দেশের অর্থনীতির মূল প্রবেশদ্বার চট্টগ্রাম বন্দরে জাহাজ চলাচল সম্পূর্ণ বন্ধ হয়ে যাওয়ায় এক মহাবিপর্যয়ের মুখোমুখি বাংলাদেশ। একদিকে ১০টি শীর্ষ ব্যবসায়ী সংগঠনের আর্তনাদ, অন্যদিকে বন্দরে বিদেশি অপারেটর নিয়োগের নেপথ্য সমীকরণ— সব মিলিয়ে এক অস্থির সময় পার করছে জাতীয় অর্থনীতি। আমদানি-রপ্তানি থমকে গেছে। রপ্তানি আদেশ হারানোর শঙ্কার পাশাপাশি ভাবমূর্তি সংকটেও পড়তে যাচ্ছে বাংলাদেশ।
রাজধানীর গুলশানে বৃহস্পতিবার (৫ ফেব্রুয়ারি) এক জরুরি বৈঠকে শীর্ষ ব্যবসায়িক নেতারা এই অচলাবস্থা নিরসনে সরকারের উচ্চপর্যায়ের হস্তক্ষেপ কামনা করেন। তবে এই সংকটের গভীরে রয়েছে দুবাই ভিত্তিক প্রতিষ্ঠান ‘ডিপি ওয়ার্ল্ড’-কে নিউমুরিং কনটেইনার টার্মিনাল (এনসিটি) ইজারা দেওয়ার বিতর্ক এবং এর সাথে জড়িত ভূ-রাজনৈতিক সমীকরণ।
এদিকে টানা ছয়দিনের অচলাবস্থার পর বৃহস্পতিবার নৌ উপদেষ্টা এম সাখাওয়াত হোসেনের সঙ্গে বৈঠকের পর দুই দিনের কর্মবিরতি স্থগিত করার ঘোষণা দিয়েছে আন্দোলনকারী শ্রমিক সংগঠনগুলো। এরমধ্যে দাবি আদায় না হলে ফের লাগাতার আন্দোলনের হুমকিও দিয়েছেন শ্রমিক নেতারা। অন্যদিকে ডিপি ওয়ার্ল্ডের সাথে সরকারের চুক্তি হয়তো ঠেকানো যাবে না বলে আশঙ্কা প্রকাশ করেন নৌ উপদেষ্টা।
বন্দর সচল করা নিয়ে এমন অনিশ্চিত পরিস্থিতির মধ্যে ১০ ব্যবসায়ী সংগঠন বৃহস্পতিবার বিকেলে নিজেদের মধ্যে বৈঠক করেছেন। বিটিএমএ কার্যালয়ে আয়োজিত বৈঠকে এমপ্লয়ার্স ফেডারেশন, বিসিআই, এমসিসিআই, ডিসিসিআই, বিজিএমইএ-সহ ১০টি সংগঠনের নেতারা এক যৌথ বিবৃতিতে বলেন, “চট্টগ্রাম বন্দরের ইতিহাসে এবারই প্রথম জাহাজ চলাচল পর্যন্ত পুরোপুরি বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। এটি একটি বিরল সংকট। বন্দর এক দিন বন্ধ থাকা মানেই অর্থনীতিতে কয়েক হাজার কোটি টাকার প্রত্যক্ষ ক্ষতি।”
ব্যবসায়ী নেতারা শঙ্কা প্রকাশ করেন যে, এনসিটি ইজারা নিয়ে সৃষ্ট জটিলতার কারণে তৈরি পোশাকসহ সকল খাতের আমদানি-রপ্তানি স্থবির হয়ে পড়েছে। সময়মতো কাঁচামাল না পাওয়ায় আন্তর্জাতিক ক্রেতাদের ডেডলাইন রক্ষা করা অসম্ভব হয়ে পড়ছে, যা আসন্ন রমজান ও ঈদের বাজারে দ্রব্যমূল্যের ভয়াবহ ঊর্ধ্বগতি ডেকে আনবে।
“আমরা আশঙ্কা করছি, বন্দরের অচলাবস্থা আর কয়েকদিন স্থায়ী হলে বড় ধরনের ক্রয়াদেশ বাতিল হতে পারে এবং বিদেশি ক্রেতারা বাংলাদেশ থেকে তাদের সোর্সিং সরিয়ে নেওয়ার মতো কঠোর সিদ্ধান্ত নিতে পারেন।”
