বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যকার দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কে এক অভূতপূর্ব বৈপরীত্য লক্ষ করা যাচ্ছে। একদিকে দুই দেশের অর্থনৈতিক সংহতি ও জ্বালানি করিডোর শক্তিশালী করার আনুষ্ঠানিক প্রতিশ্রুতি দেওয়া হচ্ছে, অন্যদিকে নিরাপত্তা উদ্বেগের দোহাই দিয়ে ভারতীয় কর্মকর্তাদের আকস্মিক প্রস্থান ও কূটনীতিকদের সরিয়ে নেওয়ার ঘটনা দিল্লির সাথে ঢাকার বর্তমান অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের ক্রমবর্ধমান দূরত্বের বহিঃপ্রকাশ ঘটাচ্ছে।
বাংলাদেশ সংবাদ সংস্থা (বাসস) জানিয়েছে, ঢাকায় শনিবার (২৪ জানুয়ারি) ভারতের প্রজাতন্ত্র দিবস উপলক্ষে আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে ভারতীয় হাইকমিশনার প্রণয় ভার্মা দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের অর্থনৈতিক গুরুত্বের ওপর জোর দেন। তিনি বলেন, “দ্রুত বর্ধনশীল অর্থনীতির দেশ হিসেবে ভারত ও বাংলাদেশ একে অপরের টেকসই উন্নয়নের পরিপূরক।”
প্রণয় ভার্মা আঞ্চলিক কানেক্টিভিটির উদাহরণ হিসেবে ভারত-বাংলাদেশ ডিজেল পাইপলাইন এবং ভারতীয় গ্রিড ব্যবহার করে নেপাল থেকে বিদ্যুৎ আমদানির বিষয়টি সামনে আনেন। আঞ্চলিক সংযোগ ও অর্থনৈতিক সম্পৃক্ততার প্রসারকে গুরুত্ব দিয়ে ভার্মা বলেন, “ভারতের একটি রিফাইনারি থেকে বাংলাদেশে উচ্চগতির ডিজেল সরবরাহকারী সীমান্ত পাইপলাইন এবং ভারতীয় গ্রিডের মাধ্যমে ভারত ও নেপাল থেকে বাংলাদেশে বিদ্যুৎ সরবরাহকারী সীমান্ত বিদ্যুৎ সংযোগ লাইন আঞ্চলিক জ্বালানি সংযোগ ও সংহতির ভিত্তি হিসেবে কাজ করছে।”
হাইকমিশনারের মতে, দুই দেশের সাপ্লাই চেইন বাংলাদেশের তৈরি পোশাক ও ওষুধ শিল্পকে শক্তিশালী করছে, যা পারস্পরিক আন্তঃনির্ভরতার সুফল। তিনি বলেন, “আমাদের সাপ্লাই চেইন বাংলাদেশের তৈরি পোশাক (আরএমজি) ও ওষুধ শিল্পকে শক্তিশালী করছে, যা পারস্পরিক সহযোগিতা ও আন্তঃনির্ভরতার সুফল প্রমাণ করছে। এ ধরনের অংশীদারিত্ব দুই দেশের জনগণ ও ব্যবসার জন্য বাস্তব সুফল বয়ে এনেছে।”
ভার্মা একটি ‘ভবিষ্যমুখী’ অংশীদারিত্বের আশাবাদ ব্যক্ত করেন যা উদ্ভাবন ও প্রযুক্তিনির্ভর হবে। তিনি বলেন, “ভারত ও বাংলাদেশ একসঙ্গে ‘আঞ্চলিক ভ্যালু চেইন, যৌথ ডিজিটাল ইকোসিস্টেম ও জ্বালানি করিডোর’ গড়ে তুলতে পারে, একটি ‘পরিবেশবান্ধব, সাশ্রয়ী ও নিরাপদ’ জ্বালানি ভবিষ্যৎ নিশ্চিত করতে এবং পরিবেশগত স্থায়িত্ব ও জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলায় যৌথভাবে কাজ করতে পারে।”
তবে এই ইতিবাচক বক্তব্যের আড়ালে মাঠপর্যায়ে ভারতের সাম্প্রতিক কৌশলগত অবস্থান ভিন্ন এক বার্তা দিচ্ছে। হাইকমিশনারের আশ্বস্তবাণীর দিনেই বাগেরহাটের রামপাল তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্র (বিআইএফপিসিএল) থেকে নয়জন উচ্চপদস্থ ভারতীয় কর্মকর্তার নিঃশব্দে দেশত্যাগের ঘটনা চাঞ্চল্য সৃষ্টি করেছে।
ন্যাশনাল থার্মাল পাওয়ার কর্পোরেশন (এনটিপিসি) থেকে প্রেষণে আসা এসব কর্মকর্তা কোনো পূর্বানুমতি বা কর্তৃপক্ষকে অবহিত না করেই শনিবার সকালে ভোমরা স্থলবন্দর দিয়ে ভারতে চলে যান। প্রকল্প পরিচালক রামানাথ পুজারী নিশ্চিত করেছেন যে, সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা নিরাপত্তাহীনতার অজুহাত দেখিয়ে দেশ ছেড়েছেন।
