দেশে জ্বালানি তেলের পর্যাপ্ত মজুত থাকা সত্ত্বেও একটি অসাধু চক্র পরিকল্পিতভাবে সংকট সৃষ্টির পাঁয়তারা করছে বলে জানিয়েছেন খোদ প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। তিনি স্পষ্ট হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেছেন, দেশে অবৈধভাবে তেল মজুত করা হচ্ছে, এমনকি তেল পাচারের মতো ঘটনাও ঘটছে।
শনিবার (২৮ মার্চ) বিকেলে জাতীয় সংসদ ভবনে অনুষ্ঠিত সরকারি দলের সংসদীয় কমিটির বৈঠকে তিনি এ কথা বলেন। বৈঠক শেষে সাংবাদিকদের ব্রিফিংকালে প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনা ও সভার বিস্তারিত তথ্য তুলে ধরেন জাতীয় সংসদের চিফ হুইপ মো. নূরুল ইসলাম মণি।
প্রধানমন্ত্রী তাঁর বক্তব্যে জানান, দেশে তেলের কোনো সংকট নেই, কিন্তু একটি গোষ্ঠী অপতথ্য দিয়ে জনগণকে বিভ্রান্ত করার চেষ্টা করছে। এ বিষয়ে প্রশাসনকে কঠোর পদক্ষেপ গ্রহণের নির্দেশ দেওয়ার পাশাপাশি তিনি সংসদ সদস্যদের সতর্ক থাকার এবং স্থানীয় প্রশাসনের সঙ্গে সমন্বয় করে কাজ করার আহ্বান জানান।
চিফ হুইপ মো. নূরুল ইসলাম মণি জানান, প্রধানমন্ত্রী সংসদ সদস্যদের নির্দেশ দিয়েছেন যাতে তাঁরা নিজ নিজ এলাকায় নজরদারি বাড়ান, যাতে কেউ অপ্রয়োজনে অতিরিক্ত তেল মজুত করতে না পারে এবং তেলের দাম কোথাও না বাড়ে। তিনি আরও জানান, দেশে বর্তমানে জ্বালানি তেলের কোনো ঘাটতি নেই; ইতিমধ্যে দুই লাখ মেট্রিক টনের জাহাজ বন্দরে ভিড়েছে এবং আরও দুই লাখ মেট্রিক টন আসার পথে রয়েছে।
মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ পরিস্থিতির কারণে বিশ্ববাজারে তেলের দাম বাড়লেও বাজার নিয়ন্ত্রণে সরকার প্রতি মাসে প্রায় ২০০ কোটি টাকা ভর্তুকি দিচ্ছে বলে জানান চিফ হুইপ। তিনি উল্লেখ করেন, পাশের দেশের তুলনায় বাংলাদেশে তেলের দাম কম হওয়ায় চোরাচালানের ঝুঁকি বাড়ছে। এসব বন্ধে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীকে ‘চিরুনি অভিযান’ পরিচালনা ও কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশ দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী। এ বিষয়ে আগামীকাল রবিবার (২৯ মার্চ) সংসদে জ্বালানিমন্ত্রী ৩০০ বিধিতে বিস্তারিত ব্যাখ্যা তুলে ধরবেন বলেও তিনি নিশ্চিত করেন।
জ্বালানি তেল মজুত প্রতিরোধ, বিপণনে শৃঙ্খলা রক্ষা ও নিরবচ্ছিন্ন সরবরাহ নিশ্চিত করতে দেশের বিভিন্ন জেলার ডিপোগুলোতে বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি) মোতায়েন করা হয়েছে। বিজিবি সদর দপ্তরের এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে শনিবার জানানো হয়, বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেলের দাম বৃদ্ধির সুযোগ নিয়ে দেশে অননুমোদিত মজুতের অপচেষ্টা রোধে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের নির্দেশে এ পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে।
বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, গত ২৫ মার্চ থেকে ঢাকা, কুড়িগ্রাম, রংপুর, রাজশাহী, সিলেট, মৌলভীবাজার, কুমিল্লা, ব্রাহ্মণবাড়িয়া ও সুনামগঞ্জের মোট ১৯টি ডিপোতে বিজিবি মোতায়েন করা হয়েছে। বিজিবি সদস্যরা নিয়মিত তদারকির পাশাপাশি সীমান্ত এলাকায় তেল পাচার রোধে অতিরিক্ত টহল ও তল্লাশি কার্যক্রম পরিচালনা করছেন।
জ্বালানি ব্যবস্থাপনা কার্যক্রম তদারকির জন্য দেশের প্রতিটি পেট্রল পাম্পে ‘ট্যাগ অফিসার’ নিয়োগের সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার। গত শুক্রবার (২৭ মার্চ) জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগের সচিব মোহাম্মদ সাইফুল ইসলামের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত এক অনলাইন সভায় এ সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়। সভার সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, ঢাকা ও চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন এলাকায় বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন (বিপিসি) এবং অন্যান্য জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে সংশ্লিষ্ট জেলা প্রশাসক ও উপজেলা নির্বাহী অফিসাররা এই ট্যাগ অফিসার নিয়োগ করবেন। এই কর্মকর্তারা প্রতিদিনের বিপণন প্রতিবেদন জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগে জমা দেবেন।
জ্বালানি সরবরাহ স্বাভাবিক রাখতে বিপিসি ডিপো থেকে তেল বিপণনের সময়সূচিতেও পরিবর্তন এনেছে। গত শুক্রবার বিপিসির সচিব শাহিনা সুলতানা স্বাক্ষরিত বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়, এখন থেকে প্রতিদিন সকাল ৭টা থেকে বিকেল ৩টা পর্যন্ত ডিপো থেকে জ্বালানি পণ্য সরবরাহ করা হবে। এছাড়া বিপিসির এক কর্মকর্তা জানান, ফিলিং স্টেশনগুলোর দৃশ্যমান স্থানে একটি বোর্ডে প্রতিদিনের জ্বালানি তেল প্রাপ্তি ও মজুতের তথ্য প্রদর্শনের জন্য অভ্যন্তরীণ নির্দেশনা জারি করা হয়েছে।
অভ্যন্তরীণ সরবরাহের পাশাপাশি ভারত থেকে পাইপলাইনের মাধ্যমেও জ্বালানি আমদানি অব্যাহত রয়েছে। দিনাজপুরের পার্বতীপুরের রেলহেড ডিপোর সহকারী ইনচার্জ মো. জীবন জানান, ভারতের আসাম থেকে পাইপলাইনের মাধ্যমে পাঁচ হাজার টন ডিজেল বৃহস্পতিবার দিবাগত রাতে বাংলাদেশে পৌঁছেছে, যা শুক্রবার সকাল থেকে বিভিন্ন ডিপোতে লোড করা হয়েছে। আগামী চার মাসের মধ্যে এই পাইপলাইনের মাধ্যমে অতিরিক্ত আরও ৫০ হাজার টন ডিজেল আমদানির প্রস্তাব দিয়েছে বিপিসি।
সার্বিক পরিস্থিতিতে জনসাধারণকে আশ্বস্ত করে শনিবার তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয়ের জনসংযোগ কর্মকর্তা ইমরানুল হাসান স্বাক্ষরিত এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, দেশে জ্বালানি তেলের মজুত ও সরবরাহ সম্পূর্ণ স্বাভাবিক রয়েছে। বিজ্ঞপ্তিতে আতঙ্কিত হয়ে অতিরিক্ত তেল ক্রয় না করার আহ্বান জানানোর পাশাপাশি সতর্ক করে বলা হয়, দাহ্য পদার্থ মজুত করা অত্যন্ত বিপজ্জনক। অবৈধ মজুত রোধে দেশের প্রতিটি জেলায় নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটের নেতৃত্বে ভ্রাম্যমাণ আদালত (মোবাইল কোর্ট) সক্রিয় রয়েছে এবং সরকার এখন পর্যন্ত জ্বালানি তেলের মূল্য বৃদ্ধি করেনি।













