ছবি: ডিএসজে আর্কাইভ
এক সময় প্রতিদিনই কিছু ব্যাংকের সামনে দীর্ঘ লাইনে দাঁড়িয়ে টাকা তুলতে দেখা যেতো গ্রাহকদের। ঋণের নামে আমানত আত্মসাৎ, গুজব, আতঙ্ক আর অনিশ্চয়তায় মানুষ বিশ্বাস হারিয়েছিল ব্যাংক ব্যবস্থার ওপর। ফলে, ব্যাংকের পরিবর্তে ঘরে ঘরে জমে উঠেছিল নগদ টাকা। কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে সেই চিত্র ধীরে ধীরে বদলাতে শুরু করেছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য বলছে, মানুষের হাতে থাকা নগদ টাকা কমছে। চলতি বছরের সেপ্টেম্বরে ব্যাংকের বাইরে থাকা নগদ টাকার পরিমাণ ছিল ২ লাখ ৭৪ হাজার ৭২৪ কোটি টাকা। মাত্র এক মাসের ব্যবধানে, অক্টোবরে সেই অংক কমে দাঁড়িয়েছে ২ লাখ ৭০ হাজার ৪৪৯ কোটি টাকায়। অর্থাৎ, এক মাসেই মানুষের হাতে থাকা নগদ টাকা কমেছে ৪ হাজার ২৭৪ কোটি টাকা। আর এই পরিসংখ্যানের আড়ালেই লুকিয়ে আছে ব্যাংকখাতে ফিরে আসা আস্থার এক গুরুত্বপূর্ণ বার্তা।
এই পরিবর্তন হঠাৎ নয়। বরং এটি একটি ধারাবাহিক প্রবণতার অংশ। ২০২৫ সালের জুন মাসে মানুষের হাতে নগদ টাকার পরিমাণ বেড়ে দাঁড়িয়েছিল প্রায় ২ লাখ ৯৬ হাজার কোটি টাকা, যা ছিল ব্যাংকখাতের ওপর আস্থাহীনতার সবচেয়ে বড় প্রতিফলন। এরপর জুলাই, আগস্ট ও সেপ্টেম্বর—প্রতিটি মাসেই ধাপে ধাপে নগদ টাকার পরিমাণ কমেছে।
অর্থনীতিবিদদের মতে, এটি কেবল সংখ্যার খেলা নয়; এটি মানুষের মনস্তত্ত্বের পরিবর্তনের ইঙ্গিত।
ভয় থেকে বিশ্বাসে ফেরার অর্থনীতি
উচ্চ মূল্যস্ফীতি ও ব্যাংকিং ব্যবস্থার ওপর আস্থার সংকট—এই কারণেই ব্যাংকের বাইরে নগদ টাকা বেড়ে যাওয়ার সংকেত দেয়। গত দুই বছরে বাংলাদেশ এই দুই সংকটই প্রত্যক্ষ করেছে। একদিকে, লাগামছাড়া মূল্যস্ফীতি, অন্যদিকে একের পর এক ঋণ কেলেঙ্কারি, ব্যাংক লুট ও তারল্য সংকট। এর ফলে মানুষ নিরাপত্তার আশায় ব্যাংক থেকে টাকা তুলে ঘরে রেখেছিল।
কিন্তু এখন পরিস্থিতি বদলাচ্ছে। মানারাত আন্তর্জাতিক বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের অধ্যাপক ড. মিজানুর রহমান বলেন, “মানুষ যখন ঘরে রাখা টাকা আবার ব্যাংকে জমা দেয়, তখন সেটি শুধু আস্থার প্রতিফলন নয়—এটি অর্থনীতির জন্য অক্সিজেনের মতো কাজ করে। এই টাকা বিনিয়োগে যায়, উৎপাদনে যায়, কর্মসংস্থান তৈরি করে।” তবে তিনি সতর্ক করে বলেন, এই আস্থা যদি ধরে রাখতে হয়, তাহলে ব্যাংকখাতের পুরনো রোগগুলোকে আর অবহেলা করা যাবে না।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ভূমিকা ও দায়
বাংলাদেশ ব্যাংক বলছে, তারা এই পরিবর্তনকে ইতিবাচক হিসেবেই দেখছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নির্বাহী পরিচালক ও মুখপাত্র আরিফ হোসেন খান জানান, “আগে কিছু সমস্যার কারণে মানুষ আতঙ্কে ব্যাংক থেকে টাকা তুলে নিয়েছিল। এখন পরিস্থিতি স্বাভাবিক হওয়ায় মানুষ আবার ব্যাংকমুখী হচ্ছে। ব্যাংকের বাইরে নগদ টাকার পরিমাণ কমে আসা মানেই গ্রাহকদের আস্থা বাড়ছে।”
