বিজয়ের ৫৪ বছর: ঋণের ভারে বিপন্ন অর্জন

ছবি: ডিএসজে ইলাস্ট্রেশন
ছবি: ডিএসজে ইলাস্ট্রেশন

ছবি: ডিএসজে ইলাস্ট্রেশন

অপরিকল্পিত উন্নয়ন ও দুর্নীতির কারণে বাড়ছে বৈদেশিক ঋণ, বার্ষিক কিস্তি ও সুদের বোঝা; সঙ্গে সংকুচিত হচ্ছে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ। বিপরীতে বৈদেশিক মুদ্রা আসার প্রধান খাত রপ্তানি আয়ও গত চার মাস ধরে ধারাবাহিকভাবে কমছে, যা আগামী বছর উন্নয়নশীল দেশের তালিকাভুক্ত হওয়ার পর আরও ঝুঁকির মুখে পড়তে পারে বলে শঙ্কা রয়েছে। তেমনটা হলে দেশের ঋণ পরিশোধ সক্ষমতা আরও কমে যাবে। রক্তক্ষয়ী মুক্তিযুদ্ধে স্বাধীনতা অর্জনকারী বাংলাদেশ বিজয় অর্জনের ৫৪ বছর পূর্তির দিনে (১৬ ডিসেম্বর) এমনই কঠিন আর্থিক বাস্তবতায় দাঁড়িয়ে আছে।

উন্নয়নের আড়ালে লুটপাটের উদ্দেশ্যে নেওয়া মেগা প্রকল্প ও অপরিকল্পিত ব্যয়ের কারণে গত ১৬ বছরে বাংলাদেশ সরকারের মোট ঋণ ২ লাখ ৫২ হাজার কোটি টাকা থেকে ২১ লাখ ৫২ হাজার কোটি টাকা ছাড়িয়ে গেছে। আওয়ামী লীগ আমলে নেওয়া এই বিপুল ঋণই এখন গলার কাঁটা হয়ে দাঁড়িয়েছে। অস্বাভাবিক ব্যয়ের মেগা প্রকল্পগুলো থেকে কম আয় হওয়ায় এখন ঋণ নিয়েই ঋণ পরিশোধ করতে হচ্ছে। ঋণের ফাঁদে পড়ার ঝুঁকি তৈরি হয়েছে। সে কারণে প্রশ্ন উঠছে—ঋণ কি উন্নয়নের হাতিয়ার, নাকি তা এই দেশটিকে দিন দিন আরও গভীর শৃঙ্খলে বেঁধে ফেলছে?

এর জবাব মেলে বর্তমান সরকারের অর্থ উপদেষ্টা ড. সালেহউদ্দিন আহমেদের বক্তব্যে। বিজয় দিবসের ঠিক আগের দিন (১৫ ডিসেম্বর) তিনি বলেন, “বর্তমান প্রশাসন মূলত পূর্ববর্তী সরকার থেকে উত্তরাধিকারসূত্রে প্রাপ্ত চলমান উন্নয়ন প্রকল্পগুলোকে চালিয়ে যাওয়ার জন্য ঋণ নিয়েছে।”

তাঁর ভাষ্য, এই প্রকল্পগুলোর অনেকগুলো ইতোমধ্যেই ৫০ থেকে ৬০ শতাংশ সম্পন্ন হয়েছে; যদিও সেগুলো পরিত্যাগ করলে উল্লেখযোগ্য ক্ষতি হবে। ড. সালেহউদ্দিন বলেন, “যদি আমরা এই প্রকল্পগুলোকে মাঝপথেই বন্ধ করে দিই, তাহলে এটি অর্থনীতিবিদদের মতে ‘ডেডওয়েট লস’-এর সমান হবে, যার অর্থ ইতোমধ্যে ব্যয় করা অর্থ সম্পূর্ণরূপে নষ্ট হয়ে যাবে। এটি বিবেচনা করে আমরা বেশ কয়েকটি চলমান প্রকল্প বাস্তবায়নের সিদ্ধান্ত নিয়েছি।”

