দিনে প্রায় হাজার কোটি টাকা ঋণ নিচ্ছে সরকার

Web Photo April 11 2026 BangladeshEconomy
ডিএসজে

রাজস্ব আদায়ে বড় ধরনের ধস এবং ক্রমবর্ধমান পরিচালন ব্যয় মেটাতে ব্যাংক ব্যবস্থার ওপর অতিমাত্রায় নির্ভরশীল হয়ে পড়েছে বর্তমান সরকার। বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের লুটপাটের পর অর্থনীতির বেহাল পরিস্থিতি সামলাতে বিএনপির নতুন সরকারকে দেশের ব্যাংকিং ব্যবস্থা থেকে প্রতিদিন প্রায় হাজার কোটি টাকা ঋণ নিতে হচ্ছে। বাংলাদেশ ব্যাংক সুত্রে এ তথ্য জানা গেছে।

২০২৫-২৬ অর্থবছরের মাত্র নয় মাস পার হতেই ব্যাংক ঋণের পরিমাণ পুরো বছরের নির্ধারিত লক্ষ্যমাত্রাকে ছাড়িয়ে গেছে, যা দেশের অর্থনীতির জন্য বড় ধরনের অশনিসংকেত বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।

গত ফেব্রুয়ারিতে জাতীয় নির্বাচনে বিপুল বিজয়ের পর গত ১৭ ফেব্রুয়ারি সরকার গঠন করে বিএনপি। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, বিএনপি সরকার গঠনের পরবর্তী ৪২ দিনে অর্থাৎ ৩১ মার্চ পর্যন্ত সরকার ব্যাংক খাত থেকে ৪০ হাজার ৭৫৬ কোটি টাকা ঋণ নিয়েছে। অর্থাৎ, গড়ে প্রতিদিন ৯৭০ কোটি টাকার ঋণ নিচ্ছে রাষ্ট্র।

বিগত আওয়ামী সরকারের ব্যাপক লুটপাট এবং বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলে চলমান যুদ্ধ পরিস্থিতি ও জ্বালানি সংকটে বিএনপি সরকার ক্ষমতা গ্রহণের পর থেকেই ব্যাপক চ্যালেঞ্জের মধ্যে পড়েছে। স্থবির অর্থনীতি আর বিনিয়োগ খরায় কর্মসংস্থান যখন তলানিতে, তখন সরকারকে এমন আগ্রাসী ঋণ নিতে হচ্ছে, যা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলছে।

সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) সম্মানীয় ফেলো ড. মুস্তাফিজুর রহমান মনে করেন, সরকারকে এখন সবচেয়ে বেশি জোর দিতে হবে অভ্যন্তরীণ সম্পদ আহরণ ও রাজস্ব বৃদ্ধির দিকে। তিনি বলেন, “আমরা যাতে কোনোভাবেই ‘ঋণ ফাঁদে’ না পড়ি, সেটা এই সরকারের মূল লক্ষ্য হওয়া উচিত। জ্বালানি ও বৈশ্বিক সংকটের পাশাপাশি নির্বাচনী ইশতেহারের প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়ন করতে গিয়ে সরকার ঋণ নিচ্ছে, কিন্তু সম্পদ আহরণ না বাড়ালে এটি টেকসই হবে না।”
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তথ্যানুযায়ী, চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরের প্রথম নয় মাসেই সরকার ব্যাংক থেকে প্রায় ১ লাখ ৯ হাজার কোটি টাকা ঋণ নিয়েছে। যেখানে পুরো অর্থবছরের জন্য ব্যাংক ব্যবস্থা থেকে ঋণ নেওয়ার লক্ষ্যমাত্রা ছিল ১ লাখ ৪ হাজার কোটি টাকা। বিস্ময়কর তথ্য হলো, কেবল জানুয়ারি থেকে মার্চ—এই তিন মাসেই ঋণের পরিমাণ ছিল প্রায় ৫৬ হাজার কোটি টাকা, যা আগের ছয় মাসের মোট ঋণের চেয়েও বেশি। মূলত বিএনপি নেতৃত্বাধীন সরকার দায়িত্ব নেওয়ার ৪২ দিনেই ঋণের গ্রাফটি উল্লম্বভাবে ওপরের দিকে উঠেছে।