বিদ্যুৎ কেন্দ্রটিতে সেনাবাহিনী, পুলিশ ও আনসারসহ চার স্তরের কঠোর নিরাপত্তা ব্যবস্থা থাকা সত্ত্বেও এই কর্মকর্তাদের হুট করে চলে যাওয়াকে রহস্যজনক ও উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বলে মনে করছে প্ল্যান্ট কর্তৃপক্ষ। এর আগে কখনোই তাঁরা নিরাপত্তার বিষয়ে কোনো অভিযোগ বা উদ্বেগ প্রকাশ করেননি।
এই ঘটনাটি এমন এক সময়ে ঘটল যখন ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় বাংলাদেশে নিযুক্ত তাদের কূটনীতিক ও কর্মকর্তাদের পরিবারের সদস্যদের সরিয়ে নেওয়ার নির্দেশ দিয়েছে এবং বাংলাদেশের মিশনগুলোকে ‘নন-ফ্যামিলি’ পোস্টিং হিসেবে ঘোষণা করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে।
কূটনৈতিক শীতলতা ও দ্বিমুখী অবস্থান
গত ৫ আগস্টের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর বাংলাদেশের অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সাথে নরেন্দ্র মোদি সরকারের যে কূটনৈতিক শীতলতা তৈরি হয়েছে, ভারতীয় কর্মকর্তাদের এই প্রস্থান তারই ধারাবাহিকতা। ভারত সরকারের পক্ষ থেকে নিরাপত্তা পরিস্থিতিকে কারণ হিসেবে দেখানো হলেও, বাংলাদেশি পর্যবেক্ষকদের মতে এটি দিল্লির একটি সতর্কতামূলক কৌশলগত অবস্থান।
দীর্ঘদিন ধরে বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্কের দিকে নজর রাখা বাংলাদেশি সাংবাদিক ও ঢাকা স্ট্রিট জার্নালের পরামর্শক সম্পাদক শরীফ খিয়াম আহমেদ মনে করেন, “বাংলাদেশে জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পূর্ববর্তী এই সময়ে ভারতের এই পদক্ষেপকে দ্বিমুখী কূটনীতি হিসেবে দেখা যেতে পারে। একদিকে অর্থনৈতিক ও বাণিজ্যিক স্বার্থ রক্ষায় সহযোগিতার পথ খোলা রাখা, অন্যদিকে নিরাপত্তা ও রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতার অজুহাতে দূরত্ব রাখা।”
“বিশেষ করে বাংলাদেশে ভারতের পাঁচটি মিশন থেকে কর্মকর্তাদের পরিবারের সদস্যদের সরিয়ে নেওয়ার সিদ্ধান্ত দুই দেশের আস্থার সংকটের গভীরতাকে আরও স্পষ্ট করে তুলছে। যার পরপরই রামপাল তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্রের কর্মকর্তাদের প্রস্থান খুবই অর্থবহ ঘটনা,” ডিএসজে প্রতিবেদককে বলেন তিনি।
তবে বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ উপদেষ্টা মুহাম্মদ ফাওজুল কবির খানের সামনেই শনিবার ভারতীয় হাইকমিশনার প্রণয় ভার্মা ঢাকা ও দিল্লির অংশীদারিত্ব ‘বিশ্বাসের ভিত্তিতে গড়ে উঠেছে, উদ্ভাবন ও প্রযুক্তি দ্বারা চালিত এবং পারস্পরিক স্বার্থ, পারস্পরিক সুবিধা ও পারস্পরিক সংবেদনশীলতায় ও সহায়তায় টিকে আছে’ বলে মন্তব্য করেন।
দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের ওপর আলোকপাত করতে গিয়ে ভার্মা বলেন, “বাংলাদেশ ও ভারত একটি বিশেষ সম্পর্ক ভাগ করে নেয়, যা ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের সময় যৌথ আত্মত্যাগের অবিচ্ছেদ্য ইতিহাসের সঙ্গে যুক্ত।” তিনি আরও বলেন, “সাংস্কৃতিক বন্ধন গভীরভাবে প্রোথিত। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ও কাজী নজরুল ইসলাম, যাঁদের সাহিত্য আমাদের সংস্কৃতি ও সাহিত্যকে যুক্ত করেছে, পাশাপাশি সংগীত, শিল্পকলা, নৃত্য, নাটক ও চলচ্চিত্রের যৌথ ঐতিহ্যও রয়েছে।”
ভারত ‘একটি গণতান্ত্রিক, স্থিতিশীল, শান্তিপূর্ণ, প্রগতিশীল ও অন্তর্ভুক্তিমূলক বাংলাদেশকে সমর্থন অব্যাহত রাখবে’ উল্লেখ করে হাইকমিশনার বলেন, “আমরা বাংলাদেশের সঙ্গে আমাদের দীর্ঘস্থায়ী অংশীদারিত্বের গুরুত্ব পুনর্ব্যক্ত করছি এবং বাংলাদেশের জনগণের শান্তি, সমৃদ্ধি ও সফলতা কামনা করছি।”