বর্তমান অন্তর্বর্তী সরকার খুব কম নতুন প্রকল্প গ্রহণ করেছে উল্লেখ করে উপদেষ্টা বলেন, “সরকার কয়েক বিলিয়ন ডলারের বৈদেশিক ঋণ পরিশোধ করেছে, যা আর্থিক শৃঙ্খলার প্রতি তার প্রতিশ্রুতিকে তুলে ধরে।”

সরকারের ঋণ বাংলাদেশকে এমন দুরবস্থার মধ্যে ফেলেছে যে এখন দেশের রাজস্ব আয়ের প্রায় ২২ শতাংশই চলে যাচ্ছে ঋণের কিস্তি ও সুদ পরিশোধে। ২০২২ সালের পর টাকার ব্যাপক অবমূল্যায়নের কারণে বৈদেশিক ঋণ শোধের পরিমাণ উল্লেখযোগ্য হারে বেড়েছে। গত ১৫ বছরে পরিশোধের হার এতটাই বেড়েছে যে বাংলাদেশ দক্ষিণ এশিয়ার মধ্যে সর্বোচ্চ অবস্থানে রয়েছে। সামনের দিনগুলোতে এর পরিমাণ আরও ব্যাপক হারে বাড়বে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।

দেশের ঋণ পরিস্থিতি নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করতে গিয়ে চলতি মাসের দ্বিতীয় সপ্তাহের শুরুতে (৮ ডিসেম্বর) জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের (এনইসি) সম্মেলন কক্ষে আয়োজিত সেমিনারে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) চেয়ারম্যান মো. আবদুর রহমান খান বলেন, “আমরা ইতোমধ্যেই ঋণের ফাঁদে পড়েছি; এ সত্য স্বীকার না করলে সামনে এগোনো সম্ভব নয়।” তিনি আরও বলেন, “কর-রাজস্ব সংগ্রহ ও ঋণ ব্যবস্থাপনায় কার্যকর পদক্ষেপ ছাড়া দেশের অর্থনৈতিক ভবিষ্যৎ ঝুঁকির মুখে পড়তে পারে।”

একই অনুষ্ঠানে অর্থনীতিবিদ অধ্যাপক মুস্তাফিজুর রহমান বলেন, “রাজস্ব আদায় না বাড়ালে ও আর্থিক শৃঙ্খলা না আনলে বাংলাদেশ ‘ঋণের ফাঁদে’ পড়তে পারে, যেখানে সরকারকে নতুন ঋণ নিয়ে পুরোনো ঋণ শোধ করতে হবে। ঋণের সুদ পরিশোধ এখন রাজস্ব বাজেটের একটি বড় খাত হয়ে দাঁড়িয়েছে, যা শিক্ষা ও কৃষির মতো খাতকে পেছনে ফেলেছে। দ্রুত সংস্কার না হলে শ্রীলঙ্কার মতো পরিস্থিতি তৈরি হতে পারে।”

বিদেশি ঋণের পরিমাণ কত

বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ হিসাব অনুযায়ী, চলতি বছরের জুন শেষে সরকারের বিদেশি ঋণ দাঁড়িয়েছে ৯ হাজার ৩৪২ কোটি মার্কিন ডলার, যা মোট ঋণের ৫২.৫২ শতাংশ। টাকার অঙ্কে (ডলারপ্রতি ১২১ টাকা হিসাবে) এর পরিমাণ ১১ লাখ ৩০ হাজার ৩৮২ কোটি টাকা। একই সময়ে সরকারের অভ্যন্তরীণ ঋণ বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১০ লাখ ২১ হাজার ৭২৯ কোটি টাকা। সব মিলিয়ে সরকারের মোট ঋণ দাঁড়িয়েছে ২১ লাখ ৫২ হাজার ১১১ কোটি টাকা, যা জিডিপির প্রায় ৩৫ শতাংশ।

