ড্রোনের গুঞ্জন আর ক্ষেপণাস্ত্রের গর্জনে প্রকম্পিত মধ্যপ্রাচ্যের আকাশ। সেখানে শুরু হওয়া মহাযুদ্ধের শঙ্কা জাগানিয়া সংঘাতে ইতিমধ্যে প্রাণ হারিয়েছেন দুই বাংলাদেশি নাগরিক, আহত হয়েছেন আরও সাতজন। তাই সুদূর মরুভূমির তপ্ত বালুতে চলমান যুদ্ধের আঁচ এসে লেগেছে দক্ষিণ এশিয়ার এই বদ্বীপেও।
বাংলাদেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সোমবার (২ মার্চ) এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে হতাহতের খবরের সত্যতা নিশ্চিত করে জানিয়েছে, যুদ্ধাক্রান্ত দেশগুলোয় থাকা ৬০ লাখেরও বেশি প্রবাসী বাংলাদেশির নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এখন সরকারের জন্য সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।
সংযুক্ত আরব আমিরাতের আজমানে এক বেসামরিক স্থাপনায় বিমান হামলায় রোববার (১ মার্চ) প্রাণ হারিয়েছেন সিলেটের বড়লেখার সন্তান সালেহ আহমেদ ওরফে আহমদ আলী (৫০)। অন্যদিকে বাহরাইনের মানামায় সোমবার ভোরে প্রাণ হারিয়েছেন মোহাম্মদ তারেক (৪৮) নামে আরও এক প্রবাসী।
কুয়েতে একটি বেসামরিক বিমানবন্দরের কাছাকাছি ড্রোন হামলায় চার বাংলাদেশি আহত হয়েছেন। তাঁরা হলেন—ব্রাহ্মণবাড়িয়ার নবীনগরের আমিনুল ইসলাম, পাবনার সাথিয়ার রবিউল ইসলাম, নোয়াখালীর বেগমগঞ্জের মাসুদুর রহমান এবং কুমিল্লার চান্দিনার দুলাল মিয়া।
পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে সোমবার এক আন্তঃমন্ত্রণালয় বৈঠক শেষে সাংবাদিকদের পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামা ওবায়েদ বলেন, মধ্যপ্রাচ্যে চলমান যুদ্ধ পরিস্থিতির মধ্যে বিদেশগামী ও প্রবাসী বাংলাদেশি নাগরিকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করাই সরকারের ‘নম্বর ওয়ান প্রায়োরিটি’।
“যে যুদ্ধ চলছে তার পরিপ্রেক্ষিতে আমাদের যে নাগরিকরা বিভিন্ন দেশে যেতে পারেননি কিংবা পথে আটকে পড়েছেন, তাঁদের সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিত করা এবং উপসাগরীয় দেশগুলোতে অবস্থানরত বাংলাদেশি নাগরিকদের নিরাপত্তা ও সার্বিক পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণের জন্য আন্তঃমন্ত্রণালয় বৈঠক ডাকা হয়েছিল,” বলেন তিনি।
সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে এদিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. খলিলুর রহমান বলেন, “বাংলাদেশের অবস্থান খুব সোজা। প্রথম কথা হচ্ছে আমরা আমাদের জনগণ অর্থাৎ আমাদের যারা নাগরিক ওই অঞ্চলে আছেন, তাঁদের স্বার্থ রক্ষা করব।”
“আমরা মনে করি না যুদ্ধ বা সংঘাত কোনো সমাধান আনতে পারে। আমরা চাই দ্রুততম সময়ে আলোচনা বা কূটনীতির মাধ্যমে শান্তিপূর্ণভাবে এ সমস্যার সমাধান হোক,” উল্লেখ করে পররাষ্ট্রমন্ত্রী আরও বলেন, “আমরা শুরু থেকেই বলে আসছি ওই অঞ্চলে আমাদের যে প্রবাসী নাগরিক, তাঁদের স্বার্থ আমাদের অগ্রাধিকার। আমরা ১ মার্চ যে বিবৃতি দিয়েছি, সেখানেও আমাদের প্রবাসীদের স্বার্থ সমুন্নত রেখেছি।”
