিস্তি মেটাতে এবং বাকি ৯৫ কোটি ডলার ব্যয় হয়েছে সুদ বাবদ। ঋণ পরিশোধের এই ঊর্ধ্বমুখী প্রবণতা সরকারের বার্ষিক বাজেটের ওপর বাড়তি দায় তৈরি করছে।
অবশ্য ঋণ প্রাপ্তির প্রতিশ্রুতি গত বছরের তুলনায় কিছুটা বেড়েছে। ২০২৪-২৫ অর্থবছরের প্রথম আট মাসে যেখানে ২৩৫ কোটি ডলারের প্রতিশ্রুতি মিলেছিল, এবার তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ২৪৩ কোটি ডলারে। যদিও অনুদান পাওয়ার প্রতিশ্রুতি আগের তুলনায় অর্ধেকেরও বেশি কমে ১৩ কোটি ডলারে নেমেছে। এর ফলে উন্নয়ন প্রকল্পে সহজ শর্তের অর্থের চেয়ে কঠিন শর্তের ঋণের ওপর নির্ভরতা আরও বাড়ছে, যা দীর্ঘমেয়াদে প্রকল্প বাস্তবায়নের চ্যালেঞ্জকে বাড়িয়ে তুলবে।
ঋণ ছাড়ের ক্ষেত্রে দেশভিত্তিক পরিসংখ্যানে দেখা যায়, গত আট মাসে সবচেয়ে বেশি অর্থ ছাড় করেছে রাশিয়া, যার পরিমাণ ৭৫ কোটি ৫১ লাখ ডলার। এর পরেই রয়েছে বিশ্বব্যাংক (৬৩ কোটি ডলার) এবং এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক (৫৬ কোটি ডলার)। এছাড়া চীন ও ভারত যথাক্রমে ২৫ কোটি ও ২৫ কোটি ৭৭ লাখ ডলার ছাড় করেছে। জাপান থেকে এসেছে প্রায় ১৯ কোটি ডলার। আন্তর্জাতিক দাতা সংস্থা ও দেশগুলোর এই সহায়তা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখলেও, অভ্যন্তরীণ প্রশাসনিক জটিলতা ও বাস্তবায়ন ব্যর্থতার কারণে ঋণের সুফল সাধারণ মানুষের দোরগোড়ায় পৌঁছানো বাধাগ্রস্ত হচ্ছে।