আন্তর্জাতিক মানদণ্ডে জিডিপির অনুপাতে বাংলাদেশের ঋণ এখনো বিপদসীমার বাইরে থাকলেও রপ্তানির অনুপাতে দেশটি ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে। আইএমএফের হিসাবে কোনো দেশের বৈদেশিক ঋণ যদি বার্ষিক রপ্তানি আয়ের ১৮০ শতাংশ ছাড়িয়ে যায়, তবে সেটিকে ঝুঁকিপূর্ণ ধরা হয়। বাংলাদেশের এই অনুপাত এখন ১৯২ শতাংশ। টানা চার মাস রপ্তানি আয় কমতে থাকায় ঝুঁকি আরও বাড়তে পারে।

রপ্তানির সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে বৈদেশিক ঋণ না বাড়ায় ২০২৪ সালে আইএমএফ বাংলাদেশের ঝুঁকির মাত্রা ‘নিম্ন’ থেকে ‘মাঝারি’-তে উন্নীত করে।

এদিকে অর্থ মন্ত্রণালয়ের অর্থ বিভাগ জানিয়েছে, চলতি অর্থবছর শেষে সরকারের মোট ঋণ দাঁড়াবে ২৩ লাখ ৪২ হাজার কোটি টাকা। ২০২৬–২৭ অর্থবছর শেষে তা বেড়ে দাঁড়াবে ২৬ লাখ ৩ হাজার ২০০ কোটি টাকা এবং পরের বছর শেষে ২৮ লাখ ৯৩ হাজার ৮০০ কোটি টাকা ছাড়িয়ে যাবে।

আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ) বৈদেশিক ঋণের ক্রমবর্ধমান ঝুঁকি বিবেচনায় চলতি অর্থবছরের জন্য বাংলাদেশের বৈদেশিক ঋণের ওপর সীমা নির্ধারণ করেছে। এই সীমার আওতায় বাংলাদেশ সর্বোচ্চ ৮.৪৪ বিলিয়ন ডলার ঋণ নিতে পারবে। আইএমএফ ত্রৈমাসিকভাবে এই ঋণ পর্যবেক্ষণ করবে—অর্থাৎ প্রয়োজন থাকলেও ইচ্ছামতো ঋণ নেওয়ার সুযোগ থাকবে না।

ঝুঁকি কেন বাড়ছে?

দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে বাংলাদেশের ঋণ পরিশোধের হার সবচেয়ে বেশি বৃদ্ধি পেয়েছে। গত ৮ ডিসেম্বর প্রকাশিত বিশ্বব্যাংকের ইন্টারন্যাশনাল ডেট রিপোর্ট–২০২৫ অনুযায়ী, ২০২৪ সালে বাংলাদেশ মোট ৭.৩ বিলিয়ন ডলার পরিশোধ করেছে, যা ২০১০ সালের তুলনায় ৬১৭ শতাংশ বেশি। গত বছরের মোট পরিশোধের মধ্যে ৪.৯ বিলিয়ন ডলার গেছে মূল ঋণের টাকা শোধ করতে, যা ২০১০ সালে ছিল ৮২১ মিলিয়ন ডলার। অন্যদিকে ঋণের সুদ বাবদ পরিশোধ হয়েছে ২.৪ বিলিয়ন ডলার, যেখানে ২০১০ সালে ছিল মাত্র ২০৩ মিলিয়ন ডলার। গত ১৫ বছরে এই অঞ্চলের আর কোনো দেশে এত বড় আকারের বৃদ্ধি দেখা যায়নি।

বিশ্বব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ঋণ পরিশোধ হারে বাংলাদেশের পরের অবস্থানে পাকিস্তান; দেশটির ঋণ পরিশোধ বেড়েছে ২৫১ শতাংশ। এরপর রয়েছে ভারত (২৪৬ শতাংশ বৃদ্ধি) এবং শ্রীলঙ্কা (২১১ শতাংশ বৃদ্ধি)।

