সরকার গঠনের মাত্র ২১ দিনের মাথায় নির্বাচনী ইশতেহার অনুযায়ী দেশব্যাপী ‘ফ্যামিলি কার্ড’ কার্যক্রমের সূচনা করেছে বর্তমান সরকার।
মঙ্গলবার (১০ মার্চ) বনানী টিঅ্যান্ডটি মাঠে আয়োজিত মূল অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান আনুষ্ঠানিকভাবে এই কর্মসূচির উদ্বোধন করেন। একই দিনে সারা দেশের ১৪টি স্থানে একযোগে এই কার্ড বিতরণ শুরু হয়েছে।
উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রী ডিজিটাল বাটন প্রেস করার সঙ্গে সঙ্গেই ৩৭ হাজার ৫৬৭টি সুবিধাভোগী পরিবারের কাছে সরাসরি আড়াই হাজার টাকা করে পৌঁছে যায়।
তারেক রহমান বলেন, “আমি দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করি, আগামী ৫ বছরের মধ্যে দেশের ৪ কোটি পরিবারের কাছে পর্যায়ক্রমে এই কার্ড পৌঁছে দিতে আমরা সক্ষম হবো।”
ইরান যুদ্ধের প্রেক্ষাপটে সৃষ্ট বৈশ্বিক অর্থনৈতিক অস্থিতিশীলতার দিকে ইঙ্গিত করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, “দেশের মানুষের প্রত্যাশা বর্তমান সরকারের কাছে অনেক, সেটি আমরা বুঝতে পারি। আমরা যে প্রতিশ্রুতিগুলো দিয়েছিলাম, তা থেকে বিন্দুমাত্র অবস্থান পরিবর্তন করব না। তবে বৈশ্বিক পরিস্থিতির কারণে ক্ষেত্রবিশেষে কিছু প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নে হয়তো সময় বেশি লাগতে পারে। তাই সবাইকে ধৈর্যের সঙ্গে পরিস্থিতি মোকাবিলার অনুরোধ করছি।”
ইরান যুদ্ধের উত্তাল পরিস্থিতির প্রেক্ষাপটে প্রবাসী বাংলাদেশিদের সহায়তায় প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয় একটি বিশেষ নিয়ন্ত্রণ কক্ষ খুলেছে। ইস্কাটনে অবস্থিত এই কন্ট্রোল রুমটি ১৬ মার্চ পর্যন্ত ২৪ ঘণ্টা (তিন শিফটে) কার্যক্রম পরিচালনা করবে বলে সরকারের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে।
প্রধানমন্ত্রী যোগ করেন, “আমরা একটি দায়িত্বশীল সরকার। বিএনপি নেতৃত্বাধীন সরকার জনগণের কাছে জবাবদিহি করতে বাধ্য।”
এদিন সরকারের মন্ত্রীরাও সরব ছিলেন ফ্যামিলি কার্ড নিয়ে।
“আমাদের লক্ষ্য ‘ওয়ান সিটিজেন, ওয়ান কার্ড’। এটি একটি সর্বজনীন ব্যবস্থা,” উল্লেখ করে সমাজকল্যাণ মন্ত্রী ডা. এ জেড এম জাহিদ হোসেন বলেন, “এখানে রাজনৈতিক বা ধর্মীয় পরিচয়ের ভিত্তিতে কাউকে আলাদা করা হবে না; বরং বাংলাদেশের নাগরিক পরিচয়ই হবে প্রধান ভিত্তি।”
চট্টগ্রামে অর্থ ও পরিকল্পনা মন্ত্রী আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী বলেন, “প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের কল্যাণ রাষ্ট্র পরিকল্পনার প্রথম পদক্ষেপ এই ফ্যামিলি কার্ড। এটি প্রমাণ করে, সঠিক নেতৃত্ব থাকলে স্বল্প সময়েও বড় প্রকল্প বাস্তবায়ন সম্ভব।”
“আমরা এমন একটি অর্থনীতি গড়তে চাই, যেখানে পিছিয়ে পড়া মানুষের কল্যাণই হবে প্রধান লক্ষ্য,” যোগ করেন বিএনপির এই সিনিয়র নেতা।
ঢাকায় আন্তর্জাতিক নারী দিবসের এক সেমিনারে আইনমন্ত্রী মো. আসাদুজ্জামান বলেন, “নারীদের হাতে কার্ডের মালিকানা তুলে দেওয়া সরকারের শ্রদ্ধাবোধের নিদর্শন। আমরা নারীদের কুসংস্কারের অন্ধকার থেকে বের করে অর্থনৈতিকভাবে স্বাবলম্বী করতে চাই।”
সুনামগঞ্জে বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির বলেন, “সরকার গঠনের মাত্র ২১ দিনের মাথায় দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলে এই কর্মসূচি শুরু হওয়া প্রমাণ করে যে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নে কতটা দৃঢ়প্রতিজ্ঞ।”
বান্দরবানে দুর্নীতির বিরুদ্ধে কড়া হুঁশিয়ারি দিয়ে পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক মন্ত্রী দীপেন দেওয়ান বলেন, “ফ্যামিলি কার্ড বিতরণে বা সরকারি কোনো কাজে কেউ যাতে দুর্নীতির আশ্রয় না নেয়, সেদিকে কড়া নজরদারি রাখা হচ্ছে।”
আসছে কৃষক ও ই-হেলথ কার্ড
ফ্যামিলি কার্ডের পাশাপাশি সরকার ডিজিটাল কল্যাণ রাষ্ট্র গড়ার লক্ষ্যে আরও দুটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ নিয়েছে। কৃষকের ফসলের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করতে ‘কৃষক কার্ড’ এবং তৃণমূল পর্যায়ে স্বাস্থ্যসেবা পৌঁছে দিতে ‘ই-হেলথ কার্ড’ চালুর কাজ পুরোদমে চলছে।
প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনায় সরকারি পরিত্যক্ত ভবনগুলোকে স্বাস্থ্যকেন্দ্রে রূপান্তরের পাশাপাশি স্বাস্থ্যকর্মী নিয়োগ প্রক্রিয়াও শুরু হয়েছে।
নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নে সরকারের এসব পদক্ষেপ সাধারণ মানুষের আস্থা অর্জনে বড় ভূমিকা রাখবে বলে মনে করছেন ক্ষমতাসীনরা। তাদের ভাষ্য, এই কার্ডভিত্তিক কার্যক্রম সীমিত সম্পদের মধ্যেও সরাসরি জনগণের দোরগোড়ায় সেবা পৌঁছে দেওয়ার কৌশলগত রূপরেখা।
অর্থনীতির দৃষ্টিতে এটি একটি ‘প্রগ্রেসিভ পলিসি’ বা প্রগতিশীল নীতি। তবে এর দীর্ঘমেয়াদী সফলতার জন্য প্রয়োজন টাকার সঠিক মনিটরিং, বাজারে পণ্যের সরবরাহ নিশ্চিত করা এবং সুবিধাভোগীদের ধীরে ধীরে কর্মসংস্থানের দিকে নিয়ে যাওয়া, যাতে তারা কেবল সহায়তার ওপর নির্ভরশীল না হয়ে স্বাবলম্বী হতে পারে।













