নিওডিমিয়াম: বৈশ্বিক বাণিজ্যের নতুন অস্ত্র

ডিএসজে
ডিএসজে

আপনি হয়তো জানেন না নিওডিমিয়াম কী। হয়তো কখনও নামও শোনেননি। কিন্তু জানলে অবাক হবেন, এটি আপনার বাসা বাড়িতেই বেশ ভালো পরিমাণে রয়েছে।

নিওডিমিয়াম একটি বিরল মৃত্তিকা (রেয়ার আর্থ) উপাদান। এটি মূলত পর্যায় সারণির একেবারে নিচের দিকের খনিজগুলোর একটি এবং দৈনন্দিন জীবনের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

উপাদানটি সব রেয়ার আর্থের মধ্যে সবচেয়ে মূল্যবানগুলোর একটি। কারণ এটি তথাকথিত ‘স্থায়ী’ চুম্বকে ব্যাপকভাবে ব্যবহৃত হয়। আর এর প্রক্রিয়াজাতকরণে একচেটিয়া আধিপত্য চীনের।

ফলে নিওডিমিয়াম ও অন্যান্য রেয়ার আর্থ উপাদান যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের মধ্যে বাণিজ্যযুদ্ধের একটি বড় উপাদানে পরিণত হয়েছে। বিশ্ব অর্থনীতিতে যথাক্রমে এক নম্বর ও দুই নম্বর অবস্থানে থাকা এই দুই দেশের মধ্যে চলমান টানাপোড়েনে এখন এই খনিজগুলোর ভূমিকাও গুরুত্বপূর্ণ।

নিওডিমিয়ামের প্রবেশাধিকার ছাড়া যুক্তরাষ্ট্রের উৎপাদনভিত্তিক শিল্প যেমন গাড়ি, বিমান, গৃহস্থালি যন্ত্রপাতি প্রায় অচল হয়ে পড়বে।

কলোরাডো স্কুল অব মাইনসের অধ্যাপক রড এগার্টের মতে, ওজনের হিসেবে স্থায়ী চুম্বকের মোট ভরের প্রায় ৩০ শতাংশই নিওডিমিয়াম দ্বারা গঠিত।

নিওডিমিয়াম চুম্বক আকারে খুব ছোট হলেও বেশ শক্তিশালী। এক্ষেত্রে প্রশ্ন আসে, এই রেয়ার আর্থ উপাদানটি আসলে কতটা শক্তিশালী।

এমন প্রশ্নের উত্তর দিয়েছেন সেন্টার ফর স্ট্রাটেজিক অ্যান্ড ইন্টারন্যাশনাল স্টাডিজের ক্রিটিক্যাল মিনারেলস সিকিউরিটি প্রোগ্রামের পরিচালক গ্রেসলিন ভাস্করণ। তার মতে, এই উপাদান এতটাই শক্তিশালী যে, একটি ফ্রিজের পাশে রাখলে, ফ্রিজটি উল্টে পড়ে যাবে।

নিওডিমিয়ামভিত্তিক চুম্বক সব ধরনের মোটর চালায়। প্রচলিত চুম্বকের মতো এগুলো মোটর চালু ও বন্ধ করার সময় ব্যবহৃত স্থায়ী বৈদ্যুতিক প্রবাহের সংস্পর্শে এসে চৌম্বকত্ব হারায় না।

আর এই কারণেই যুক্তরাষ্ট্রে মোটর উৎপাদনে এগুলো অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। গাড়ির উইন্ডশিল্ড ওয়াইপার চালানোর সাধারণ মোটর থেকে শুরু করে বৈদ্যুতিক যানবাহন সচল করার জটিল মোটর পর্যন্ত। এগুলো বহু গৃহস্থালি পণ্যেও ব্যবহৃত হয়, যেমন পাওয়ার টুলস ও এয়ার কন্ডিশনার। এমনকি জেট ইঞ্জিন ও বায়ু টারবাইনেও এর ব্যবহার রয়েছে।

