ঢাকার নদী রক্ষায় বিশ্বব্যাংকের ৩৭ কোটি ডলারের ঋণ

বুড়িগঙ্গা নদী
বুড়িগঙ্গা নদী

ঢাকা ও এর আশপাশের এলাকার পানির দূষণ রোধ এবং নদী-খাল পুনরুজ্জীবিত করতে ৩৭ কোটি ডলারের ঋণ সহায়তা অনুমোদন করেছে বিশ্বব্যাংক।

মঙ্গলবার (১০ ফেব্রুয়ারি) সংস্থাটির ওয়াশিংটনের সদর দপ্তরে নির্বাহী পরিচালক পর্ষদ এই তহবিল অনুমোদন দেয়। এক প্রেস বিজ্ঞপ্তিতে সংস্থাটি এ তথ্য জানিয়েছে।

‘মেট্রো ঢাকা ওয়াটার সিকিউরিটি অ্যান্ড রেজিলিয়েন্স’ প্রোগ্রামের আওতায় এই অর্থ ব্যয় করা হবে। এটি বৃহত্তর ঢাকার পানি দূষণ কমাতে স্থানীয় ও জাতীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর সক্ষমতা শক্তিশালী করবে। প্রকল্পটির মূল লক্ষ্য হলো ঢাকা ও পার্শ্ববর্তী এলাকার স্যানিটেশন ও কঠিন বর্জ্য ব্যবস্থাপনা সেবার মান উন্নত করা।

উল্লেখ্য যে, বৃহত্তর ঢাকা থেকেই দেশের আনুষ্ঠানিক কর্মসংস্থানের প্রায় অর্ধেক এবং জিডিপির এক-তৃতীয়াংশ উৎপাদিত হয়। এই প্রোগ্রামটি একটি ফলাফলভিত্তিক ব্যবস্থা প্রবর্তন করবে, যা সিটি কর্পোরেশন এবং পানি সরবরাহ ও পয়ঃনিষ্কাশন কর্তৃপক্ষকে (ওয়াসা) মাঠ পর্যায়ে পরিমাপযোগ্য উন্নতি নিশ্চিত করতে সহায়তা করবে।

প্রকল্পটির মাধ্যমে সাড়ে ৫ লাখ মানুষকে নিরাপদ স্যানিটেশন সেবা এবং ৫ লাখ মানুষকে উন্নত কঠিন বর্জ্য ব্যবস্থাপনা সেবা প্রদান করবে। এতে দূষণ ও সেবা বঞ্চিত জনগোষ্ঠীকে অগ্রাধিকার দেওয়া হবে। পাশাপাশি সিটি কর্পোরেশনগুলোর সক্ষমতা বৃদ্ধিতে একটি ‘ফলাফল-ভিত্তিক’ সিস্টেম চালু করা হবে।

বাংলাদেশ ও ভুটানের জন্য বিশ্বব্যাংকের ডিভিশন ডিরেক্টর জাঁ পেস্মে বলেন, “জলাশয়গুলো বৃহত্তর ঢাকার লাখ লাখ মানুষের জীবনরেখা। কিন্তু অপরিকল্পিত নগরায়ন ও শিল্পায়নের ফলে সৃষ্ট বর্জ্য ব্যবস্থাপনার ক্ষমতা শহরটির নেই।

“ফলে জনস্বাস্থ্য, পরিবেশ ও অর্থনীতিতে নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে। এই প্রোগ্রামটি সময়ের সাথে সাথে দূষণ কমাতে এবং ঢাকার নদী ও খালের স্বাস্থ্য পুনরুদ্ধারের জন্য প্রয়োজনীয় প্রাতিষ্ঠানিক ভিত্তি তৈরিতে সহায়তা করবে।”

রিপোর্টে উল্লেখ করা হয়েছে, ঢাকার মাত্র ২০ শতাংশ বাসিন্দা পাইপলাইনের নর্দমা ব্যবস্থার সাথে যুক্ত। বাকি ৮০ শতাংশেরও বেশি অপরিশোধিত বর্জ্য সরাসরি জলাশয়ে গিয়ে পড়ছে। এছাড়া ঢাকার অর্ধেকেরও বেশি খাল ইতোমধ্যে হারিয়ে বা বর্জ্যে ভরাট হয়ে গেছে। ফলাফল ভয়াবহ দূষণ।

