আজ ১৭ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, মঙ্গলবার। বাংলাদেশে গণতন্ত্র প্রত্যাবর্তনের দিন। যে কারণে উৎসবের রঙে সেজেছিল ঢাকা; আর সেই উৎসবের কেন্দ্রবিন্দু ছিল শেরেবাংলা নগরের জাতীয় সংসদ ভবন। দিনটি কেবল ক্ষমতা হস্তান্তরের নয়, বরং এক যুগেরও বেশি সময় পর জনম্যান্ডেট নিয়ে একটি নির্বাচিত সরকারের অভিযাত্রার সূচনার দিন। ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে নিরঙ্কুশ জয় পাওয়া বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের (বিএনপি) চেয়ারম্যান তারেক রহমানের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শপথ নেওয়ার দিন।
দিনের শুরুতে সবার চোখ ছিল সংসদ ভবনের শপথকক্ষে। সকাল পৌনে ১১টার পরপরই প্রধান নির্বাচন কমিশনার এ এম এম নাসির উদ্দিনের সামনে দাঁড়িয়ে সমস্বরে শপথবাক্য পাঠ করেন বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি)-এর ২০৯ জন নবনির্বাচিত সংসদ সদস্য। এরপর ধাপে ধাপে জামায়াতে ইসলামী ও অন্যান্য দলের সদস্যরা শপথ নেন। এরই মাধ্যমে শেখ হাসিনার দীর্ঘ দেড় দশকের স্বৈরশাসনের পতনের দেড় বছর পর বাংলাদেশে আবারও গণতান্ত্রিক অগ্রযাত্রা শুরু হলো।
বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর সাংবাদিকদের বলেন, “নতুন সংসদই হবে রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের কেন্দ্রবিন্দু।” দীর্ঘ সময় পর গণতন্ত্রে ফিরে আসার এই প্রক্রিয়াকে তিনি একটি ইতিবাচক পরিবর্তনের সূচনা হিসেবে অভিহিত করেন। এর আগে শপথ শেষে বিএনপির সংসদীয় দলের সভায় তারেক রহমানকে সর্বসম্মতিক্রমে সংসদ নেতা ও প্রধানমন্ত্রী হিসেবে নির্বাচিত করা হয়।
অন্যদিকে, বিরোধীদলীয় নেতা মনোনীত হয়েছেন জামায়াতে ইসলামীর আমির শফিকুর রহমান। উপনেতা হয়েছেন দলের নায়েবে আমির সৈয়দ আবদুল্লাহ মোহাম্মদ তাহের। আর জামায়াত নেতৃত্বাধীন ১১ দলীয় ঐক্যের শরিক দল জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম হয়েছেন চিফ হুইপ।
বিরোধী দল জামায়াত ও তাদের জোটসঙ্গীরা সংসদ সদস্য হিসেবে শপথের পাশাপাশি সংবিধান সংস্কার কাউন্সিলের সদস্য হিসেবেও শপথ গ্রহণ করেন, যা জুলাই বিপ্লবের চেতনা বাস্তবায়নের একটি পদক্ষেপ। তবে নবনির্বাচিত বিএনপির ২০৯ সংসদ সদস্য এককভাবে এই শপথ বর্জন করেন।
দলটির স্থায়ী কমিটির সদস্য সালাহউদ্দিন আহমদ জানান, যেহেতু এই পরিষদটি এখনো সংবিধানে আনুষ্ঠানিকভাবে অন্তর্ভুক্ত হয়নি (সংবিধানের তৃতীয় তফসিলে এর কোনো উল্লেখ নেই), তাই তারা এর সদস্য হিসেবে শপথ নেবেন না। বিএনপির সঙ্গে একাত্মতা প্রকাশ করে তাদের জোটভুক্ত শরিক দলগুলোর তিনজন সদস্যও এই বিশেষ শপথ গ্রহণ করেননি।
বিকেল নামতেই সবার চোখ আটকে যায় সংসদ ভবনের দক্ষিণ প্লাজায়। প্রথা ভেঙে বঙ্গভবনের চার দেয়ালের বাইরে এসে শপথ অনুষ্ঠান আয়োজন করা হয় জনগণের দোরগোড়ায়। নীল আকাশের নিচে, হাজারো অতিথির উপস্থিতিতে বিকেল চারটার দিকে মঞ্চে আবির্ভূত হন তারেক রহমান।