ঋণের প্রকৃত চাপ সৃষ্টি হয় কিস্তি শোধের সময়। ইতোমধ্যেই চলতি অর্থবছরের চার মাসে (জুলাই–অক্টোবর) বৈদেশিক ঋণ পরিশোধের পরিমাণ আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় ১০ শতাংশের বেশি বেড়েছে। আগামী ২০২৬–২৭ অর্থবছর থেকে আরও বড় ধাক্কা আসবে। কারণ, মেট্রোরেল, পদ্মা রেলসংযোগ সেতু, রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ প্রকল্প, কর্ণফুলী টানেল, মাতারবাড়ী কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের মতো মেগা প্রকল্পগুলোর কিস্তি ধারাবাহিকভাবে শুরু হবে।

কিন্তু রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র থেকে এখনো কোনো আয় আসছে না। পদ্মা রেলসংযোগ সেতুতে চলাচলকারী ট্রেনগুলো লোকসানে চলছে। আর কর্ণফুলী টানেল আয়ের পরিবর্তে প্রতিদিন ২৭ লাখ টাকা লোকসান দিচ্ছে। মেগা প্রকল্পগুলো থেকে বিনিয়োগের অনুপাতে আয় না আসায় সরকারকে ঋণ করে ঋণ পরিশোধ করতে হবে।

বাংলাদেশের জন্য সবচেয়ে বড় বিপদের কারণ রাজস্ব সংগ্রহে দুর্বলতা। জিডিপির বিপরীতে মাত্র ৮ শতাংশ রাজস্ব আয় হয়, যা দক্ষিণ এশিয়ার মধ্যে সর্বনিম্ন। বাংলাদেশের ঋণ যখন ধারাবাহিকভাবে বাড়ছে, তখন দেখা যাচ্ছে—রাজস্ব আহরণের ৯০ শতাংশ দায়িত্বে থাকা জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) ২০২৪–২৫ অর্থবছর পর্যন্ত টানা ১৩ বছর লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে ব্যর্থ হয়েছে।

বাংলাদেশের বৈদেশিক ঋণের একটি উল্লেখযোগ্য অংশ বাণিজ্যিক ঋণ। ২০২২ সালে রাশিয়া–ইউক্রেন যুদ্ধের পর থেকে ফেড ফান্ডস রেট, এসওএফআর (সিকিউরড ওভারনাইট ফাইন্যান্সিং রেট) ও প্রাইম রেটের মতো রেফারেন্স সুদের হার বেড়ে গেছে। এতে বৈদেশিক বাণিজ্যিক ঋণের সুদের হার ৬–৮ শতাংশে উন্নীত হয়েছে। একই সময়ে স্থানীয় মুদ্রার মান প্রায় ৪২ শতাংশ কমে গেছে। এসব কারণে বৈদেশিক ঋণের সুদ ব্যয় উল্লেখযোগ্য হারে বেড়েছে। বিশ্বব্যাংকের প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২৪ সালে বাংলাদেশ ঋণ পরিশোধে তার রপ্তানি আয়ের ১৬ শতাংশ ব্যয় করেছে।

বৈদেশিক ঋণের হঠাৎ উল্লম্ফন

বিশ্বব্যাংকের প্রতিবেদন অনুসারে, ২০১০ সালে বাংলাদেশের সরকারি-বেসরকারি মোট বৈদেশিক ঋণের পরিমাণ ছিল ২৬ বিলিয়ন ডলার, যা ২০২৪ সালের শেষে ১০ হাজার ৪৪৮ কোটি ডলারে দাঁড়িয়েছে। পাঁচ বছর আগে, অর্থাৎ ২০২০ সালে, এর পরিমাণ ছিল ৭ হাজার ৩৫৫ কোটি ডলার। পাঁচ বছরের ব্যবধানে ঋণের পরিমাণ বেড়েছে ৪২ শতাংশ।

গত পাঁচ বছরে বৈদেশিক ঋণের সুদ ও আসল পরিশোধের পরিমাণও প্রায় দ্বিগুণ হয়েছে। ২০২০ সালে বৈদেশিক ঋণের বিপরীতে সুদ ও আসল মিলিয়ে ৩৭৩ কোটি ডলার পরিশোধ করতে হয়েছিল, যা ২০২৪ সালে বেড়ে দাঁড়ায় প্রায় ৭৩৫ কোটি ডলারে।

