“পাপেট ব্যবসায়ী সংগঠন আর নয়-ছয়ের অর্থনীতি চলবে না”

ডিএসজে কোলাজ
ডিএসজে কোলাজ

বাংলাদেশের অর্থনীতিকে দীর্ঘ দিন ধরে যে ‘নয়-ছয়’, সুবিধাবাদী নীরবতা ও কৃত্রিম পরিসংখ্যানের ওপর দাঁড় করিয়ে রাখা হয়েছিল—তার বিরুদ্ধে প্রকাশ্য অবস্থান নিয়েছেন বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর ড. আহসান এইচ মনসুর। এলডিসি (স্বল্পোন্নত দেশ) থেকে উত্তরণ প্রশ্নে ব্যবসায়ী সংগঠনগুলোর চাপ, আবেগ ও ভয়ভিত্তিক যুক্তিকে কার্যত অগ্রাহ্য করে তিনি সোজাসাপ্টা ভাষায় বলেছেন, “আমরা পাপেট (তথা ক্রীড়ানক) ব্যবসায়ী সংগঠন চাই না।”

ঢাকার বনানীর হোটেল শেরাটনে মঙ্গলবার (২৭ জানুয়ারি) ইন্টারন্যাশনাল চেম্বার অব কমার্স, বাংলাদেশ (আইসিসিবি) আয়োজিত গোলটেবিল বৈঠকে গভর্নরের এই বক্তব্য শুধু এলডিসি বিতর্ক নয়, বরং বাংলাদেশের রাজনৈতিক-অর্থনৈতিক ক্ষমতার ভারসাম্য নিয়েই নতুন প্রশ্ন তুলেছে।

গভর্নরের বক্তব্যে সবচেয়ে তীক্ষ্ণ আঘাত আসে ব্যবসায়ী নেতৃত্বের অতীত ভূমিকা নিয়ে। তিনি বলেন, “যখন ৬ ও ৯ শতাংশ সুদহার বেঁধে দেওয়া হয়েছিল, তখন ব্যবসায়ী সংগঠনগুলো তালি দিয়েছিল। যখন দেশ থেকে বিলিয়ন বিলিয়ন ডলার পাচার হয়েছে, তখনও তারা চুপ ছিল।” এই বক্তব্য কার্যত এফবিসিসিআইসহ বিভিন্ন শিল্পগোষ্ঠী ও খাতভিত্তিক সংগঠনগুলোর ‘নির্বাচিত নীরবতা’কে প্রকাশ্যে অভিযুক্ত করে। গভর্নরের মতে, এ ধরনের সুবিধাবাদী আচরণ গণতন্ত্রকে শক্তিশালী করে না, বরং রাষ্ট্রীয় সুশাসনের ভিত দুর্বল করে।

গভর্নর স্বীকার করেন যে বাংলাদেশে সুদহার বর্তমানে বেশি। তবে এর পেছনের কাঠামোগত সত্য তুলে ধরে তিনি বলেন—প্রায় ২০ বিলিয়ন ডলার অর্থ পাচার, খেলাপি ঋণের বিস্ফোরণ, আমানত প্রবৃদ্ধি একসময় ৬ শতাংশে নেমে যাওয়া ও ব্যাংকিং খাতে আস্থার ধস—এই বাস্তবতায় কঠোর মুদ্রানীতি ছাড়া বিকল্প ছিল না। তাঁর ভাষায়, “সুশাসন ও জবাবদিহি না থাকলে সুদহার কখনো টেকসইভাবে কমানো যায় না।”

গোলটেবিলে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ব্যাংক ম্যানেজমেন্টের (বিআইবিএম) অধ্যাপক শাহ মো. আহসান হাবিব। আলোচনায় হা-মীম গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও আইসিসি বাংলাদেশের ভাইস প্রেসিডেন্ট এ. কে. আজাদ বলেন, মূল্যস্ফীতি কমানোর জন্য মুদ্রানীতি কঠোর করা হয়েছে। তবে মূল্যস্ফীতির সঙ্গে রাজস্বসহ অনেক বিষয় সম্পৃক্ত। মুদ্রানীতি কঠোর করার ফলে এরই মধ্যে ১২ লাখ লোক চাকরি হারিয়েছে এবং আগামী ছয় মাসে আরও ১২ লাখ লোক চাকরি হারাবে বলে তাঁর আশঙ্কা।