ট্রাম্প প্রশাসনের দাবি, নিওডিমিয়াম ও অন্যান্য রেয়ার আর্থ উপাদান যুক্তরাষ্ট্রের জন্য এতটাই অপরিহার্য যে এগুলোর প্রবেশাধিকার একটি জাতীয় নিরাপত্তা ইস্যু। কিন্তু রেয়ার আর্থ প্রক্রিয়াজাতকরণে চীনের প্রাধান্য বেইজিংকে বাণিজ্য আলোচনায় বিপুল কৌশলগত সুবিধা দিয়েছে। কাঁচা আকরিককে ব্যবহারযোগ্য খনিজে রূপান্তর করার জন্য যে প্রক্রিয়াকরণ সক্ষমতা দরকার, তার ৯০ শতাংশই চীনের হাতে।

পরামর্শক প্রতিষ্ঠান কেয়ার্নির জ্বালানি ও সম্পদবিষয়ক পরামর্শক ইগর হুলাক মনে করেন, “রেয়ার আর্থ আসলে বিরল নয়। এগুলো বহু দেশে এবং একাধিক মহাদেশে পাওয়া যায়। কিন্তু যা বিরল, তা হলো পাথর থেকে সেগুলো আলাদা করা, প্রক্রিয়াজাত করা ও পরিশোধনের পদ্ধতি।”

হুলাক বলেন, প্রক্রিয়াজাতকরণ একটি কঠিন ও জটিল প্রক্রিয়া। আকরিককে উত্তপ্ত করতে বিপুল পরিমাণ শক্তির প্রয়োজন হয়। এরপর রাসায়নিক প্রয়োগ করে রেয়ার আর্থ উপাদান আলাদা করা হয়। এই প্রক্রিয়ার শেষ ফলাফল হিসেবে বিষাক্ত বর্জ্য তৈরি হয়, যার কিছু অংশ তেজস্ক্রিয়ও।

“তাই বিশ্বের বাকি অংশ কার্যত চীনকে এই উচ্চমাত্রার প্রক্রিয়াকরণ ঘনত্ব গড়ে তুলতে দিয়েছে।” বলেন হুলাক।

নিওডিমিয়াম প্রক্রিয়াজাত হওয়ার পর সেটিকে চুম্বকে রূপান্তর করা হয়। সেটিও সাধারণত চীনেই সম্পন্ন হয়। উচ্চক্ষমতার কিছু মোটরের ক্ষেত্রে, যেমন বৈদ্যুতিক গাড়ি চালানোর মোটর, সেখানে আরেকটি রেয়ার আর্থ উপাদান ডিসপ্রোসিয়াম মিশ্রণে যোগ করা হয়।

দাম, প্রাপ্যতা ও ব্যাপক ব্যবহারের সমন্বয়ে নিওডিমিয়াম অন্য যেকোনো রেয়ার আর্থ উপাদানের তুলনায় বেশি রাজস্ব সৃষ্টি করে।

যুক্তরাষ্ট্র চীনের রেয়ার আর্থ প্রক্রিয়াজাতকরণের ওপর নির্ভরতা কমানোর চেষ্টা করছে। চলতি মাসের শুরুতে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প একটি কৌশলগত রেয়ার আর্থ মজুত গড়ে তোলার পরিকল্পনা ঘোষণা করেন।

পাশাপাশি যুক্তরাষ্ট্র সরকার দেশীয় আকরিক খনন ও প্রক্রিয়াজাতকরণ বাড়াতে বিভিন্ন প্রকল্পে ভর্তুকি দিচ্ছে। তবে চীনের প্রাপ্যতা ও সক্ষমতার সঙ্গে তাল মেলাতে বহু বছর সময় লাগবে। ফলে এই উপাদানগুলোর ওপর চীনের প্রভাব এখনো অব্যাহত থাকবে।

