পুঁজিবাজারে কী প্রভাব ফেলে জাতীয় নির্বাচন?

ছবি: ডিএসজে কোলাজ
ছবি: ডিএসজে কোলাজ

ছবি: ডিএসজে কোলাজ

জাতীয় নির্বাচন ঘিরে দীর্ঘদিন যে অনিশ্চয়তা ও শঙ্কা ছিল, সম্প্রতি (১১ ডিসেম্বর) তফসিল ঘোষণার পর তা অনেকটাই প্রশমিত হয়েছে। রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা দূর হওয়া পুঁজিবাজার, অর্থনীতি ও বিনিয়োগকারীর মনস্তত্ত্ব—সব ক্ষেত্রেই ইতিবাচক সংকেত দেয়। কারণ অনিশ্চয়তাই পুঁজিবাজারের সবচেয়ে বড় শত্রু। অবশ্য শুধু নির্বাচন পুঁজিবাজারে যে প্রভাব ফেলতে পারে, তা সাময়িক। তবে প্রকৃত উন্নয়নের জন্য প্রয়োজন নীতিগত সংস্কার ও প্রাতিষ্ঠানিক স্থিতিশীলতা।

নির্বাচন ঘিরে নতুন সরকার বা নীতি পরিবর্তনের সম্ভাবনায় বাজারে নতুন গতি সৃষ্টি হতে পারে, যেটি বাংলাদেশের ক্ষেত্রে দেখা গিয়েছিল ২০০৮ সালের নির্বাচনের পর। তবে এরপর আওয়ামী সরকারের অধীনে তিনটি নির্বাচন হলেও পুঁজিবাজারে উল্লেখযোগ্য কোনো প্রভাব দেখা যায়নি। একই নিয়ন্ত্রক, একই কারসাজি, দুর্বল তদারকি ও নীতিতে কোনো পরিবর্তন না আসার কারণে ২০১৪, ২০১৮ ও ২০২৪ সালের নির্বাচনে পুঁজিবাজারে কোনো মৌলিক পরিবর্তন আসেনি। বরং একতরফা নির্বাচন ও নিয়ন্ত্রক সংস্থার ফ্লোর প্রাইসের মতো বিতর্কিত সিদ্ধান্ত গ্রহণের কারণে বিদেশি বিনিয়োগ কমে যায়, পতন ত্বরান্বিত হয়।

বাংলাদেশের পুঁজিবাজারের গত তিন দশকের চিত্র পর্যালোচনায় দেখা যায়, অধিকাংশ ক্ষেত্রেই নির্বাচন পুঁজিবাজারে উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন ঘটায়নি। কারণ নির্বাচনে অংশগ্রহণকারী দলগুলোর ইশতেহারে পুঁজিবাজারের উন্নয়ন নিয়ে সুস্পষ্ট প্রতিশ্রুতি থাকে না। এবারের নির্বাচনেও একই অবস্থা লক্ষ্য করা যায়। আসন্ন নির্বাচনে সম্ভাব্য বিজয়ী দল বিএনপির রাষ্ট্র মেরামতের ৩১ দফায় পুঁজিবাজার নিয়ে সুস্পষ্টভাবে কিছু নেই। তবে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ও সাবেক বাণিজ্যমন্ত্রী আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী সম্প্রতি বলেছেন, তাদের দল ক্ষমতায় এলে পুঁজিবাজারকে রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত করে স্বাধীন ও শক্তিশালী বাজারব্যবস্থা গড়ে তোলা হবে।

শুধু নির্বাচন পুঁজিবাজারে বিশেষ প্রভাব ফেলে—বিশ্বে এমন নজির কমই দেখা গেছে। গত দুই দশকের আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতা বলছে, নির্বাচন পুঁজিবাজারে তাৎক্ষণিক মনস্তাত্ত্বিক প্রভাব ফেললেও টেকসই উন্নতি আসে কেবল নীতিগত সংস্কার, নিয়ন্ত্রক স্বাধীনতা ও রাজনৈতিক হস্তক্ষেপমুক্ত ব্যবস্থার মাধ্যমে। ২০০৩ সালে ভারতের সেনসেক্স সূচক ছিল ৩,০০০ পয়েন্টে, যা এখন ৮৫,২১৩ পয়েন্ট। এ সময়ে প্রতিটি নির্বাচনে সরকার পরিবর্তন কিংবা স্থিতিশীলতায় বাজার প্রতিক্রিয়া দেখিয়েছে। বিশেষ করে ২০১৪ সালে মোদি সরকারের বিজয়, নীতির ধারাবাহিকতা, শক্তিশালী নিয়ন্ত্রক ও বাজারবান্ধব সংস্কারের কারণে সূচকটি ধারাবাহিকভাবে বেড়ে ২২,০০০ থেকে ৮৫,০০০ পয়েন্ট ছাড়িয়ে গেছে।