মূলত রাজস্ব আদায়ে বড় ধরনের ঘাটতির কারণে ব্যাংক থেকে ঋণ নিয়ে রাষ্ট্রীয় পরিচালন কার্যক্রম চালাতে হচ্ছে। জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) দেওয়া তথ্যানুযায়ী, চলতি অর্থবছরের প্রথম আট মাসেই রাজস্ব আদায়ে প্রায় ৭১ হাজার ৫০০ কোটি টাকার বিশাল ঘাটতি তৈরি হয়েছে। চড়া মূল্যস্ফীতির কারণে মানুষের কেনাকাটা কমে যাওয়ায় ভ্যাট ও ট্যাক্স সংগ্রহে এই স্থবিরতা দেখা দিয়েছে। এছাড়া মধ্যপ্রাচ্যের উত্তেজনার ফলে জ্বালানি ও অন্যান্য ব্যয় বৃদ্ধি পাওয়ায় সরকার ব্যয় সংকোচ করতে পারছে না। ফলে বাজেট ঘাটতি মেটাতে ব্যাংক থেকে ‘দুহাত ভরে’ ঋণ করতে হচ্ছে।

ব্যাংক থেকে সরকারের এই বিপুল পরিমাণ অর্থ সরিয়ে নেওয়ার ফলে বেসরকারি খাতে ঋণপ্রবাহ সংকুচিত হওয়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। ঢাকা চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির (ডিসিসিআই) সভাপতি তাসকীন আহমেদ এই পরিস্থিতিকে ‘ভীষণ তারল্য সংকট’ হিসেবে অভিহিত করেছেন। তিনি বলেন, “অর্ধেক ব্যাংকই এখন মূলধন ঘাটতিতে রয়েছে, যার পরিমাণ ২ লাখ ৮২ হাজার কোটি টাকা। এছাড়া খেলাপি ঋণ সংক্রান্ত কঠোর নীতির কারণে অনেক ব্যবসায়ী অর্থায়ন পাওয়ার যোগ্যতা হারিয়েছেন। এমন অবস্থায় সরকার যদি ব্যাংক থেকে বেশি ঋণ নেয়, তবে বেসরকারি বিনিয়োগ পুরোপুরি থেমে যাবে।”

অন্যদিকে বিকেএমইএ সভাপতি মোহাম্মদ হাতেম বর্তমান ব্যবসা-বাণিজ্যের নাজুক অবস্থার কথা উল্লেখ করে সতর্ক করেছেন। তাঁর মতে, সরকার যদি দীর্ঘমেয়াদে ব্যাংক ঋণের ওপর এভাবে নির্ভরশীল থাকে, তবে এই ঋণ পরিশোধ করতে গিয়ে রাষ্ট্র ভবিষ্যতে গভীর অর্থনৈতিক সংকটে পড়বে।

কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর গত ১৪ মাসে ব্যাংক ঋণ বেড়েছে প্রায় পৌনে ২ লাখ কোটি টাকা। এর বড় অংশই নেওয়া হয়েছে অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে, গত দেড় বছরে। বিশ্লেষকদের মতে, সরকার যদি এমন আগ্রাসীভাবে ঋণ নিতে থাকে, তবে প্রবৃদ্ধির গতি থমকে যাবে এবং মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ করা অসম্ভব হয়ে পড়বে।

Share this article

আপনারা চাইলে কাস্টম বিজ্ঞাপন এইখানে দিতে পারেন
বিজ্ঞাপনের ছবি বা ভিডিও সাইজ ৩৩৬x২৮০ পিক্সাল হতে হবে

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Scroll to Top