তিনি আরও জানান, আস্থা ধরে রাখতে ব্যাংকিং কার্যক্রমে তদারকি জোরদার করা হয়েছে এবং নিয়ম-নীতির প্রয়োগে কঠোর অবস্থান নিয়েছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক।
কমছে ছাপানো টাকা, বদলাচ্ছে অর্থনীতির গতি
মানুষের হাতে নগদ টাকা কমার সঙ্গে সঙ্গে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ সূচকও নিম্নমুখী, মুদ্রা সরবরাহ। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, সেপ্টেম্বরে রিজার্ভ মানি বা ছাপানো টাকার পরিমাণ ছিল ৩ লাখ ৮৮ হাজার ১৯৬ কোটি টাকা। অক্টোবরে তা কমে দাঁড়িয়েছে ৩ লাখ ৮০ হাজার ৮৮৭ কোটি টাকায়। অর্থাৎ এক মাসে মুদ্রা সরবরাহ কমেছে ৭ হাজার ৩০৯ কোটি টাকা। বিশ্লেষকদের মতে, এটি মুদ্রাস্ফীতির চাপ কমানোর ক্ষেত্রেও সহায়ক হতে পারে, যদি একই সঙ্গে ব্যাংকিংখাতে সুশাসন নিশ্চিত করা যায়।
পর্যালোচনায় দেখা যায়, দেশের সরকারি ও বেসরকারি শীর্ষস্থানীয় ব্যাংকগুলোতে আমানতের পরিমাণ উল্লেখযোগ্য হারে বাড়ছে। আমানতকারীরা দুর্বল ব্যাংক থেকে টাকা তুলে নিয়ে এসব ব্যাংকে জমা রাখছেন। ইউসিবির মতো ঋণ কেলেঙ্কারিতে যুক্ত ব্যাংকেও আমানত ব্যাপক হারে বেড়েছে। ২০২৫ সালে ব্যাংকটির আমানত আগের বছরের চেয়ে প্রায় তিন গুণ বেড়েছে, যা প্রায় ১৩ হাজার কোটি টাকা।
এছাড়া গত সেপ্টেম্বর পর্যন্ত আমানতে সবচেয়ে বেশি প্রবৃদ্ধি দেখা যায় বেসরকারি সিটি ও ব্র্যাক ব্যাংকে, যথাক্রমে ২৩.৪ ও ২০.৬৮ শতাংশ। এ দুই ব্যাংকে ২৮ হাজার কোটি টাকারও বেশি আমানত বাড়ে। এছাড়া যমুনা, পূবালী, ডাচবাংলা, ইস্টার্ন, ট্রাস্ট ও ঢাকা ব্যাংকেরও আমানতে প্রবৃদ্ধি দুই অংক ছাড়িয়ে যায়। এমনকী ঋণের প্রায় অর্ধেক হারানো ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশও ২০২৫ সালের প্রথম নয় মাসে ১৮ হাজার ৫৭৮ কোটি টাকার আমানত পেয়েছে।প্রায় দেউলিয়া অবস্থায় একীভূত হওয়া পাঁচ ইসলামী ব্যাংকও চলতি বছর যাত্রার শুরুর দুই দিনে ৪৪ কোটি টাকার আমানত পেয়েছে।
আস্থা টিকবে তো!
ব্যাংকখাতে আস্থা ফেরার এই প্রাথমিক লক্ষণ আশাব্যঞ্জক হলেও প্রশ্ন থেকেই যায়, এই আস্থা কতটা টেকসই হবে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, খেলাপি ঋণ, রাজনৈতিক প্রভাব, বেনামি ঋণ ও অর্থ পাচারের মতো সমস্যাগুলো যদি আগের মতোই চলতে থাকে, তবে এই আস্থা আবারও ভেঙে পড়তে পারে।
ড. মিজানুর রহমানের ভাষায়, “আস্থা তৈরি হতে সময় লাগে, কিন্তু ভাঙতে সময় লাগে না। তাই কেন্দ্রীয় ব্যাংক ও সরকারের জন্য এটি এখন একটি পরীক্ষার মুহূর্ত।”
মানুষের হাতে থাকা নগদ টাকা কমছে—এই একটি পরিসংখ্যানের ভেতর লুকিয়ে আছে বাংলাদেশের অর্থনীতির একটি বড় গল্প। এটি আতঙ্ক থেকে স্বাভাবিকতায় ফেরার গল্প! বিশ্বাস হারানো মানুষের আবার ব্যাংকমুখী হওয়ার গল্প! তবে এই গল্পের শেষটা কেমন হবে, তা নির্ভর করছে একটি প্রশ্নের ওপর- ব্যাংকখাত এবার সত্যিই বদলাতে পারবে তো!













