সাধারণ শেয়ারহোল্ডারদের মতামতকে প্রাধান্য দিয়ে শেষ পর্যন্ত প্রায় দ্বিগুণ দামে বিশ্বখ্যাত নাসডাকের ম্যাচিং ইঞ্জিন নেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের (ডিএসই) পরিচালনা পর্ষদ। নাসডাকের দেওয়া প্রস্তাব অনুযায়ী, ডিএসইর লেনদেন সম্পাদনের এই ‘হৃৎপিণ্ড’ প্রতিস্থাপনে প্রায় ৩০০ কোটি টাকা ব্যয় করতে হবে স্টক এক্সচেঞ্জটিকে।
আজ রবিবার ডিএসইর পর্ষদ এমন একটি সিদ্ধান্ত নিতে বাধ্য হয়েছে, যেখানে অধিকাংশ পরিচালকই সাশ্রয়ী ম্যাচিং ইঞ্জিন—যেটি পাকিস্তানের ‘ইনফোটেক’ তৈরি করে—তাতে আগ্রহী ছিলেন। এতে প্রায় ১৪০ কোটি টাকা খরচ কম হতো। পাশাপাশি যৌথ উদ্যোগে একটি স্বয়ংসম্পূর্ণ ফিনটেক কোম্পানি গড়ে উঠত, যার মাধ্যমে পুঁজিবাজার সংক্রান্ত বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের প্রযুক্তিগত সমাধান স্থানীয়ভাবেই সম্ভব হতো।
অবশ্য নাসডাকের ম্যাচিং ইঞ্জিন নিলেও ডিএসইর পরিচালনা পর্ষদ সিদ্ধান্ত নিয়েছে, অচিরেই একটি ফিনটেক কোম্পানি গড়ে তোলা হবে এবং সেটা যত দ্রুত সম্ভব।
ডিএসইর শেয়ারহোল্ডার পরিচালক মিনহাজ মান্নান ইমন ডিএসজেকে বলেন, পুঁজিবাজারে প্রযুক্তিগত পরনির্ভরতা কাটাতে আলাদা একটি ফিনটেক কোম্পানি প্রতিষ্ঠার সিদ্ধান্ত নিয়েছে পর্ষদ। এটি বিদেশি কোনো প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে যৌথভাবে হতে পারে। তিনি জানান, আমাদের অবকাঠামোগত সুবিধার পাশাপাশি দক্ষ কর্মী বাহিনীও রয়েছে। এ ধরনের প্রয়োজনীয় কোম্পানি গঠন করা আমাদের জন্য তেমন কঠিন কিছু নয়। বিভিন্ন প্রকল্প ওই কোম্পানির মাধ্যমেই করা যাবে।
মিনহাজ মান্নান বলেন, ইনফোটেকের সঙ্গে যৌথ উদ্যোগের কোম্পানিটি গঠন করা গেলে ভবিষ্যতে অর্ডার ম্যানেজমেন্ট সিস্টেম (ওএমএস), নিজস্ব সিডিবিএলসহ স্টক এক্সচেঞ্জ সংশ্লিষ্ট তথ্যপ্রযুক্তি খাতের সমাধানের জন্য অন্যের দ্বারস্থ হওয়ার প্রয়োজন পড়ত না।
ডিএসই বর্তমানে নাসডাকের পুরনো সংস্করণের ম্যাচিং ইঞ্জিন দিয়ে লেনদেন ব্যবস্থা চালায়, যার বর্ধিত মেয়াদ আগামী বছরই শেষ হয়ে যাবে। আর নতুন ম্যাচিং ইঞ্জিন ইনস্টল এবং পুরো সিস্টেম মাইগ্রেশন করতে সাধারণত ৯-১২ মাস সময় লাগে। কিন্তু গত কয়েক মাস ধরে এই ম্যাচিং ইঞ্জিন প্রতিস্থাপনে যুক্তরাষ্ট্রের নাসডাক ও পাকিস্তানের ইনফোটেক কোম্পানিতে আটকে ছিল ডিএসইর পর্ষদ।
রবিবার ডিএসইর পর্ষদ নাসডাকের যে ম্যাচিং ইঞ্জিন নেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে, সেটি আপডেটেড সংস্করণ (ভার্সন) এবং বিশ্বের ৪৫টির বেশি উন্নত স্টক এক্সচেঞ্জ এই প্রযুক্তি ব্যবহার করছে। এদের ইঞ্জিন মাইক্রো-সেকেন্ডে লাখ লাখ অর্ডার প্রসেস করতে সক্ষম এবং সাইবার নিরাপত্তার দিক থেকে এগুলো সব দেশেই ‘গোল্ড স্ট্যান্ডার্ড’ হিসেবে স্বীকৃত। নাসডাকের আপডেটেড সংস্করণটি নিতে ডিএসইকে ২৯৬ কোটি টাকা খরচ করতে হবে, যার মেয়াদ হবে ১০ বছর।