তিনি মূল প্রবন্ধে উঠে আসা কয়েকটি বিষয়ে দৃষ্টি আকর্ষণ করে বলেন, এলডিসি উত্তরণ হলে রপ্তানি আয়ের ওপর প্রভাব পড়বে। পদ্ধতিগত চাপের মাধ্যমে রপ্তানি আরও কমে যেতে পারে এবং ব্যাংক খাতে তারল্য সংকট সৃষ্টি করতে পারে। তিনি আরও বলেন, বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থান বৃদ্ধি ছাড়া শুধু মুদ্রানীতি দিয়ে অর্থনীতি সামাল দেওয়া সম্ভব হবে না। নির্বাচিত সরকার আসার পর এলডিসি উত্তরণের প্রভাব কী হবে, ব্যবসায়ীদের অভিজ্ঞতার আলোকে তা বোঝাতে হবে।

ব্যবসায়ীদের একাংশ এলডিসি থেকে উত্তরণের সময় পিছিয়ে দেওয়ার যে দাবি তুলছেন, গভর্নর সেটিকে কার্যত ‘ভয়ভিত্তিক রাজনীতি’ হিসেবে দেখছেন। তিনি স্পষ্ট বলেন, “আজ হোক, কাল হোক বা দুই বছর পরে—বাংলাদেশ এলডিসি থেকে উত্তরণ করবেই।” তাঁর মতে, মাথাপিছু আয়, মানবসম্পদ, অর্থনৈতিক ভঙ্গুরতা—সব সূচকে বাংলাদেশ অনেক আগেই এলডিসি তালিকার বহু দেশের চেয়ে এগিয়ে গেছে। গভর্নরের প্রশ্ন, “আমরা কি সোমালিয়া বা দক্ষিণ সুদানের কাতারে থাকতে চাই, নাকি মর্যাদা নিয়ে উন্নয়নশীল দেশের কাতারে যাব?”

‘নয়-ছয়ের’ যুগ শেষ করার ঘোষণা

বাংলাদেশের অর্থনৈতিক পরিসংখ্যান নিয়ে দীর্ঘদিনের কৌশলী ‘মেকআপ’-এর প্রসঙ্গও তুলেছেন গভর্নর। তাঁর মতে, মূল্যস্ফীতি কখনোই প্রকৃত অর্থে কম ছিল না, খেলাপি ঋণ বরাবরই বেশি ছিল এবং সুদহার কৃত্রিমভাবে চাপা দিয়ে রাখা হয়েছিল। “আমরা আর নয়-ছয় করব না”—এই ঘোষণার মধ্য দিয়ে গভর্নর স্পষ্ট বার্তা দিয়েছেন যে, বাস্তবতার মুখোমুখি না হলে সংস্কার সম্ভব নয়।

গভর্নরের বক্তব্য অনুযায়ী, ডলারের দর ১২২ টাকায় স্থিতিশীল রয়েছে এবং বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ বেড়ে ৩২ বিলিয়ন ডলার হয়েছে, যা জুনের মধ্যে ৩৫ বিলিয়ন ডলারে উন্নীত করার লক্ষ্যমাত্রা রয়েছে। এগুলোকে তিনি ‘নীতিনির্ভর স্থিতিশীলতার প্রাথমিক ফল’ হিসেবে উল্লেখ করেন।

সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বার্তা আসে ব্যাংক খাতের ভবিষ্যৎ শাসনব্যবস্থা নিয়ে। গভর্নর জানান, বাংলাদেশ ব্যাংক অর্ডার, ব্যাংক কোম্পানি আইন ও অর্থঋণ আদালত আইন—এসব সংশোধনের প্রস্তাব চার মাস ধরে সরকারের টেবিলে পড়ে আছে। তাঁর মতে, এগুলো অনুমোদন না হলে ভবিষ্যতেও ব্যাংক খাত রাজনৈতিক হস্তক্ষেপের ঝুঁকিতে থাকবে।

আইসিসি বাংলাদেশের চেয়ারম্যান মুহাম্মদ এ. (রুমী) আলী অনুষ্ঠানে স্বাগত বক্তব্য দেন। পরে আইসিসি বাংলাদেশের সভাপতি মাহবুবুর রহমান অনুষ্ঠানের সূচনা বক্তব্য দেন ও অধিবেশন পরিচালনা করেন। আলোচক হিসেবে বক্তব্য দেন ট্রান্সকম গ্রুপের চিফ এক্সিকিউটিভ অফিসার ও এসকেএফ ফার্মাসিউটিক্যালস লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক সিমিন রহমান, প্লামি ফ্যাশনস লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. ফজলুল হক, মিউচুয়াল ট্রাস্টি ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক সৈয়দ মাহবুবুর রহমান, প্রাইম ব্যাংকের এমডি হাসান ও. রশিদ এবং পিকার্ড বাংলাদেশের উপব্যবস্থাপনা পরিচালক অমৃতা মাকিন ইসলাম।

Share this article

আপনারা চাইলে কাস্টম বিজ্ঞাপন এইখানে দিতে পারেন
বিজ্ঞাপনের ছবি বা ভিডিও সাইজ ৩৩৬x২৮০ পিক্সাল হতে হবে

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Scroll to Top