রাষ্ট্রপতি মোহাম্মদ সাহাবুদ্দিন যখন তাকে প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শপথবাক্য পাঠ করাচ্ছিলেন, তখন গগনবিদারি করতালি ও উল্লাসে কেঁপে ওঠে মানিক মিয়া অ্যাভিনিউ। দীর্ঘ ১৭ বছরের নির্বাসন ও সংগ্রামের পর এটি ছিল তারেক রহমানের জন্য এক মহাকাব্যিক প্রত্যাবর্তন। অনুষ্ঠানে তারেক রহমানের স্ত্রী জুবাইদা রহমান ও মেয়ে জাইমা রহমানও উপস্থিত ছিলেন।
অতিথিদের মধ্যে ছিলেন— অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের বিদায়ী প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূস এবং উপদেষ্টা পরিষদের সদস্যবৃন্দ, প্রধান বিচারপতি জুবায়ের রহমান চৌধুরী, প্রধান নির্বাচন কমিশনার, সুপ্রিম কোর্টের বিচারক, সংসদ সদস্য, রাজনৈতিক নেতা, তিন বাহিনীর প্রধান, কূটনৈতিক কোরের সদস্য, সিনিয়র সাংবাদিক এবং উচ্চপদস্থ বেসামরিক ও সামরিক কর্মকর্তারা।
প্রধানমন্ত্রীর শপথের পর একে একে শপথ নেন মন্ত্রিসভার অন্য সদস্যরা। ২৫ জন পূর্ণ মন্ত্রী ও ২৪ জন প্রতিমন্ত্রীর সমন্বয়ে গঠিত এই মন্ত্রিসভায় অভিজ্ঞতার পাশে ঠাঁই পেয়েছে তারুণ্যের উপস্থিতি। মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর, আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী ও সালাহউদ্দিন আহমদের মতো অভিজ্ঞ রাজনীতিবিদদের পাশাপাশি জোনায়েদ সাকি ও নুরুল হক নুরের মতো রাজপথের নেতাদের অন্তর্ভুক্তি নতুন সরকারকে দিয়েছে এক অন্তর্ভুক্তিমূলক চেহারা। বিশেষ করে টেকনোক্র্যাট কোটায় ড. খলিলুর রহমানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী হিসেবে নিয়োগ এখন আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু।
এই উৎসবমুখর মুহূর্তের নেপথ্য কারিগর ছিলেন নোবেলজয়ী অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ ইউনূস। আগের রাতে বিদায়ী ভাষণে তিনি আবেগঘন কণ্ঠে বলেন, “আমরা শূন্য থেকে শুরু করিনি—শুরু করেছি মাইনাস থেকে। ধ্বংসস্তূপ পরিষ্কার করে প্রতিষ্ঠান দাঁড় করিয়ে তারপর সংস্কারের পথ ধরেছি।” তাঁর ভাষ্য, অন্তর্বর্তীকালীন সরকার কেবল একটি অবাধ নির্বাচনই উপহার দেয়নি; বরং ‘জুলাই চার্টার’-এর মাধ্যমে রাষ্ট্র সংস্কারের যে নকশা রেখে গেছে, তা নতুন সরকারের জন্য পাথেয় হয়ে থাকবে।
বাংলাদেশের এই গণতান্ত্রিক পুনরুত্থানকে স্বাগত জানিয়েছে বিশ্ব সম্প্রদায়। শপথ অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন মালদ্বীপের প্রেসিডেন্ট ড. মোহাম্মদ মুইজ্জু, ভুটানের প্রধানমন্ত্রী দাশো শেরিং তোবগে, ভারতের লোকসভা (পার্লামেন্ট) স্পিকার ওম বিড়লা, পাকিস্তানের পরিকল্পনা, উন্নয়ন ও বিশেষ উদ্যোগ বিষয়ক ফেডারেল মন্ত্রী আহসান ইকবাল চৌধুরী, নেপালের পররাষ্ট্রমন্ত্রী বালা নন্দ শর্মা, শ্রীলঙ্কার স্বাস্থ্য ও গণমাধ্যমমন্ত্রী ড. নালিন্দা জয়তিস্সাসহ বিভিন্ন দেশের প্রতিনিধি।
হিন্দুস্তান টাইমসের খবরে বলা হয়েছে, ওম বিড়লা প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে ভারত সফরের আমন্ত্রণ জানান। প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির পক্ষ থেকে তাঁকে ভারত সফরের আনুষ্ঠানিক আমন্ত্রণপত্র প্রদান করেন। তিনি একই সঙ্গে মোদির শুভেচ্ছা বার্তাও পৌঁছে দেন এবং আঞ্চলিক সহযোগিতা নিয়ে আলোচনা করেন।











