বাম দিক থেকে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের আরিফ হোসেন খান, নাবিল গ্রুপের আমিনুল ইসলাম ও পারটেক্স স্টারের আজিজ আল কায়সার।
বাংলাদেশের ব্যাংকিং খাতে এক দশকের বেশি সময় ধরে যে সংকট জমা হয়েছে, তার দৃশ্যমান রূপ সাধারণত ধরা পড়ে খেলাপি ঋণের পরিসংখ্যানে। কিন্তু সংকটের গভীরে আছে আরও জটিল বাস্তবতা—ব্যাংক, বড় ঋণগ্রহীতা এবং করপোরেট ক্ষমতার মধ্যে গড়ে ওঠা এমন সম্পর্ক, যেখানে দায়বদ্ধতা প্রায় অদৃশ্য। নাবিল গ্রুপের মাধ্যমে পারটেক্স স্টার গ্রুপের একাধিক শিল্পপ্রতিষ্ঠান অধিগ্রহণ সেই বাস্তবতারই একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়।
দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) একের পর এক মামলা, ব্যক্তিগত ৭৩টি ব্যাংক হিসাব জব্দ, বেনামে হাজার হাজার কোটি টাকার ঋণ আত্মসাৎ, নামসর্বস্ব প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে অর্থ উত্তোলন—এসব অভিযোগের মধ্যেই রাজশাহী–কেন্দ্রীক নাবিল গ্রুপ ২০২৪ সালের অক্টোবরে প্রায় ১,৫০০ কোটি টাকা ব্যয়ে তিনটি শিল্পপ্রতিষ্ঠান অধিগ্রহণের ঘোষণা দেয়।
এই অধিগ্রহণ শুধু একটি ব্যবসায়িক সিদ্ধান্ত নয়; এটি বাংলাদেশের ব্যাংকিং শাসনব্যবস্থা ও নিয়ন্ত্রক কাঠামোর অভ্যন্তরীণ দুর্বলতা উন্মোচন করেছে বলে ডিএসজে প্রতিবেদককে জানিয়েছেন খাতটির একাধিক কর্মকর্তা।
তারা উল্লেখ করেন, শেখ হাসিনার পরিবার এবং অন্তত ১০টি বড় ব্যবসায়ী গোষ্ঠীর বিরুদ্ধে ব্যাংক জালিয়াতি ও অর্থপাচারের অভিযোগ নিয়ে অন্তর্বর্তী সরকারের তদন্ত চলছে; সেই তালিকায়ও রয়েছে নাবিল গ্রুপের নাম।
একটি অধিগ্রহণ, বহু প্রশ্ন
নাবিল গ্রুপ যে প্রতিষ্ঠানগুলো অধিগ্রহণ করেছে, সেগুলো পারটেক্স স্টার গ্রুপের অংশ—স্টার পার্টিকেল বোর্ড মিলস লিমিটেড, পারটেক্স ফার্নিচার ইন্ডাস্ট্রিজ লিমিটেড এবং পারটেক্স পিভিসি ইন্ডাস্ট্রিজ লিমিটেড।
প্রায় তিন বছর বন্ধ থাকার পর সম্প্রতি পারটেক্স পিভিসি ডোর ইউনিট পুনরায় চালুর ঘোষণা দেওয়া হয় এবং সেখানে নতুন করে ২০০ কোটি টাকা বিনিয়োগের কথাও জানানো হয়।
পারটেক্স স্টারের এই প্রতিষ্ঠানগুলোর মালিক ছিলেন আজিজ আল কায়সার, বিএনপির প্রয়াত সংসদ সদস্য এম এ হাশেমের বড় ছেলে এবং একই সময়ে সিটি ব্যাংকের চেয়ারম্যান। অধিগ্রহণ সম্পন্ন হওয়ার পরপরই তিনি ব্যাংকটির চেয়ারম্যানের পদ ছাড়েন। এখান থেকেই ঘটনাটি জটিল হয়ে ওঠে।
ব্যাংকিং খাতের নথি অনুযায়ী, নাবিল গ্রুপ সেই সিটি ব্যাংক থেকেই প্রায় ৩,০০০ কোটি টাকার ঋণ সুবিধা পেয়েছে। অর্থাৎ, ব্যাংকের বড় ঋণগ্রহীতাই আবার ব্যাংকের চেয়ারম্যানের ব্যক্তিগত মালিকানাধীন শিল্পপ্রতিষ্ঠান কিনছে। বড় ঋণগ্রহীতা একটি শিল্পগোষ্ঠীর সঙ্গে ব্যাংক চেয়ারম্যানের সম্পদ বিক্রির এই লেনদেন স্বার্থসংঘাত ও তদারকির ঘাটতি নিয়ে নতুন প্রশ্ন তুলেছে।
কেন এটি সরাসরি ‘স্বার্থসংঘাত’