এগার্ট বলেন, “নতুন কোনো খনি বা প্রক্রিয়াজাতকরণ স্থাপনা উৎপাদনে আনতে বহু বছর সময় লাগে। এমনকি নতুন খনি বা প্রক্রিয়াকরণ কেন্দ্র গড়ার সিদ্ধান্ত নেওয়ার দিন থেকেই এই দীর্ঘ সময় গণনা শুরু হয়।”

চীনের বাজারে দখল খুব শক্ত, আর তারা বিশাল পরিমাণে পণ্য উৎপাদন করে বলে তাদের খরচ কম পড়ে। এই সুবিধার কারণে অন্য দেশের কোনো নতুন কারখানা বা প্রক্রিয়াজাতকারী প্রতিষ্ঠান যদি বাজারে ঢুকতে চায়, তাহলে সরকারের বড় ধরনের আর্থিক সহায়তা বা প্রণোদনা ছাড়া তাদের পক্ষে চীনের সঙ্গে টিকে থাকা বা প্রতিযোগিতা করা প্রায় অসম্ভব।

মানে, চীনের সঙ্গে লড়তে হলে শুধু ব্যবসায়িক দক্ষতা নয়, সরকারের শক্ত সমর্থনও দরকার।

উপাদানটির জন্য চীনের ওপর নির্ভরতা কমাতে এরই মধ্যে পদক্ষেপ নেওয়া শুরু করেছে ভারত। দেশটির সরকার গত নভেম্বরে বিরল খনিজ চুম্বক সংক্রান্ত একটি প্রকল্পের অনুমোদন দিয়েছে। প্রকল্পের নাম স্কিম টু প্রোমোট ম্যানুফ্যাকচারিং অফ সিন্টার্ড রেয়ার আর্থ পার্মানেন্ট ম্যাগনেট।

নিওডিমিয়াম চুম্বকে রূপান্তরিত হওয়ার পর সেগুলো একটি মোটরের ভেতরে কোরের চারপাশে স্থাপন করা হয় এবং একটি অ্যাক্সেলের সঙ্গে যুক্ত থাকে। কোরটি একটি বাইরের আবরণ দিয়ে ঘেরা থাকে, যার ভেতরে বৈদ্যুতিক তারের একটি নেটওয়ার্ক থাকে। যখন সেই তারের মধ্য দিয়ে বিদ্যুৎ প্রবাহিত হয়, তখন একটি বৈদ্যুতিক ক্ষেত্র তৈরি হয়, যা প্রথমে চুম্বকগুলোকে আকর্ষণ করে, পরে বিকর্ষণ করে। ফলে সেগুলো ঘুরতে শুরু করে এবং অ্যাক্সেলকে ঘোরায়।

এই চুম্বকের ওপর নির্ভরশীল বহু প্রতিষ্ঠান বিকল্প খুঁজছে। তাদের দরকার, হয় রেয়ার আর্থমুক্ত চুম্বক, নয়তো চুম্বকবিহীন মোটর। লক্ষ্য হলো সরবরাহ শৃঙ্খলকে আরও নিরাপদ ও স্থিতিস্থাপক করা। কিন্তু বাস্তবতা হলো এখন পর্যন্ত কোনো কার্যকর বিকল্প নেই।

হুলাক বলেন, “আপনাকে কর্মক্ষমতা কমাতে হবে, দক্ষতা কমাতে হবে, ওজন বা আকারে ছাড় দিতে হবে, টর্ক কমাতে হবে। আর এসবেরই মোটরের ওপর বড় প্রভাব পড়ে। এর কোনো জাদুকরী সমাধান নেই।”

Share this article

আপনারা চাইলে কাস্টম বিজ্ঞাপন এইখানে দিতে পারেন
বিজ্ঞাপনের ছবি বা ভিডিও সাইজ ৩৩৬x২৮০ পিক্সাল হতে হবে

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Scroll to Top