দেশের বৈদেশিক মুদ্রা বাজার বর্তমানে স্থিতিশীল ও ভারসাম্যপূর্ণ অবস্থায় রয়েছে বলে দাবি করেছে বাংলাদেশ ব্যাংক। বুধবার এক বিবৃতিতে কেন্দ্রীয় ব্যাংক জানিয়েছে, টাকার বিনিময় হারের ওপর এই মুহূর্তে অবমূল্যায়নের কোনো তাৎক্ষণিক চাপ নেই। বৈদেশিক মুদ্রার সরবরাহ ও চাহিদার মধ্যে ভারসাম্য বজায় থাকায় বাজারে আস্থা ও শৃঙ্খলা অব্যাহত রয়েছে। তবে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের এই আশ্বাসের বিপরীতে বাজারে ভিন্ন এক চিত্র লক্ষ করা যাচ্ছে। মধ্যপ্রাচ্যে ইরান-ইসরায়েল যুদ্ধের উত্তেজনার জেরে গত পাঁচ সপ্তাহে ডলারের বিপরীতে টাকার মান কিছুটা কমেছে এবং ব্যাংকগুলোর মধ্যে ডলার মজুদ করার একটি সতর্কতামূলক প্রবণতা তৈরি হয়েছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ব্যাংকিং খাতে বর্তমানে বৈদেশিক মুদ্রার তারল্য উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। গত ৬ এপ্রিল পর্যন্ত ব্যাংকগুলোর কাছে প্রায় ৩.৯ বিলিয়ন মার্কিন ডলার সমপরিমাণ তারল্য ছিল, যা ফেব্রুয়ারি শেষে ছিল মাত্র ২.৩ বিলিয়ন ডলার। অর্থাৎ মাত্র এক মাসের ব্যবধানে ব্যাংকগুলোর হাতে ১.৬ বিলিয়ন ডলার বাড়তি তারল্য যোগ হয়েছে। একই সময়ে ব্যাংকগুলোর নগদ বৈদেশিক মুদ্রার স্থিতি বেড়ে ৪৯ মিলিয়ন ডলারে দাঁড়িয়েছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের দাবি, এই বাড়তি তারল্য আমদানি ব্যয় ও অন্যান্য বৈদেশিক লেনদেন নির্বিঘ্নে সম্পাদনে বড় ধরনের সুরক্ষা হিসেবে কাজ করছে।
তবে মুদ্রাবাজারের বাস্তব চিত্র বলছে, গত ১ মার্চের তুলনায় বর্তমানে ডলারের দাম কিছুটা ঊর্ধ্বমুখী। গত ১ মার্চে আন্তঃব্যাংক লেনদেনে ডলারের বিনিময় হার ছিল ১২২ টাকা ৩০ পয়সা, যা গত মঙ্গলবার সর্বোচ্চ ১২২ টাকা ৮৫ পয়সায় পৌঁছেছে। অর্থাৎ পাঁচ সপ্তাহের ব্যবধানে প্রতি ডলারে খরচ বেড়েছে ৫৫ পয়সা এবং টাকা মান হারিয়েছে প্রায় শূন্য দশমিক ৪৪ শতাংশ। টাকার এই সামান্য অবমূল্যায়ন এবং মধ্যপ্রাচ্য যুদ্ধের আশঙ্কায় আমদানিকারক ও ব্যবসায়ীদের মধ্যে এক ধরনের উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। ইতিমধ্যে ব্যবসায়ীদের শীর্ষ সংগঠন এফবিসিসিআই গভর্নরের কাছে অভিযোগ করেছে যে, সংকটের অজুহাতে কিছু ব্যাংক ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে ডলারের বাড়তি দর আদায় করছে।
বর্তমানে বিপিএম৬ পদ্ধতিতে দেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের স্থিতি ২৯.৮৫ বিলিয়ন ডলার এবং গ্রস বা মোট রিজার্ভ দাঁড়িয়েছে ৩৪.৪৭ বিলিয়ন ডলারে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সহকারী মুখপাত্র ও পরিচালক মোহাম্মদ শাহরিয়ার সিদ্দিকী জানিয়েছেন, রিজার্ভ ও বিনিময় হার বর্তমানে স্থিতিশীল। তিনি উল্লেখ করেন, সাধারণত ব্যাংকগুলোর নেট ওপেন পজিশন (এনওপি) ৬০০-৭০০ মিলিয়ন ডলার ছাড়ালেই কেন্দ্রীয় ব্যাংক বাজার থেকে ডলার ক্রয় করে থাকে। বর্তমানে এই পজিশন ১ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছালেও কেন্দ্রীয় ব্যাংক ডলার কিনছে না, যা বাজারে পর্যাপ্ত বৈদেশিক মুদ্রার উপস্থিতির প্রমাণ দেয়।