ব্যাংকিং রীতিনীতি অনুযায়ী, ব্যাংকের চেয়ারম্যান একজন ট্রাস্টি বা আমানতকারীদের অর্থের রক্ষক। ঋণগ্রহীতা যখন ওই ব্যাংক থেকে বড় অঙ্কের ঋণ নিয়েছেন, তখন চেয়ারম্যানের সঙ্গে তার ব্যক্তিগত লেনদেন ঋণ অনুমোদন বা শর্ত শিথিলের ক্ষেত্রে বিশেষ সুবিধা সৃষ্টি করতে পারে। এই ধরনের লেনদেন ব্যাংকিং খাতে নৈতিকভাবে নিষিদ্ধ।
বাংলাদেশ ব্যাংকের ব্যাংক কোম্পানি আইন ১৯৯১ (সংশোধিত ২০২৩) এবং করপোরেট গভর্ন্যান্স কোড অনুযায়ী, ব্যাংকের পরিচালক বা চেয়ারম্যানের সঙ্গে কোনো গ্রাহকের এমন ব্যবসায়িক সম্পর্ক থাকা চলবে না, যা ব্যাংকের স্বার্থকে ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে।
এই ধরনের বড় অধিগ্রহণের ক্ষেত্রে অর্থের উৎস এবং ক্রেতা–বিক্রেতার পারস্পরিক সম্পর্ক কেন্দ্রীয় ব্যাংককে অবহিত করা এবং পূর্বানুমতি নেওয়া বাধ্যতামূলক। অনুমতি না নেওয়া হলে এটি সরাসরি আইন লঙ্ঘন বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
অবশ্য কেন্দ্রীয় ব্যাংক এই লেনদেনে কোনো স্বার্থসংঘাত দেখছে না। গত ৭ জানুয়ারি বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্বাহী পরিচালক ও মুখপাত্র আরিফ হোসেন খান ডিএসজে প্রতিবেদককে বলেন, “দুজন গ্রাহক তাদের সম্পত্তি কেনাবেচা করতেই পারে। এখানে কনফ্লিক্ট অব ইন্টারেস্টের কিছু নেই।” প্রশ্ন রেখে তিনি আরও বলেন, “একজন ব্যাংকের চেয়ারম্যান কি তার সম্পদ বিক্রি করবেন না?”
অর্থের উৎস নিয়ে যত প্রশ্ন
সবচেয়ে বড় প্রশ্নটি ঘুরে ফিরে আসছে—ঋণ আত্মসাৎ ও দুদকের একাধিক মামলা থাকা একটি শিল্পগোষ্ঠী কীভাবে ১,৫০০ কোটি টাকা ব্যয়ে শিল্পপ্রতিষ্ঠান অধিগ্রহণ করতে পারে?
নাম প্রকাশ না করার শর্তে ব্যাংকিং খাতের কর্মকর্তারা বলেন, এ ধরনের বড় বিনিয়োগ হলে অর্থের উৎস যাচাই করা নিয়ন্ত্রক সংস্থার দায়িত্ব। অর্থটি ব্যাংক ঋণ থেকে এসেছে কি না, অথবা অন্য কোনো উপায়ে সংগৃহীত—তা স্পষ্ট নয়।
অর্থায়নের উৎস জানতে চাইলে নাবিল গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক আমিনুল ইসলাম জানান, এমন প্রশ্ন তাঁর প্রত্যাশিত ছিল না। বিষয়টি নিয়ে বিস্তারিত জানাতেও তিনি অনাগ্রহী ছিলেন।
তবে “কিছু অর্থ আমরা নিজেরা সংস্থান করেছি,” উল্লেখ করে তিনি বলেন, “এই অধিগ্রহণ এখনো সম্পন্ন হয়নি, প্রক্রিয়ায় আছে। যখন অধিগ্রহণ চূড়ান্ত হবে, আমরা জানিয়ে দেব।”
বেনামি ঋণের যোগসূত্র
অভিযোগ রয়েছে, নাবিল গ্রুপের ১৪ কর্মী ও সুবিধাভোগীর নামে খোলা নয়টি কোম্পানিকে ইসলামী ব্যাংক ৯,৫৬৫ কোটি টাকা ঋণ দিয়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংক ও ইসলামী ব্যাংকের কর্মকর্তারা নিশ্চিত হয়েছেন, এই বেনামি ঋণের প্রকৃত সুবিধাভোগী মূলত নাবিল গ্রুপ। কিন্তু নাবিল গ্রুপ এই ঋণ স্বীকার করছে না।
ব্যাংকারদের ভাষ্য অনুযায়ী, যদি ঋণের টাকা দিয়ে এই প্রতিষ্ঠানগুলো কেনা হয়ে থাকে, তবে এটি মানিলন্ডারিং বা অর্থের অবৈধ রূপান্তর। ব্যাংকের টাকা অবৈধভাবে বের করে ব্যক্তিগত সম্পদ ক্রয়ে ব্যবহার করা একটি ফৌজদারি অপরাধ।
