দীর্ঘ ২১ বছর ধরে ঝুলে থাকা সুনামগঞ্জের টেংরাটিলা (ছাতক পশ্চিম) গ্যাসক্ষেত্র বিস্ফোরণের আইনি লড়াইয়ে বাংলাদেশের পক্ষেই চূড়ান্ত রায় দিয়েছে ইন্টারন্যাশনাল সেন্টার ফর সেটেলমেন্ট অব ইনভেস্টমেন্ট ডিসপিউট (ইকসিড)।
বিশ্বব্যাংক গ্রুপের অধীনস্থ এই স্বায়ত্তশাসিত আন্তর্জাতিক সালিশি সংস্থাটি কানাডীয় জ্বালানি কোম্পানি নাইকো রিসোর্সেসকে ৪ কোটি ২০ লাখ মার্কিন ডলার ক্ষতিপূরণ দেওয়ার নির্দেশ দিয়েছে। বর্তমান বিনিময় হার (১২৩ টাকা) অনুযায়ী যার পরিমাণ প্রায় ৫১৬ কোটি টাকা।
যুক্তরাষ্ট্রের ওয়াশিংটন ডিসিতে হওয়া এই রায়ের ঘটনা বৃহস্পতিবার (২৯ জানুয়ারি) গণমাধ্যমকে জানিয়েছেন বাংলাদেশ তেল, গ্যাস ও খনিজ সম্পদ করপোরেশনের (পেট্রোবাংলা) চেয়ারম্যান প্রকৌশলী রেজানুর রহমান।
ইকসিডের চূড়ান্ত আদেশে উল্লেখ রয়েছে, ২০০৫ সালে সংঘটিত ভয়াবহ বিস্ফোরণটির জন্য নাইকো সরাসরি দায়ী। নাইকো আন্তর্জাতিক পেট্রোলিয়াম শিল্পের মানদণ্ড অনুসরণে ব্যর্থ হয়েছে এবং খননকাজে প্রয়োজনীয় সতর্কতা অবলম্বন করেনি।
বিস্ফোরণে প্রায় ৮ বিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস পুড়ে যাওয়ার বিপরীতে নাইকোকে ৪০ মিলিয়ন ডলার জরিমানা দিতে হবে। এছাড়া পরিবেশগত বিপর্যয় ও সম্পদের ক্ষতির জন্য আরও ২ মিলিয়ন ডলার।
যদিও বাংলাদেশ প্রায় ১ বিলিয়ন ডলার ক্ষতিপূরণ দাবি করেছিল। যার মধ্যে বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম এক্সপ্লোরেশন অ্যান্ড প্রোডাকশন কোম্পানি লিমিটেডের (বাপেক্স) জন্য ১১৮ মিলিয়ন ও সরকারের জন্য ৮৯৬ মিলিয়ন ডলার।
তবে সব তথ্য-প্রমাণ বিশ্লেষণ করে ৪২ মিলিয়ন ডলার ক্ষতিপূরণ দেওয়ার রায় দিয়েছে সালিশি সংস্থা।
কূপ থেকে ট্রাইব্যুনাল: সময়রেখা
১৯৫৯ সালে আবিষ্কৃত এই গ্যাসক্ষেত্রটি ২০০৩ সালে অনুসন্ধানের জন্য বিতর্কিত নাইকোর কাছে হস্তান্তর করা হয়। এর পরই শুরু হয় বিপর্যয়ের ধারা। ২০০৫ সালের ৭ জানুয়ারি ও ২৪ জুন পরপর দুটি মারাত্মক বিস্ফোরণে কেঁপে ওঠে ছাতক এলাকা। পুড়ে যায় মজুত গ্যাস, ধ্বংস হয় স্থানীয় বাস্তুসংস্থান। ক্ষতিপূরণ না দেওয়ায় ২০০৭ থেকে ২০১০ সাল পর্যন্ত নাইকোর গ্যাস বিল পরিশোধ বন্ধ রাখে পেট্রোবাংলা। পাল্টা জবাবে নাইকো ২০১০ সালে ইকসিডে মামলা করে। ২০১৪ থেকে ২০২০ সাল পর্যন্ত দীর্ঘ শুনানির পর ২০২০ সালে ট্রাইব্যুনাল নাইকোকে বিস্ফোরণের জন্য দায়ী করে প্রাথমিক রায় দেয়। এরই ধারাবাহিকতায় চলতি মাসে চূড়ান্ত ক্ষতিপূরণের অঙ্ক নির্ধারিত হলো।
ছাতক পূর্ব ও পশ্চিমের সম্ভাবনা
কর্মকর্তারা জানান, এই রায়ের মাধ্যমে কেবল ক্ষতিপূরণই নয়, বরং ছাতক গ্যাসক্ষেত্রের ভবিষ্যৎ নিয়ে তৈরি হওয়া আইনি জটও খুলে গেল। তাদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, বিস্ফোরণে পশ্চিম অংশের একটি স্তর ক্ষতিগ্রস্ত হলেও ছাতক পূর্ব অংশের মজুত এখনো অক্ষত। এই ক্ষেত্রে সম্ভাব্য ২ থেকে ৫ ট্রিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস মজুত থাকতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
পেট্রোবাংলা চেয়ারম্যান রেজানুর রহমান বলেন, “আমরা দীর্ঘদিন চূড়ান্ত রায়ের অপেক্ষায় ছিলাম। এখন আইনজীবীদের মতামত নিয়ে দ্রুত পরবর্তী পদক্ষেপ নেওয়া হবে। ছাতকে নতুন কূপ খননের জন্য উন্নয়ন প্রকল্প প্রস্তাব (ডিপিপি) প্রস্তুত রয়েছে।”
জয় নাকি ক্ষতি: রায়ের ব্যবচ্ছেদ
টেংরাটিলা গ্যাসক্ষেত্র বিস্ফোরণের ২১ বছর পর ইকসিডের চূড়ান্ত রায়কে আপাতদৃষ্টিতে পেট্রোবাংলার জন্য একটি বড় ‘কূটনৈতিক ও আইনি জয়’ বলে মনে হচ্ছে। তবে অঙ্কের খাতা মেলানো শুরু করলে এই জয় নিয়ে কিছুটা অস্বস্তি তৈরি হওয়া স্বাভাবিক। প্রশ্ন উঠছে—বাংলাদেশ কি আসলেই পূর্ণ ক্ষতিপূরণ পেয়েছে, নাকি স্রেফ একটি আইনি সান্ত্বনা?