“আমাদের নাগরিকরা আক্রান্ত হলে, সেটা কাঁটাতারের বেড়ার এপাশে বা ওপাশে যেখানেই হোক, আমরা তাঁদের পাশে দাঁড়াব। আমাদের সবচেয়ে বড় জাতীয় স্বার্থ হচ্ছে আমাদের জনগণ,” যোগ করেন তিনি। ড. খলিলুর বলেন, “আমরা আশা করি এ সংঘাতে আর কোনো বাংলাদেশির প্রাণহানি ঘটবে না বা আর কেউ আহত হবেন না। কিন্তু সে রকম অবস্থা হলে আমাদের যা যা কর্তব্য সবটুকুই করব।”
যুদ্ধের দামামা বাজতেই লণ্ডভণ্ড হয়ে গেছে আন্তর্জাতিক আকাশপথ। সরকারি হিসেবে সোমবার দুপুর নাগাদ হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে বাতিল হয়েছে ৩৯টি ফ্লাইট। মধ্যপ্রাচ্যের আকাশসীমা বন্ধ থাকায় এ নিয়ে গত তিন দিনে ঢাকা থেকে ১০২টি ফ্লাইট বাতিল হয়েছে। বিমানবন্দরের টার্মিনালে এখন শত শত যাত্রীর হাহাকার।
শামা ওবায়েদ বলেন, যেসব যাত্রীর ভিসার মেয়াদ শেষ হওয়ার ঝুঁকি রয়েছে বা জরুরি ভ্রমণের প্রয়োজন রয়েছে, তাঁরা যেন এয়ারলাইন্সগুলোর কাছ থেকে প্রয়োজনীয় সহায়তা পান এবং দুর্ভোগে না পড়েন—সেই লক্ষ্যেই বৈঠকটি অনুষ্ঠিত হয়েছে।
তিনি বলেন, সব মন্ত্রণালয় সমন্বয়ের মাধ্যমে একসঙ্গে কাজ করছে। আমাদের নম্বর ওয়ান প্রায়োরিটি (অগ্রাধিকার) হলো বাংলাদেশি নাগরিকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা।
তিনি আরও জানান, সৌদি আরব, কাতারসহ বিভিন্ন দেশে যাওয়ার কথা থাকলেও যাঁরা এখনো ভ্রমণ করতে পারছেন না, তাঁদের নিরাপদ অবস্থান নিশ্চিত করতে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। বর্তমান পরিস্থিতি অনিশ্চিত থাকায় কবে স্বাভাবিক ভ্রমণ শুরু হবে তা নিশ্চিত করে বলা যাচ্ছে না। তবে ভ্রমণ চালু হলে যাত্রীরা যাতে কোনো জটিলতা ছাড়াই নির্ধারিত রিপোর্টিং স্থানে যেতে পারেন, সে প্রস্তুতি রাখা হয়েছে।
অন্যদিকে, ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনির হত্যাকাণ্ডের খবর ছড়িয়ে পড়ার পর মুসলিম বিশ্বে চরম উত্তেজনা বিরাজ করছে। আল জাজিরা, রয়টার্সসহ বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমের তথ্য অনুযায়ী, এই ঘটনার প্রতিবাদে পাকিস্তান ও ইরাকসহ বেশ কয়েকটি দেশে অবস্থিত মার্কিন দূতাবাসে বিক্ষুব্ধ জনতা হামলা চালিয়েছে। বিশেষ করে বাগদাদের গ্রিন জোনে মার্কিন দূতাবাসের নিরাপত্তা বেষ্টনী ভেঙে প্রবেশের চেষ্টা করে বিক্ষোভকারীরা।
করাচিতেও মার্কিন কনসুলেটের সামনে ব্যাপক সংঘর্ষে হতাহতের খবর পাওয়া গেছে। এই উত্তপ্ত পরিস্থিতিতে সোমবার সকালে সচিবালয়ে মার্কিন রাষ্ট্রদূত ব্রেন্ট টি ক্রিস্টেনসেনের সঙ্গে বৈঠকে বসেছিলেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ। আলোচনার কেন্দ্রে ছিল ঢাকার কূটনৈতিক এলাকার নিরাপত্তা ও ‘এসপিইএআর’ (স্পেশাল প্রোগ্রাম ফর এম্বাসি অগমেন্টেশন অ্যান্ড রেসপন্স) প্রোগ্রামের বাস্তবায়ন। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী নিশ্চিত করেছেন, মার্কিন দূতাবাসসহ ডিপ্লোমেটিক এরিয়ার নিরাপত্তা জোরদারে বিজিবি (বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ) মোতায়েন করা হয়েছে।
দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের এই উষ্ণতার মাঝেই এদিন আবার এক শীতল বার্তা এসেছে মার্কিন দূতাবাসের ফেসবুক পেজে। এক পোস্টে জানানো হয়েছে, যুক্তরাষ্ট্রের নবনির্বাচিত প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের অভিবাসন নীতি অনুযায়ী, বাংলাদেশসহ কয়েক ডজন দেশের নাগরিকদের জন্য অভিবাসি ভিসা স্থগিত করা হয়েছে। ২১ জানুয়ারি থেকে কার্যকর হওয়া এই সিদ্ধান্তের পেছনে নাগরিকদের ‘আর্থিক স্বনির্ভরতা’ ও করদাতাদের ওপর বোঝা না হওয়ার যুক্তি দেখানো হয়েছে।
ইতিমধ্যে ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনির হত্যাকাণ্ডে গভীর শোক প্রকাশ করেছে বাংলাদেশ সরকার। “সরকার ভ্রাতৃপ্রতিম ইরানের জনগণের প্রতি আন্তরিক সমবেদনা জানিয়েছে,” উল্লেখ করে বিবৃতিতে বলা হয়েছে, “পরিকল্পিত হামলায় ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি হত্যাকাণ্ডের শিকার হয়েছেন জেনে বাংলাদেশ সরকার গভীরভাবে শোকাহত। এ ধরনের হামলা আন্তর্জাতিক আইন ও রীতিনীতির সুস্পষ্ট লঙ্ঘন।”
উদ্ভূত পরিস্থিতিতে আবুধাবিতে অবস্থিত বাংলাদেশ দূতাবাস খোলা থাকলেও প্রবাসীদের বাইরে অপ্রয়োজনীয় যাতায়াত এড়িয়ে চলার কঠোর নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। জরুরি প্রয়োজন ছাড়া দূতাবাসে না যাওয়ারও অনুরোধ জানিয়েছে তারা। এক বার্তায় কর্তৃপক্ষ লিখেছে, “বাংলাদেশ সরকার ও দূতাবাস সব সময় আপনাদের পাশে রয়েছে। একই সঙ্গে আমিরাত সরকারও তাঁদের সব বাসিন্দার নিরাপত্তা নিশ্চিতে পূর্ণ প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। নিরাপদ থাকুন এবং সর্বশেষ তথ্য সম্পর্কে সচেতন থাকুন।”
অন্যদিকে, হরমুজ প্রণালী ও বৈশ্বিক সরবরাহ ব্যবস্থা নিয়ে সরকার সতর্ক থাকলেও এখনই আতঙ্কিত না হওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির। ভারতীয় হাইকমিশনারের সঙ্গে সোমবার এক বৈঠক শেষে সাংবাদিকদের তিনি বলেন, “হরমুজ প্রণালী পরিস্থিতি সরকার নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করছে। এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ বৈশ্বিক বাণিজ্য রুট হলেও, প্রয়োজনীয় পণ্য ও জ্বালানি আমদানি নিয়ে তাৎক্ষণিকভাবে উদ্বিগ্ন হওয়ার কোনো কারণ নেই। এখনই অতিরিক্ত উদ্বিগ্ন হওয়ার সময় নয়, পরিস্থিতি কয়েক দিনের মধ্যেই স্বাভাবিক হয়ে যেতে পারে। জ্বালানি বা নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের সরবরাহ নিয়ে জনসাধারণের উদ্বিগ্ন হওয়ার কোনো কারণ নেই।”
মন্ত্রী উল্লেখ করেন, ভারত চার ট্রিলিয়ন মার্কিন ডলারের বেশি জিডিপি নিয়ে বাংলাদেশের একটি প্রধান অর্থনৈতিক অংশীদার এবং দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্য বাধা নিরসনে দুই দেশ কাজ করে যাচ্ছে। পাশাপাশি এলডিসি উত্তরণ প্রক্রিয়া স্থগিতের জন্য জাতিসংঘের কাছে বাংলাদেশের আবেদন ইআরডি-র মাধ্যমে প্রক্রিয়াধীন রয়েছে বলে তিনি নিশ্চিত করেন।
মধ্যপ্রাচ্যের এই ভূ-রাজনৈতিক ঝড়ে প্রবাসী বাংলাদেশিদের জীবন যেমন সংকটাপন্ন, তেমনি দেশের অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা ও অর্থনীতিও এক সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে। আগের দিন এক সংবাদে বাংলাদেশ সংবাদ সংস্থা (বাসস) জানিয়েছে, সার্বিক পরিস্থিতির দিকে নজর রাখছেন খোদ প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান।













