ডিসেম্বরে বাংলাদেশের সাধারণ মূল্যস্ফীতি বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৮.৪৯ শতাংশ, যা নভেম্বরে ছিল ৮.২৯ শতাংশ। দৈনন্দিন ভোগ্যপণ্য ও অন্যান্য পণ্যের উভয় খাতে দাম বৃদ্ধির কারণে এই চাপ তৈরি হয়েছে। একই সময়ে বিশ্বব্যাপী খাদ্যপণ্যের দাম কমলেও বাংলাদেশে এর সুফল পাওয়া যায়নি, মূলত ডলারের বিনিময় হার স্থির রাখার কারণে।
বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) সর্বশেষ ভোক্তা মূল্য সূচকের (সিপিআই) সারসংক্ষেপে জানানো হয়েছে, ডিসেম্বর ২০২৫-এ নিত্য ভোগ্যপণ্যে মূল্যস্ফীতি বেড়ে হয়েছে ৭.৭১ শতাংশ এবং অন্যান্য পণ্যে ৯.১৩ শতাংশ। এক বছরের গড় মূল্যস্ফীতি এখনও ১০.৩৪ শতাংশের কাছাকাছি, যা সরকারের লক্ষ্য ৭ শতাংশের অনেক ওপরে। অথচ জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থা (এফএও) জানিয়েছে, নভেম্বরে বিশ্ব খাদ্য মূল্যসূচক টানা তৃতীয় মাসের মতো কমে ১২৫.১ পয়েন্টে দাঁড়িয়েছে, যা অক্টোবরের তুলনায় ১.২ শতাংশ এবং আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় ২.১ শতাংশ কম।
এর পেছনে প্রধান ভূমিকা রেখেছে পাম অয়েল, সূর্যমুখী তেল ও সরিষা তেলের দাম হ্রাস, পাশাপাশি ব্রাজিল, ভারত ও থাইল্যান্ডে চিনির উৎপাদন বৃদ্ধি। কিন্তু বাংলাদেশে আমদানি করা পণ্যের দাম কমেনি। কারণ, রপ্তানি ও প্রবাসী আয়ের প্রবৃদ্ধি ধরে রাখতে বাংলাদেশ ব্যাংক ডলারের দাম কমতে দেয়নি এবং চলতি অর্থবছরের প্রথমার্ধে বাজার থেকে তিন বিলিয়নেরও বেশি ডলার কিনেছে। এর ফলে আন্তর্জাতিক বাজারে দাম কমলেও স্থানীয় বাজারে চাপ থেকে গেছে।
বাংলাদেশ ব্যাংক সর্বশেষ মুদ্রানীতিতে নীতি সুদহার ১০ শতাংশে অপরিবর্তিত রেখেছে, যাতে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে থাকে। তবে উচ্চ সুদহার ব্যবসা ব্যয়বহুল করে বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থান স্থবির করেছে। ব্যাংকখাতে দীর্ঘদিনের খেলাপি ঋণ, প্রভাবশালী ঋণগ্রহীতাদের প্রতি নমনীয়তা এবং দুর্বল তদারকির কারণে মুদ্রানীতির কাঙ্ক্ষিত প্রভাব বাজারে প্রতিফলিত হয়নি।
অন্যদিকে, সরকার মূল্যস্ফীতি মোকাবিলায় আমদানি শুল্ক ছাড়, খোলা বাজারে পণ্য বিক্রি (ওএমএস) এবং বাজার মনিটরিং জোরদারের ঘোষণা দিয়েছে। কিন্তু মাঠপর্যায়ে দুর্নীতি ও মধ্যস্বত্বভোগীদের প্রভাবে এসব উদ্যোগ কার্যকর হয়নি। রাজস্বনীতি ও মুদ্রানীতির মধ্যে সমন্বয়ের অভাবও পরিস্থিতিকে জটিল করেছে। বড় উন্নয়ন ব্যয় ও ভর্তুকি অব্যাহত থাকায় চাহিদা কমেনি, বরং মূল্যস্ফীতির চাপ দীর্ঘস্থায়ী হয়েছে।
বাংলাদেশ ব্যাংক বলছে, মুদ্রানীতির প্রভাব সময়সাপেক্ষ এবং আগামী মাসগুলোতে এর সুফল দৃশ্যমান হবে। তবে বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, ব্যাংকখাতে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনা, প্রভাবশালী ঋণগ্রহীতাদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা এবং বাজার ব্যবস্থাপনায় সংস্কার ছাড়া মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ সম্ভব নয়। নীতিঘোষণা ও বাস্তব প্রয়োগের ফারাক কমানোই এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।
বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর আহসান এইচ মনসুর সম্প্রতি এক অনুষ্ঠানে বলেন, চলতি অর্থবছরের (২০২৫-২৬) শেষ নাগাদ মূল্যস্ফীতি ৫ শতাংশে নেমে আসতে পারে বলে তিনি আশা করছেন। অন্তর্বর্তী সরকার আগামী জুনের মধ্যে মূল্যস্ফীতি ৭ শতাংশের নিচে নামার প্রত্যাশা করেছিল।