বাজার বিশ্লেষণে দেখা যায়, মার্চ মাসে রেকর্ড ৩.৭৭৫ বিলিয়ন ডলার রেমিট্যান্স বা প্রবাসী আয় দেশে এসেছে। এছাড়া এপ্রিলের প্রথম ছয় দিনেই ৬৬০ মিলিয়ন ডলার এসেছে, যা গত বছরের একই সময়ের তুলনায় ২০.৫ শতাংশ বেশি। এই শক্তিশালী প্রবাহ ডলারের সরবরাহ বাড়িয়ে বাজারকে স্থিতিশীল রাখতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। এমনকি গত মাসে ১.৩৭ বিলিয়ন ডলারের আকু বিল এবং ১৮০ মিলিয়ন ডলারের সরকারি বৈদেশিক ঋণ পরিশোধের পরও রিজার্ভের স্থিতিতে বড় কোনো পতন হয়নি।
এতসব ইতিবাচক সূচকের পরও ব্যাংকগুলোর মধ্যে ডলার ধরে রাখার একটি প্রবণতা লক্ষ করা যাচ্ছে। বিশেষ করে রাষ্ট্রায়ত্ত সোনালী ব্যাংকসহ কয়েকটি ব্যাংক তাদের বৈদেশিক মুদ্রার এনওপি বাড়িয়ে চলছে। ভবিষ্যতে জ্বালানি তেলের দাম বৃদ্ধি বা বড় ধরনের বৈশ্বিক সংকটের আশঙ্কায় ব্যাংকগুলো সতর্কতামূলক ব্যবস্থা হিসেবে ডলার ছাড়তে অনীহা দেখাচ্ছে। বিশ্বব্যাংকের ঢাকা কার্যালয়ের সাবেক প্রধান অর্থনীতিবিদ জাহিদ হোসেনের মতে, ভবিষ্যতে বিনিময় হার বাড়তে পারে এমন অনিশ্চয়তা থেকে ব্যাংকগুলো ডলার মজুদ করছে, যা বাজারে এক ধরনের কৃত্রিম চাপের ধারণা তৈরি করতে পারে।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তাদের মতে, একটি বিশেষ গোষ্ঠী মধ্যপ্রাচ্য যুদ্ধের পরিস্থিতিকে কাজে লাগিয়ে গুজব ছড়িয়ে মুনাফা লোটার চেষ্টা করছে। তবে বাংলাদেশ ব্যাংক স্পষ্ট জানিয়েছে, বিনিময় হার অস্থিতিশীল হওয়ার কোনো লক্ষণ দেখা দিলে প্রয়োজনে ২০ কোটি ডলার পর্যন্ত বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর কাছে বিক্রি করে বাজার নিয়ন্ত্রণে রাখা হবে। বর্তমান পরিস্থিতিতে ডলারের বিনিময় হার স্বাভাবিক বাজার ব্যবস্থার মাধ্যমেই নির্ধারিত হচ্ছে এবং অবমূল্যায়ন নিয়ে গণমাধ্যমে প্রচারিত নেতিবাচক ধারণাগুলো বাস্তবসম্মত নয় বলে মনে করে কেন্দ্রীয় ব্যাংক।
সব মিলিয়ে বাংলাদেশ ব্যাংক বৈদেশিক মুদ্রার লেনদেন নিবিড়ভাবে তদারকি করছে এবং কোনো অনিয়ম পাওয়া গেলে তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা নেওয়ার হুঁশিয়ারি দিয়েছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের দাবি, পর্যাপ্ত তারল্য এবং ইতিবাচক রেমিট্যান্স প্রবাহের কারণে টাকার ওপর বড় কোনো চাপের ঝুঁকি এই মুহূর্তে নেই। তবে বৈশ্বিক ভূ-রাজনীতি এবং ব্যাংকগুলোর অভ্যন্তরীণ মজুদ প্রবণতা ডলারের বাজারের ভবিষ্যৎ স্থিতিশীলতার ক্ষেত্রে একটি বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে রয়ে গেছে।