তবে গত পাঁচ বছরে ঋণ ছাড় খুব একটা বাড়েনি। বিশ্বব্যাংক বলছে, ২০২৪ সালে সরকারি-বেসরকারি খাতে ঋণ ছাড়ের পরিমাণ ছিল ১ হাজার ১১০ কোটি ডলার; পাঁচ বছর আগে যা ছিল ১ হাজার ২২ কোটি ডলার।

বাংলাদেশ সবচেয়ে বেশি ঋণ পায় বিশ্বব্যাংকের ইন্টারন্যাশনাল ডেভেলপমেন্ট অ্যাসোসিয়েশন (আইডিএ) থেকে। আইডিএর মোট ঋণের প্রায় ৩০ শতাংশই পায় বাংলাদেশ, নাইজেরিয়া ও পাকিস্তান। বাংলাদেশের মোট বৈদেশিক ঋণের প্রায় ২৬ শতাংশই বিশ্বব্যাংক থেকে নেওয়া। এরপরের অবস্থানে রয়েছে এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক (এডিবি) ও জাপান।

রিজার্ভ সংকটের কারণে বাংলাদেশ ইতোমধ্যে বিশ্বব্যাংক, এডিবি ও আইএমএফের কাছে অতিরিক্ত সহায়তা চাইতে বাধ্য হয়েছে। অর্থনীতিবিদদের মতে, “রিজার্ভ সংকটই এখন বাংলাদেশের ঋণঝুঁকিকে সামনে এনে দাঁড় করিয়েছে।”

চট্টগ্রামে ১২ ডিসেম্বর আয়োজিত এক অর্থনৈতিক সম্মেলনে প্রধান উপদেষ্টার আন্তর্জাতিক বিষয়সংক্রান্ত বিশেষ দূত ড. লুৎফে সিদ্দিকী বলেন, “এই মুহূর্তে সরকারের বাজেট ব্যয়ের সবচেয়ে বড় খাত হলো ঋণের সুদ। এনবিআরের যত রাজস্ব আয় হচ্ছে, তার ২১ শতাংশ শুধু সুদের পেছনেই যাচ্ছে—প্রতি ঘণ্টায় প্রায় ১৪ কোটি টাকা।”

ড. লুৎফে সিদ্দিকী বলেন, “আমাদের দুটি ঘাটতি আছে—বাহ্যিক ঘাটতি ও অভ্যন্তরীণ ঘাটতি। বাহ্যিক ঘাটতি হলো, আমাদের রপ্তানির তুলনায় আমদানি বেশি। আমরা রপ্তানি করি মূলত তৈরি পোশাক, আর আমদানি করি খাদ্য, সার ও জ্বালানি। দেশের ভেতরে ঋণ নিয়ে ঘাটতি সামাল দিচ্ছি। কিন্তু ঋণ তো পরিশোধ করতেই হবে। ঋণ নেওয়া খারাপ নয়, যদি নজর থাকে—এই টাকা বিনিয়োগ হচ্ছে, নাকি অপচয় হয়ে যাচ্ছে।”

দুই দশক ধরে অর্থ–বাণিজ্যবিষয়ক সাংবাদিকতায় সক্রিয় আলতাফ মাসুদ বলেন, “ঋণের বড় অংশই গেছে রাজনৈতিক সিদ্ধান্তে নেওয়া প্রকল্পে, দুর্নীতি ও অদক্ষতায়, অস্বাভাবিক হারে প্রকল্প ব্যয় বাড়িয়ে এবং এমন প্রকল্পে, যেগুলো থেকে বিনিয়োগের তুলনায় কম রিটার্ন এসেছে। ফলে বাংলাদেশ ইতোমধ্যে মধ্যম মাত্রার ঋণঝুঁকিতে প্রবেশ করেছে, যা আগামী কয়েক বছরে উচ্চ ঝুঁকিতে রূপ নিতে পারে।”