অন্যদিকে ইনফোটেক, যাদের ম্যাচিং ইঞ্জিন আফ্রিকার ১২টি দেশে চলছে, তা ১৬০ কোটি টাকায় নিতে পারত ডিএসই। যদিও বৈশ্বিক বা আঞ্চলিক কোনো বড় স্টক এক্সচেঞ্জে ইনফোটেকের তৈরি ম্যাচিং ইঞ্জিনের কোনো সফল ট্র্যাক রেকর্ড নেই।
মিনহাজ মান্নান ইমন বলেন, তিনজন শেয়ারহোল্ডার পরিচালক, চেয়ারম্যান, এমডিসহ বেশিরভাগ পরিচালক ইনফোটেকের ম্যাচিং ইঞ্জিন নেওয়ার বিষয়ে আগ্রহ থাকলেও সাধারণ শেয়ারহোল্ডাররা চেয়েছেন নাসডাক নিতে। তাই শেয়ারহোল্ডারদের মতামতকে প্রাধান্য দিয়ে আমরা শেষ পর্যন্ত নাসডাকের ম্যাচিং ইঞ্জিন নেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছি। কিন্তু নাসডাক নেওয়ার কারণে বর্তমানে ডিএসইর যে আর্থিক পরিস্থিতি, তাতে ভবিষ্যতে হয়তো লভ্যাংশ দেওয়ার সক্ষমতা থাকবে না।
ডিএসইর এই পরিচালক বলেন, আমাদের হাতে নাসডাকের বিকল্প ছিল শুধু ইনফোটেক। ইনফোটেকের ম্যাচিং ইঞ্জিন নিতে পারলে প্রায় ১৫০ কোটি টাকা সাশ্রয় হতো। ডিএসইর বর্তমান লেনদেন পরিস্থিতি বিবেচনায় ডিএসইর এ সংক্রান্ত কমিটি ও বুয়েটের একজন বিশেষজ্ঞও ইনফোটেকের ম্যাচিং ইঞ্জিন নেওয়ার পক্ষে মত দিয়েছিলেন।
ম্যাচিং ইঞ্জিন বানায় পৃথিবীতে হাতেগোনা যে কয়েকটি নির্ভরযোগ্য কোম্পানি আছে এবং যারা দ্রুত উচ্চমানের প্রযুক্তি সরবরাহ করতে পারে তারা সব সময় ব্যয়বহুল। তবে ডিএসইর জন্য সমস্যাটা আরও প্রকট। পৃথিবীতে যে তিনটি প্রতিষ্ঠান এক্ষেত্রে শীর্ষে রয়েছে, তাদের মধ্যে লন্ডনের মিলেনিয়াম আইটি (এলএসইজি) ও চীনের শেনজেন স্টক এক্সচেঞ্জ (এসজেডএসই) জানিয়ে দিয়েছে যে, তারা আগামী দুই বছরের মধ্যে ডিএসইকে ম্যাচিং ইঞ্জিন বানিয়ে দিতে পারবে না। ফলে ডিএসইর হাতে সেরা কোম্পানির ম্যাচিং ইঞ্জিন নেওয়ার সুযোগ আছে শুধু নাসডাকের, যেটি রবিবার নিতে বাধ্য হয়েছে স্টক এক্সচেঞ্জটির পর্ষদ।
ডিএসইতে চীনা কনসোর্টিয়ামের মালিকানা রয়েছে। ২০১৮ সালে চীনা কনসোর্টিয়াম প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল ডিএসইকে ৩৩ মিলিয়ন ডলার সমমূল্যের প্রযুক্তিগত সহায়তা দেবে, যেখানে উন্নতমানের ট্রেডিং সিস্টেম দেওয়ার প্রস্তাবও ছিল। তবে চীনের সঙ্গে যোগাযোগ করলেও শেনজেন স্টক এক্সচেঞ্জ ২৭ মাসের আগে ম্যাচিং ইঞ্জিন বানিয়ে দিতে পারবে না বলে ডিএসইকে জানিয়ে দেয়। আর ম্যাচিং ইঞ্জিন প্রতিস্থাপনে নাসডাক সময় চেয়েছে ৯ মাস।













