নজিরবিহীন নাটকীয়তার সাক্ষী হয়ে থাকল মতিঝিল। কর্মকর্তাদের বিক্ষোভ, শোকজ-বদলি, উপদেষ্টাকে ‘মব’ করে বের করে দেওয়া এবং নতুন গভর্নর নিয়োগের মধ্য দিয়ে বুধবার (২৫ ফেব্রুয়ারি) এক ঝোড়ো দিন পার করল দেশের সর্বোচ্চ আর্থিক নিয়ন্ত্রক সংস্থা বাংলাদেশ ব্যাংক।
ঘটনার নেপথ্যে রয়েছে গত ১৬ ফেব্রুয়ারি বাংলাদেশ ব্যাংক অফিসার্স ওয়েলফেয়ার কাউন্সিলের একটি সংবাদ সম্মেলন। সেখানে কাউন্সিলের নেতারা গভর্নর ড. আহসান এইচ মনসুরকে ‘স্বৈরাচার’ আখ্যা দিয়ে ব্যাংক একীভূতকরণ ও ডিজিটাল ব্যাংকের লাইসেন্স প্রদান প্রক্রিয়ার কড়া সমালোচনা করেন।
এরই প্রেক্ষিতে সংবাদ সম্মেলন ডাকার এখতিয়ার নিয়ে আইনি মতামত নেয় ব্যাংক কর্তৃপক্ষ। সেই মতামতের ভিত্তিতে পরিচালক নওশাদ মোস্তফা, অতিরিক্ত পরিচালক মাসুম বিল্লাহ ও গোলাম মোস্তফাকে শোকজ করা হয় এবং পরদিনই তাঁদের ঢাকার বাইরে বদলি করা হয়।
বুধবার সকাল ১১টা থেকেই কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ৩০ তলা ভবনের সামনে জড়ো হন তিন-চার শতাধিক কর্মকর্তা। তাঁদের অভিযোগ, গভর্নরের ‘স্বৈরাচারী’ পদক্ষেপের কারণেই এই অস্থিরতা। প্রতিবাদ সভায় বাংলাদেশ ব্যাংকের পরিচালক ও সহকারী মুখপাত্র শাহরিয়ার সিদ্দিকী বলেন, “আমরা চেয়েছি স্বায়ত্তশাসন, কিন্তু পেয়েছি স্বৈরশাসন।”
বিক্ষোভকারীরা ওই তিন কর্মকর্তার বদলি ও শোকজ প্রত্যাহারের দাবিতে আজ পর্যন্ত সময় বেঁধে দেন। অন্যথায় বৃহস্পতিবার থেকে ‘প্রতীকী কলম বিরতি’ এবং রোববার থেকে বৃহত্তর কর্মসূচির ঘোষণা দেন।
বিক্ষোভের মুখে দুপুরে সংবাদ সম্মেলন ডাকেন ড. আহসান এইচ মনসুর। তিনি দাবি করেন, একটি ‘কুচক্রী মহল’ ব্যাংক একীভূতকরণ প্রক্রিয়া ব্যর্থ করতে কর্মকর্তাদের উসকে দিচ্ছে। তিনি কড়া ভাষায় বলেন, “চাকরি করব কিন্তু প্রতিষ্ঠানের নিয়ম মানব না—এটি গ্রহণযোগ্য নয়।” পদত্যাগের প্রসঙ্গে তিনি বলেন, “পদত্যাগ কোনো ইস্যু নয়, সেবা দিতে এসেছি। প্রয়োজন হলে পদত্যাগ করতে দুই সেকেন্ড সময় লাগবে না।”
এর কিছুক্ষণ পরই খবর আসে, দেশের ইতিহাসে প্রথমবারের মতো একজন সরাসরি ব্যবসায়ীকে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কমান্ড তুলে দিয়েছে সরকার। বাংলাদেশ ব্যাংকের ১৪তম গভর্নর হিসেবে নিয়োগ পেয়েছেন মো. মোস্তাকুর রহমান। গভর্নর ড. আহসান এইচ মনসুরের চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ বাতিল করে অর্থ মন্ত্রণালয় এমন প্রজ্ঞাপন জারি করেছে—এমন সংবাদ জানাজানি হওয়ার পরপরই উত্তপ্ত হয়ে ওঠে পরিবেশ।
দুপুর তিনটার দিকে গভর্নরের উপদেষ্টা আহসান উল্লাহর কক্ষে গিয়ে একদল কর্মকর্তা তাঁকে পরিস্থিতি উত্তপ্ত হওয়ার কথা জানিয়ে বেরিয়ে যেতে বলেন। নিচে নামার পর ৩৫-৪০ জন কর্মকর্তা তাঁকে ঘিরে ধরেন এবং গালিগালাজ শুরু করেন। একপর্যায়ে উশৃঙ্খল পরিবেশের মধ্যে তিনি ব্যাংক ত্যাগ করেন। মর্মাহত আহসান উল্লাহ বলেন, “আমি এই প্রতিষ্ঠানেই কর্মজীবন শেষ করেছি, এমন আচরণ প্রত্যাশা করিনি।”
অন্যদিকে, সচিবালয় থেকে বের হওয়ার সময় অর্থমন্ত্রী আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী সাংবাদিকদের বলেন, “নতুন সরকার ক্ষমতায় এসেছে, অনেক কিছু পরিবর্তন হবে। এটি স্বাভাবিক প্রক্রিয়া।”
তবে এই নিয়োগ নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন অর্থনীতিবিদ ও সাউথ এশিয়ান নেটওয়ার্ক অন ইকোনমিক মডেলিং (সানেম)-এর নির্বাহী পরিচালক সেলিম রায়হান। তিনি ফেসবুকে এক পোস্টে প্রশ্ন তোলেন, একজন ব্যবসায়ীকে নিয়ন্ত্রক সংস্থার প্রধান করা হলে ‘স্বার্থের সংঘাত’ তৈরি হবে কি না। ব্যাংক খাত সংস্কারে সরকার সত্যিই আন্তরিক কি না, তা নিয়েও তিনি সংশয় প্রকাশ করেন।
দিনভর টানটান উত্তেজনার পর বিকেলের দিকে হার মানতে হয় ব্যাংক প্রশাসনকে। এইচআরডি থেকে জারি করা এক নির্দেশনায় জানানো হয়, অভিযুক্ত তিন কর্মকর্তার বদলির আদেশ প্রত্যাহার করা হয়েছে এবং তাঁরা নিজ নিজ বিভাগেই বহাল থাকবেন।
সব মিলিয়ে, একজন গভর্নরের বিদায় এবং নতুন গভর্নরের আগমনের দিনটিতে বাংলাদেশ ব্যাংক এমন এক অস্থিরতার মধ্য দিয়ে গেল, যা কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ভাবমূর্তি নিয়ে বড় ধরনের আলোচনার জন্ম দিয়েছে।