এসব চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় এই কার্যক্রম সরকারি ও বেসরকারি খাতের পাশাপাশি সিটি কর্পোরেশনগুলোকে অন্তর্ভুক্ত করে একটি সমন্বিত পদ্ধতি গ্রহণ করেছে। এটি সেবার মান উন্নত করতে, নিয়ন্ত্রক কাঠামো শক্তিশালী করতে এবং দূষণ কমিয়ে ও পানির প্রবাহ ক্ষমতা পুনরুদ্ধার করে ঢাকার চারপাশের নদী ও খালগুলোকে পুনরুজ্জীবিত করতে সহায়তা করবে।

শিল্প দূষণও এখানে অত্যন্ত প্রকট। ঢাকায় অবস্থিত প্রায় ৭ হাজার কলকারখানা থেকে প্রতিদিন প্রায় ২৪০ কোটি লিটার অপরিশোধিত বর্জ্য পানিতে মিশছে। এর মধ্যে ৮০ শতাংশই পোশাক খাতের কারখানা। এই দূষণের ফলে চর্মরোগ, ডায়রিয়া এবং স্নায়বিক সমস্যার মতো স্বাস্থ্যঝুঁকি বাড়ছে।

প্রোগ্রামটি বেসরকারি খাতের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করবে। বিশেষ করে ঢাকার শিল্প প্রতিষ্ঠানগুলোকে তাদের দক্ষতা ও পুঁজি বিনিয়োগের মাধ্যমে শিল্প বর্জ্য শোধনাগার সম্প্রসারণ এবং পানির সাশ্রয়ী ব্যবহার ও দূষণ কমাতে উৎসাহিত করবে।

বিশ্বব্যাংকের সিনিয়র ওয়াটার সাপ্লাই অ্যান্ড স্যানিটেশন স্পেশালিস্ট এবং প্রকল্পের টাস্ক টিম লিডার হর্ষ গোয়েল বলেন, “এই প্রোগ্রামটি বাংলাদেশের ব্যাপক পানি নিরাপত্তা ও স্থিতিস্থাপকতা এজেন্ডাকে সমর্থনকারী একটি বহুধাপ বিশিষ্ট ও দীর্ঘমেয়াদী সম্পৃক্ততার অংশ।

“ঢাকার জলাশয়গুলোতে দূষণ নির্গমন কমানো, প্রাতিষ্ঠানিক ও নিয়ন্ত্রক তদারকি ব্যবস্থা শক্তিশালী করা (যার মধ্যে ঢাকার নদীগুলোর পানির গুণমান সূচক অন্তর্ভুক্ত), ডিজিটাল রিয়েল-টাইম দূষণ পর্যবেক্ষণ ব্যবস্থা স্থাপন এবং ঢাকার প্রধান চারটি নদীর জন্য সমন্বিত নদী পুনরুদ্ধার পরিকল্পনা তৈরিকে অগ্রাধিকার দেওয়া হবে।”

প্রথম পর্যায়ে এই প্রোগ্রামটির আওতা হবে ঢাকা ও নারায়ণগঞ্জের নির্বাচিত এলাকাগুলো। এটি প্রাথমিক বর্জ্য সংগ্রহের পরিধি বাড়াতে সহায়তা করবে। বিশেষ করে বড় খাল ও নদীর নিকটবর্তী সুবিধাবঞ্চিত সম্প্রদায়গুলোকে অগ্রাধিকার দেবে এবং রিসাইক্লিং ব্যবস্থা উন্নত করবে।

এছাড়া বর্জ্য ফেলা বন্ধ করা, ড্রেনেজ নেটওয়ার্কে সরাসরি পয়ঃবর্জ্য নির্গমন এবং নদীতে শিল্প বর্জ্য নির্গমন বন্ধে এটি কমিউনিটি ভিত্তিক সচেতনতামূলক প্রচারণা এবং দূষণ নিয়ন্ত্রণ আইন প্রয়োগের কাজ করবে।

স্বাধীনতার পর থেকে বিশ্বব্যাংক বাংলাদেশকে অনুদান, সুদমুক্ত এবং সহজ শর্তের ঋণ হিসেবে ৪৬ বিলিয়ন ডলারেরও বেশি দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। বর্তমানে ৪৩টি প্রকল্পে ১২ বিলিয়ন ডলারেরও বেশি অর্থায়ন চলমান রয়েছে।

Share this article

আপনারা চাইলে কাস্টম বিজ্ঞাপন এইখানে দিতে পারেন
বিজ্ঞাপনের ছবি বা ভিডিও সাইজ ৩৩৬x২৮০ পিক্সাল হতে হবে

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Scroll to Top