ছবি: ডিএসজে কোলাজ
“আমরা নেপালকে আরেকটি বাংলাদেশ হতে দেব না,” নেপালের অন্তবর্তী সরকারের প্রধান সুশিলা কার্কির সাম্প্রতিক মন্তব্য নিয়ে আলোচনার রেশ কাটতে না কাটতেই ঢাকায় দুই দেশের অষ্টম বাণিজ্য সচিব পর্যায়ের বৈঠক অনুষ্ঠিত হলো।
এক বছরের ব্যবধানে জেন-জি আন্দোলনে সরকার পতনের সাক্ষী হওয়া দক্ষিণ এশিয়ার এই দুই দেশই পারস্পরিক অর্থনৈতিক সহযোগিতা ও বাণিজ্য সম্প্রসারণকে অগ্রাধিকার দিচ্ছে বলে জানিয়েছে বাংলাদেশের একাধিক রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যম।
নেপালে দুর্নীতি ও অর্থনৈতিক সংকটের বিরুদ্ধে জেন-জি প্রজন্মের আন্দোলন ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বরে কেপি শর্মা ওলি সরকারের পতন ঘটায়। এরপর ক্ষমতা নেওয়া অন্তবর্তী সরকারের প্রধান সুশিলা কার্কি গত ৫ জানুয়ারি কাঠমান্ডুতে এক প্রকাশ্য সভায় উল্লিখিত মন্তব্য করেন।
তার আগে ১৮ ডিসেম্বর ময়মনসিংহের ভালুকায় গার্মেন্টস শ্রমিক দিপু চন্দ্র দাসকে ধর্মীয় অবমাননার অভিযোগে উত্তেজিত জনতা পিটিয়ে হত্যা করে, তার মরদেহ গাছে ঝুলিয়ে আগুন ধরিয়ে দেওয়া হয়। পরবর্তীতে দক্ষিণ নেপালের সীমান্ত শহর বিরগঞ্জে ৪ জানুয়ারি একটি মসজিদে সাম্প্রদায়িক হামলার সময় এক মুসলিম যুবক নিহত হওয়ার প্রেক্ষিতে কার্কি ওই আলোড়ন তৈরি করা মন্তব্যটি করেছিলেন।
বাংলাদেশে ২০২৪ সালের আগস্টে জেন-জি আন্দোলনে শেখ হাসিনা সরকারের পতন ঘটে এবং বর্তমানে দেশের ক্ষমতায় রয়েছে শান্তিতে নোবেল বিজয়ী অর্থনীতিবিদ ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বে গঠিত অন্তবর্তী সরকার।
দুই দেশেই একটি অন্তবর্তী সরকারের আমলে এমন সাম্প্রদায়িক শক্তির বিস্তার দক্ষিণ এশিয়ার রাজনৈতিক বাস্তবতাকে নতুন আলোচনায় নিয়ে এসেছে। জনআন্দোলনের পর স্থিতিশীল গণতান্ত্রিক শাসন প্রতিষ্ঠার চ্যালেঞ্জকে সামনে রেখে কার্কির দেওয়া ওই বক্তব্য নিয়ে কোনো আনুষ্ঠানিক প্রতিক্রিয়া জানায়নি ঢাকা।
তবে এই রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটেই ১৩-১৪ জানুয়ারি ঢাকার হোটেল ইন্টারকন্টিনেন্টালে বাংলাদেশ ও নেপালের মধ্যে অষ্টম বাণিজ্য সচিব পর্যায়ের বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়।
বাংলাদেশ প্রতিনিধি দল নেতৃত্ব দেন বাণিজ্য সচিব মাহবুবুর রহমান এবং নেপাল প্রতিনিধি দল নেতৃত্ব দেন বাণিজ্য সচিব ড. রাম প্রসাদ ঘিমিরে। বৈঠকে উভয় পক্ষ বিদ্যমান সৌহার্দ্যপূর্ণ সম্পর্কের প্রতি সন্তোষ প্রকাশ করে এবং ভবিষ্যতে তা আরও জোরদার করার আশাবাদ ব্যক্ত করে।
আলোচনায় অগ্রাধিকারমূলক বাণিজ্য চুক্তি (পিটিএ) চূড়ান্তকরণ, ভিসা প্রক্রিয়া সহজীকরণ, ট্যারিফ ও নন-ট্যারিফ বাধা হ্রাস, বাজার প্রবেশাধিকার বৃদ্ধি, পেমেন্ট ব্যবস্থার উন্নয়ন, বন্দর অবকাঠামো ও রেল সংযোগ সম্প্রসারণ, কাস্টমস প্রক্রিয়া সহজীকরণ এবং ট্রানজিট সুবিধা কার্যকর করার মতো বিষয়গুলো গুরুত্ব পায়।
দৃশ্যত রাজনৈতিক অস্থিরতার মাঝেও দুই দেশ অর্থনৈতিক সহযোগিতা ও বাণিজ্য সম্প্রসারণকে অগ্রাধিকার দিচ্ছে। একদিকে নেপাল তার অভ্যন্তরীণ সংকট থেকে বেরিয়ে আসতে চায়, অন্যদিকে বাংলাদেশ এলডিসি উত্তরণের পর টেকসই উন্নয়নের পথে এগোচ্ছে।
উভয় দেশের তরুণ প্রজন্মের আন্দোলন সরকার পতনের দিকে নিয়ে গেলেও, রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে সহযোগিতা ও পারস্পরিক সম্পর্ক জোরদারের প্রচেষ্টা অব্যাহত রয়েছে।
এই প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশ-নেপাল সম্পর্ককে শুধু অর্থনৈতিক নয়, রাজনৈতিক বাস্তবতার সঙ্গেও যুক্ত করে দেখছেন অনেকে। কারণ, দুই দেশই একই সময়ে প্রজন্মভিত্তিক আন্দোলনের অভিঘাত মোকাবিলা করছে এবং একই সঙ্গে আঞ্চলিক সহযোগিতার মাধ্যমে স্থিতিশীলতার পথ খুঁজছে।
নেপালের অন্তবর্তী সরকারের সতর্কবার্তা এবং ঢাকার বৈঠকের আশাবাদী বার্তা মিলিয়ে দক্ষিণ এশিয়ার ভবিষ্যৎ রাজনীতি ও অর্থনীতির এক জটিল কিন্তু সম্ভাবনাময় চিত্র ফুটে উঠছে। সুবিধাজনক সময়ে নেপালে নবম বাণিজ্য সচিব পর্যায়ের সভা আয়োজনের বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।