তিনি আরও বলেন, “এ জন্য এখনই বড় ধরনের নীতিগত সংস্কার, প্রকল্প মূল্যায়নে কঠোরতা, ব্যাংকিং খাত সংস্কার, রিজার্ভ ব্যবস্থাপনায় স্বচ্ছতা, মেগা প্রকল্পে রিটার্ন নিশ্চিতকরণ, বাজেটে অপ্রয়োজনীয় ব্যয় কমানো এবং করজাল বিস্তৃত করার ওপর জোর দিতে হবে। এগুলো ছাড়া দেশ উন্নয়ন নয়, ঋণনির্ভরতার চক্রে আটকে পড়বে।”

এলডিসি উত্তরণ: নতুন ঝুঁকির দরজা

২০২৬ সালে বাংলাদেশ স্বল্পোন্নত দেশের (এলডিসি) তালিকা থেকে বের হলে ইউরোপীয় ইউনিয়নসহ বিভিন্ন দেশে যে বাণিজ্য সুবিধা এখন পাওয়া যাচ্ছে, তা বন্ধ হয়ে যেতে পারে। এতে তৈরি পোশাক খাতের শুল্কমুক্ত সুবিধা হারানোর ঝুঁকি তৈরি হবে। রপ্তানি আয়ের প্রধান খাত—যেখান থেকে মোট রপ্তানির ৮০–৮৫ শতাংশ আসে—গুরুতর চাপের মুখে পড়তে পারে।

এখন পর্যন্ত বাংলাদেশ এলডিসি হিসেবে নমনীয় শর্তে অধিকাংশ বৈদেশিক ঋণ পেয়ে এসেছে। কিন্তু এলডিসি উত্তরণের পর এই সুবিধা ধীরে ধীরে কমে যাবে। সুদের হার বাড়বে, অনুদান কমবে, বাণিজ্য সুবিধা হ্রাস পাবে, বাণিজ্য ঘাটতি বাড়বে এবং বৈদেশিক ঋণ হয়ে উঠবে আরও কঠিন শর্তযুক্ত। অর্থনীতিবিদদের মতে, এটিই হবে বাংলাদেশের ঋণঝুঁকির সবচেয়ে বড় ‘টার্নিং পয়েন্ট’।

এলডিসি থেকে উত্তরণ প্রসঙ্গে গত ২৫ নভেম্বর বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান বলেন, “অ্যাঙ্গোলা ও সামোয়ার মতো দেশগুলোর জন্য উত্তরণের সময়সীমা পরিবর্তন করা হয়েছে। জাতিসংঘের নিয়মেও বলা আছে—কোনো দেশ বড় ধরনের অর্থনৈতিক ধাক্কায় পড়লে সময়সীমা নিয়ে নমনীয়তা দেখানো যায়। সে ক্ষেত্রে অন্তর্বর্তী সরকারের দায়িত্বশীল আচরণ করা উচিত।”

তারেক রহমান আরও বলেন, “সরকারি নথিতেই বলা হয়েছে—ব্যবসায়ীরা ব্যাংকিং খাতে চাপ, বৈদেশিক মুদ্রাবাজারের অস্থিরতা, ঋণঝুঁকি বৃদ্ধি ও রপ্তানি শ্লথ হওয়ার চাপ মোকাবিলা করছেন। বাংলাদেশ এগিয়ে যাওয়ার যোগ্যতা অর্জন করেছে, কিন্তু ‘যোগ্য’ হওয়া আর ‘প্রস্তুত’ হওয়া এক বিষয় নয়।” তিনি অভিযোগ করেন, “বর্তমান সরকার দ্রুততা ও অনিবার্যতার অজুহাতে যৌক্তিক উদ্বেগগুলো উপেক্ষা করছে।”

Share this article

আপনারা চাইলে কাস্টম বিজ্ঞাপন এইখানে দিতে পারেন
বিজ্ঞাপনের ছবি বা ভিডিও সাইজ ৩৩৬x২৮০ পিক্সাল হতে হবে

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Scroll to Top