নথি বলছে, বাংলাদেশ শুরু থেকেই প্রায় ১০০ কোটি মার্কিন ডলার বা ১ বিলিয়ন ডলার ক্ষতিপূরণ দাবি করে আসছিল। এর বিপরীতে ট্রাইব্যুনাল মঞ্জুর করেছে মাত্র ৪ কোটি ২০ লাখ ডলার (৪২ মিলিয়ন)। অর্থাৎ, দাবির মাত্র ৪ শতাংশের কিছু বেশি অর্থ পেল বাংলাদেশ। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক কর্মকর্তাদের ভাষ্য, ৮ বিলিয়ন ঘনফুট গ্যাসের বর্তমান বাজারমূল্য যেখানে প্রায় ১ হাজার কোটি টাকার ওপরে, সেখানে নাইকোর ৫১৬ কোটি টাকার এই জরিমানা কেবল ‘টোকেন মানি’ বা আংশিক ক্ষতিপূরণ হিসেবেই গণ্য হতে পারে।
কেন এই অঙ্কের ফারাক?
ট্রাইব্যুনাল সাধারণত বর্তমান বাজারদর বিবেচনায় না নিয়ে ২০০৫ সালের চুক্তি এবং তৎকালীন উৎপাদন খরচকে ভিত্তি ধরে হিসাব করেছে। এছাড়া পরিবেশগত ক্ষতির জন্য দাবি করা ৮৯৬ মিলিয়ন ডলারের বিপরীতে মাত্র ২ মিলিয়ন ডলার মঞ্জুর হওয়াটা হতাশাজনক বলে মনে করা হচ্ছে। আলাপকালে পেট্রোবাংলা ও বাপেক্সের কর্মকর্তারা বলেন, টেংরাটিলার সেই ভয়াবহ বিস্ফোরণ যে স্থায়ী বাস্তুসংস্থানগত ক্ষতি করেছে, তার মূল্য দুই মিলিয়ন ডলারে নির্ধারণ করা কতটা যৌক্তিক, তা নিয়ে তর্কের অবকাশ রয়েছে। তবে তাঁদের মতে মুদ্রার উল্টো পিঠও আছে। আর্থিক অঙ্ক কম হলেও এই রায়ের সুদূরপ্রসারী গুরুত্ব রয়েছে।
বিদেশি কোম্পানিগুলো এখন থেকে বাংলাদেশে কাজ করার সময় নিরাপত্তা ও আন্তর্জাতিক মানদণ্ড মানতে বাধ্য হবে। তাছাড়া এই রায়ের মাধ্যমে ছাতক গ্যাসক্ষেত্রের ওপর থেকে নাইকোর ছায়া সরে গেল। এখন ২ থেকে ৫ ট্রিলিয়ন ঘনফুট গ্যাসের সম্ভাব্য মজুত নিয়ে পেট্রোবাংলা নিজের মতো কাজ শুরু করতে পারবে। নাইকো বাংলাদেশের কাছে ফেনী গ্যাসক্ষেত্রের যে বকেয়া বিল দাবি করে আসছিল, এই রায়ের ফলে সেই পাওনার বড় অংশই এখন ক্ষতিপূরণ হিসেবে কেটে রাখা সম্ভব হবে।
কর্মকর্তাদের ভাষ্য, আর্থিকভাবে এই জয় ‘পূর্ণাঙ্গ’ না হলেও কৌশলগতভাবে এটি পেট্রোবাংলার জন্য একটি বিশাল ঢাল। নাইকোর মতো কোম্পানির বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক আদালতে দোষী সাব্যস্ত করার নজির ভবিষ্যতে অন্যান্য বিদেশি কোম্পানির সাথে দরকষাকষিতে বাংলাদেশকে শক্তিশালী অবস্থানে রাখবে। “টাকার অঙ্কে কিছুটা হারলেও, ‘সার্বভৌম অধিকার’ প্রতিষ্ঠার লড়াইয়ে বাংলাদেশই এখন বিজয়ী,” যোগ করেন পেট্রোবাংলার এক কর্মকর্তা।
উল্লেখ্য, ১৯৬৬ সালে প্রতিষ্ঠিত সালিশি সংস্থা ইকসিড রাষ্ট্র এবং বিদেশি বিনিয়োগকারীদের মধ্যে সৃষ্ট আইনি বিরোধ মীমাংসার জন্য বিশ্বের প্রধান প্রতিষ্ঠান হিসেবে কাজ করে, যার সদর দপ্তর যুক্তরাষ্ট্রের ওয়াশিংটন ডিসিতে।