ব্রাজিলে নির্বাচন কখনো সহায়ক ছিল, আবার কখনো ক্ষতির কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। রাজনৈতিক অনিশ্চয়তায় বাজার পড়েছে। আবার বাজারবান্ধব প্রার্থী এলে সূচক বেড়েছে। তবে রাজনৈতিক অস্থিরতায় বাজার মাঝে মাঝে ধাক্কা খেলেও সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এগিয়েছে। ইন্দোনেশিয়ার শান্তিপূর্ণ নির্বাচন বাজারকে স্বস্তি দিয়েছে। জাকার্তা স্টক এক্সচেঞ্জ উল্লেখযোগ্যভাবে বড় হয়েছে, স্থানীয় ও বিদেশি বিনিয়োগ বেড়েছে।

গত দুই দশকে বিশ্বের অধিকাংশ পুঁজিবাজারে উন্নতি দেখা গেলেও ব্যতিক্রম বাংলাদেশ। ২০১০ সালে ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের (ডিএসই) প্রধান মূল্য সূচক ৮,৭০০ পয়েন্ট পার হলেও ১৫ বছর পরও সূচক রয়ে গেছে ৫ হাজার পয়েন্টের নিচে। ২০১৪, ২০১৮ ও ২০২৪ সালের বিরোধীদলহীন একপেশে নির্বাচন বাজারে উল্লেখযোগ্য গতি আনতে পারেনি।
অবশ্য নির্বাচন ছাড়াও পুঁজিবাজারের উন্নতি সম্ভব, যার প্রমাণ হচ্ছে ভিয়েতনাম। দেশটিতে একদলীয় শাসন থাকলেও নীতির ধারাবাহিকতা ও বিদেশি বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশের কারণে ভিয়েতনামের পুঁজিবাজারের বাজারমূলধন ১০ গুণ বেড়েছে।

পর্যালোচনায় দেখা যায়, বাংলাদেশের পুঁজিবাজারে জাতীয় নির্বাচনের চাইতে কারসাজিকারকেরা সূচক বাড়াতে সবচেয়ে বেশি ভূমিকা রাখতে পারেন। ১৯৯৬ ও ২০১০ সালের কারসাজি তার প্রমাণ। আবার নীতিগত কোনো পরিবর্তন না হলেও ২০২০–২১ সালে করোনার সময়ে সালমান এফ রহমানসহ অন্যান্য কারসাজিকারকের সহযোগিতায় প্রায় তিন বছর সূচক বৃদ্ধির ঘটনা ঘটে। সে সময় ডিএসইর সূচক ৭,৩৬৭ পয়েন্ট পর্যন্ত উঠেছিল, যদিও পরে তা কমে গিয়ে আবারও তলানিতে নেমে যায়।

বাংলাদেশের পুঁজিবাজারের উন্নতি কিংবা ক্ষতির বিষয়টিতে শুধু নির্বাচিত সরকার নয়, অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সময়েও বেশ পার্থক্য দেখা গেছে। ২০০৭ সালের অন্তর্বর্তী সরকারে থাকাকালীন মির্জা আজিজুল ইসলাম পুঁজিবাজারের গভীরতা বাড়াতে বেশ কয়েকটি সরকারি ও বহুজাতিক কোম্পানি তালিকাভুক্ত করতে পেরেছিলেন, যা বাজারের গতি ফেরাতে ইতিবাচক ভূমিকা রেখেছিল। এর সুফল পরবর্তী নির্বাচিত সরকারও পেয়েছিল। কিন্তু ইউনুসের নেতৃত্বাধীন সরকারের পুঁজিবাজার উন্নয়নের কাজ এখন পর্যন্ত ঘোষণাতেই সীমাবদ্ধ।

২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর মাত্র চার কার্যদিবসে ডিএসইর প্রধান সূচক ৭৪৬ পয়েন্ট বা ১৫ শতাংশ বেড়ে যায়। কিন্তু পরে বিএসইসির নতুন কমিশনের বাজারবান্ধব কর্মসূচির অভাবে মন্দা দেখা দেয়। খন্দকার রাশেদ মাকসুদের নেতৃত্বে নতুন কমিশন যোগদানের পর নতুন আইপিও বন্ধ করে দেয়। তালিকাভুক্তির আবেদনগুলো ফেরত পাঠানো হয়। ফলে গত প্রায় দেড় বছর ধরেই আইপিওশূন্য অবস্থায় রয়েছে বাজার।

চলতি বছরের মে মাসে পুঁজিবাজারের উন্নয়নে সরকারি ও বহুজাতিক কোম্পানির তালিকাভুক্তির ঘোষণা দিয়েছিলেন ড. মুহাম্মদ ইউনুসের সরকার। কিন্তু সেই ঘোষণার পর ছয় মাস পেরিয়ে গেলেও নতুন আইপিওর তালিকাভুক্তি দূরের কথা, আইপিওর প্রস্তুতি নিচ্ছে এমন কোনো কোম্পানির কথা শোনা যায়নি। বর্তমান সরকারের প্রধানসহ একাধিক উপদেষ্টা অর্থনীতিবিদ হলেও পুঁজিবাজারের গুরুত্ব বাড়েনি। বরং বিনিয়োগকারীদের হতাশা বেড়েছে। হাসিনা পতনের পরবর্তী চার কার্যদিবসে যে উত্থান দেখা গিয়েছিল, তা মিলিয়ে যেতে সময় লাগেনি।