অন্যদিকে, চট্টগ্রামে বন্দর ভবনে বৈঠকের পর সংগ্রাম পরিষদের সমন্বয়ক মো. হুমায়ুন কবীর জানান, নৌ উপদেষ্টার আশ্বাসে আগামী শনিবার পর্যন্ত কর্মবিরতি স্থগিত করা হয়েছে। তবে তিনি হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেন, “দাবি আদায় না হলে রবিবার থেকে ফের লাগাতার কর্মসূচি চলবে।”
সংগ্রাম পরিষদের আরেক সমন্বয়ক ইব্রাহীম খোকন সাংবাদিকদের জানান, এনসিটি কোনোভাবেই ডিপি ওয়ার্ল্ডকে দেওয়া যাবে না। এছাড়া আন্দোলনকারী কর্মচারীদের বিরুদ্ধে নেওয়া বদলি ও শাস্তিমূলক ব্যবস্থা বাতিল করার পাশাপাশি বন্দর চেয়ারম্যান এস এম মনিরুজ্জামানের অবিলম্বে পদত্যাগও দাবি করেন তিনি।
সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ বিষয় হলো ডিপি ওয়ার্ল্ডের সাথে চুক্তির বিষয়ে উপদেষ্টার মন্তব্য। আন্দোলনকারী শ্রমিক নেতাদের সঙ্গে বৈঠক শেষে সাংবাদিকদের নৌ উপদেষ্টা এম সাখাওয়াত হোসেন বলেন, চুক্তি বোধ হয় ঠেকানো যাবে না। তবে দেশের ক্ষতি করে কোনো চুক্তি হবে না। তিনি আরও জানান, ডিপি ওয়ার্ল্ডের সঙ্গে নেগোসিয়েশন এখনো চূড়ান্ত হয়নি। তিনি গণমাধ্যমকে বলেন, “রোজার আগে বন্দর বন্ধ রাখা অমানবিক। বাধা দিলে সরকার হার্ডলাইনে যেতে বাধ্য হবে।”
প্রসঙ্গত, মধ্যপ্রাচ্যের প্রভাবশালী লজিস্টিকস কোম্পানি ‘ডিপি ওয়ার্ল্ড’ চট্টগ্রাম বন্দরের কৌশলগত টার্মিনালগুলোর দায়িত্ব নিতে আগ্রহী। তবে ডিপি ওয়ার্ল্ডের সাথে সংযুক্ত আব্রাহাম অ্যাকর্ডস এবং ইউএই-ইসরায়েল বাণিজ্যিক সম্পর্কের যে সমীকরণ, তা নিয়ে বন্দরের শ্রমিক ইউনিয়নগুলোর মধ্যে গভীর উদ্বেগ রয়েছে।
ব্যবসায়ী নেতারা তাদের যৌথ বিবৃতিতে উল্লেখ করেন, এনসিটি ইজারা নিয়ে যে জটিলতা তৈরি হয়েছে, তা নিয়ে নতুন সরকার পুনরায় পর্যালোচনার সুযোগ রাখতে পারেন। কিন্তু তার জন্য বন্দর অচল রাখা কোনোভাবেই কাম্য নয়। এই অচলাবস্থা আন্তর্জাতিক রুটে চলাচলকারী জাহাজগুলোর শিডিউল ও বাংলাদেশের ভাবমূর্তি চরমভাবে ক্ষুণ্ন করছে।
শ্রমিকদের প্রতি আহ্বান জানিয়ে ব্যবসায়ী সংগঠনের নেতারা বলেন, জাহাজ চলাচল বন্ধ করে দেওয়া মানে নিজের ঘরকে নিজেই বিপদে ফেলা। দেশের অর্থনীতির প্রতি দায়বদ্ধতা থেকে এই অবস্থান থেকে সরে আসুন। একই সাথে তারা সরকারকে এনসিটি বিতর্ক নিয়ে আলোচনার টেবিলে বসার অনুরোধ জানান।
চট্টগ্রাম বন্দরের এই অচলাবস্থা নিছক শ্রমিক আন্দোলন নয়; এটি ডিপি ওয়ার্ল্ডের মাধ্যমে বাংলাদেশের লজিস্টিকস খাতে বিদেশি প্রবেশের যে বিশাল পরিকল্পনা, তারই একটি বড় ধাক্কা। সরকার যদি এনসিটি ইজারা এবং ডিপি ওয়ার্ল্ডের ভূমিকার বিষয়ে স্বচ্ছ কোনো সিদ্ধান্তে না পৌঁছাতে পারে, তবে রমজানের আগে দ্রব্যমূল্য এবং শিল্প উৎপাদন সামাল দেওয়া অসম্ভব হয়ে পড়বে।