আবার সিটি ব্যাংকের আমানতকারীদের অর্থ ব্যবহার করে নাবিল গ্রুপের মাধ্যমে পারটেক্স স্টার গ্রুপের তিনটি শিল্প ইউনিট অধিগ্রহণের ঘটনায় জালিয়াতি, ক্ষমতার অপব্যবহার ও মানিলন্ডারিংয়ের অভিযোগ তদন্ত চেয়েও দুদক এবং বাংলাদেশ ফাইনান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিট (বিএফআইইউ) বরাবর আবেদন করা হয়েছে।
বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী শহিদুল ইসলাম এই আবেদন জমা দেন।
কী আছে সেই অভিযোগে
আবেদনে বলা হয়, উল্লিখিত তিন প্রতিষ্ঠান অধিগ্রহণের ক্ষেত্রে সিটি ব্যাংকের আমানতের অর্থ অবৈধভাবে ব্যবহৃত হয়েছে। এতে জালিয়াতি, অভ্যন্তরীণ যোগসাজশ ও ক্ষমতার অপব্যবহারের গুরুতর সন্দেহ তৈরি হয়েছে।
আবেদনকারী উল্লেখ করেন, পারটেক্স স্টার গ্রুপের সংখ্যাগরিষ্ঠ শেয়ারহোল্ডার ও সিটি ব্যাংকের সাবেক চেয়ারম্যান মো. আজিজ আল কায়সার হঠাৎ পদত্যাগ করার পর অল্প সময়ের মধ্যেই এই অধিগ্রহণ সম্পন্ন হয়।
নাবিল গ্রুপের প্রায় ১,৫০০ কোটি টাকার অধিগ্রহণমূল্যের অধিকাংশ সিটি ব্যাংকের অনুমোদিত ১,৮০০ কোটি টাকার ঋণসীমা ব্যবহার করে পরিশোধ করা হয়েছে, যা আমানতকারীদের অর্থ।
ব্যাংকের অভ্যন্তরীণ কর্মকর্তাদের মতে, ঋণ অনুমোদন, জামানত ও সময়সীমা নিয়ে গুরুতর অনিয়ম এবং প্রভাব খাটানোর অভিযোগ রয়েছে, যেখানে তৎকালীন চেয়ারম্যান, বোর্ডের প্রভাবশালী পরিচালকবৃন্দ এবং ব্যবস্থাপনা পরিচালক মাশরুর আরেফিনের সংশ্লিষ্টতা রয়েছে বলেও দাবি করা হয়।
আবেদনে আরও বলা হয়, অধিগ্রহণের আগে পারিবারিক সদস্যদের মধ্যে অস্বাভাবিক শেয়ার হস্তান্তর ও কাঠামোগত পরিবর্তন করা হয়, যা পূর্বপরিকল্পিত প্রস্তুতির ইঙ্গিত দেয় এবং রাষ্ট্রীয় ব্যাংকিং ব্যবস্থা, আমানতকারীদের অর্থ ও আর্থিক শৃঙ্খলা বিপন্ন করার অভিযোগকে আরও শক্তিশালী করে।
নাবিল গ্রুপের উত্থান
নাবিল গ্রুপের উত্থান ছিল নাটকীয় ও দ্রুত। গ্রুপটির ব্যবস্থাপনা পরিচালক আমিনুল ইসলাম দেশের বিতর্কিত ব্যবসায়ী এস আলমের ঘনিষ্ঠ এবং একাধিক মামলায় দুদকের আসামি।
ভোগ্যপণ্য আমদানিতে একসময় মাঝারি পর্যায়ের এই গ্রুপটি ২০২২–২০২৩ সালের মধ্যে দেশের শীর্ষ আমদানিকারক তালিকায় উঠে আসে। কিন্তু এই উত্থানের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বেড়েছে ঋণ।
ইসলামী ব্যাংকসহ একাধিক ব্যাংক থেকে নামে ও বেনামে বিপুল অঙ্কের ঋণ নেওয়ার অভিযোগ ওঠে। শুধু ইসলামী ব্যাংকেই নাবিল গ্রুপের নামে–বেনামে ঋণের পরিমাণ একসময় দাঁড়ায় প্রায় ১৩,৬৪৫ কোটি টাকা।
এই অবস্থায় নাবিল–পারটেক্স স্টার অধিগ্রহণের ঘটনা শেষ পর্যন্ত এমন একটি প্রতীক হয়ে উঠেছে; যা দেখায়, কীভাবে বেনামি ঋণ আত্মসাৎ, করপোরেট ক্ষমতা ও ব্যাংক পরিচালনার সম্পর্ক এক বিন্দুতে এসে মিলিত হয়।
ব্যাংক কর্মকর্তাদের মতে, বাংলাদেশ ব্যাংক, বিএফআইইউ ও দুদকের সমন্বিত এবং গভীর তদন্ত ছাড়া এই লেনদেনের প্রকৃত চিত্র পরিষ্কার হবে না। আর সেই চিত্র পরিষ্কার না হলে ভবিষ্যতেও এমন গল্প বারবার ফিরে আসবে—নতুন নাম, নতুন লেনদেন, কিন্তু পুরোনো সংকট নিয়ে।