নীতিতে উল্লেখযোগ্য পরিবর্তনের অনুপস্থিতি ও কাঠামোগত সংস্কারের অভাবে বাংলাদেশের পুঁজিবাজারে অস্থিরতা রয়ে গেছে। বর্তমান সরকারের আমলে সূচক আরও কমেছে। ২০২৪ সালের ৪ আগস্ট ডিএসইর প্রধান সূচক ছিল ৫,২২৯ পয়েন্টে, যা গতকাল নেমে এসেছে ৪,৮৯০ পয়েন্টে। বাজার অস্থিরতায় বিনিয়োগকারীদের অভিযোগ হচ্ছে, নিয়ন্ত্রক সংস্থার বর্তমান চেয়ারম্যান খন্দকার রাশেদ মাকসুদ বাজারবান্ধব সংস্কার আনতে ব্যর্থ হয়েছেন। শুধুমাত্র শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণেই কমিশনের কার্যক্রম সীমাবদ্ধ।

সীমিত অভিজ্ঞতার বর্তমান কমিশন প্রায় দেড় বছরে মাত্র একটি বিধিমালা সংস্কার করতে পেরেছে, যেটি বৈষম্যমূলক বিবেচনায় ইতিমধ্যেই উচ্চ আদালতে চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছে। গত দেড় বছরে একটি আইপিও আনতে পারেনি কমিশন। আইপিও বিধিমালা সংস্কারের ঘোষণা দেওয়া হলেও তা এখনো চূড়ান্ত করতে পারেনি। বরং খসড়া আইপিও বিধিমালায় যেসব শর্ত রাখা হয়েছে, তাতে নতুন কোনো কোম্পানিকে তালিকাভুক্ত করাই কঠিন বলে মনে করছেন স্টেকহোল্ডাররা।

উল্টো অন্তর্বর্তী সরকারের দেড় বছরের মধ্যেই পুঁজিবাজারে আস্থাহীনতা তৈরি হয়েছে। রাজনৈতিক ও নিয়ন্ত্রক সংস্থার কার্যক্রমে যে অনিশ্চয়তা সৃষ্টি হয়েছে, তাতে করে অধিকাংশ বড় বিনিয়োগকারী সাইডলাইনে ফিরে গেছেন। বিএসইসির চেয়ারম্যানের স্বেচ্ছাচারিতা, সংস্থার ১৬ কর্মকর্তা-কর্মচারীর বিরুদ্ধে মামলা, ২১ কর্মকর্তাকে সাময়িক বরখাস্ত করা, যৌক্তিক কারণ ছাড়াই ব্রোকারেজ হাউস বন্ধ করে দেওয়াসহ সংস্কার বাস্তবায়ন না হওয়ায় পুঁজিবাজারে অস্থিরতা থেকেই গেছে।

দেড় বছরেরও কম সময়ে বিএসইসি চেয়ারম্যান খন্দকার রাশেদ মাকসুদ বিনিয়োগকারীদের কাছে ‘ভিলেন’ হিসেবে পরিচিতি পেয়েছেন। নানা সমালোচনা, আস্থা ফেরাতে ব্যর্থতা ও বিনিয়োগকারীদের আন্দোলনের পরও একজন অর্থ উপদেষ্টা সালেহউদ্দিন আহমেদের ‘স্বজন’ হিসেবে পরিচিতি পাওয়া রাশেদ মাকসুদের কোনো বিকল্প ভাবেনি সরকার। বরং এক সাক্ষাৎকারে উপদেষ্টা স্বজনপ্রীতির অভিযোগ অস্বীকার করে এমন বার্তা দেন যে, আপাতত ওই পদে তাঁর চেয়ে অন্য কাউকে যোগ্য মনে করছে না সরকার। ফলে বাজারের উন্নয়নের জন্য বিনিয়োগকারীরা এখন নতুন নির্বাচিত সরকারের অপেক্ষায় রয়েছেন।

বাজার সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, পুঁজিবাজারের স্থায়ী উত্তরণ অনেকটাই নির্ভর করবে আগামী সরকারের স্বচ্ছ নীতি, বাজারবান্ধব সংস্কার এবং দীর্ঘমেয়াদি আস্থা গঠনের ওপর। নির্বাচনের ঘোষণা একটি গুরুত্বপূর্ণ ধাপ হলেও পুঁজিবাজারকে স্থানীয়ভাবে চাঙা করতে প্রয়োজন সুস্পষ্ট ও কাঠামোগত নীতির নিশ্চয়তা।

Share this article

আপনারা চাইলে কাস্টম বিজ্ঞাপন এইখানে দিতে পারেন
বিজ্ঞাপনের ছবি বা ভিডিও সাইজ ৩৩৬x২৮০ পিক্সাল হতে হবে

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Scroll to Top