সম্প্রতি জারি হওয়া ‘ট্রাভেল এজেন্সি নিবন্ধন ও নিয়ন্ত্রণ অধ্যাদেশ–২০২৬’ নিয়ে এই খাতে তীব্র বিতর্ক সৃষ্টি হয়েছে। একদিকে, ব্যবসায়ীরা একে “কালো অধ্যাদেশ” আখ্যা দিয়ে বাতিলের দাবি তুলছেন, অন্যদিকে সরকার বলছে, এটি সিন্ডিকেট ভাঙা, টিকিটের দাম যৌক্তিকীকরণ এবং ভোক্তা সুরক্ষার জন্য অপরিহার্য।
নতুন অধ্যাদেশকে ঘিরে এখন একদিকে ব্যবসায়ীদের টিকে থাকার লড়াই, অন্যদিকে সরকারের সংস্কার ও সুশাসনের প্রয়াস; এই দ্বন্দ্বই হয়ে উঠেছে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু।
জাতীয় প্রেসক্লাবে রোববার (৪ জানুয়ারি) আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে ট্রাভেল এজেন্টদের সংগঠন অ্যাসোসিয়েশন অব ট্রাভেল এজেন্টস অব বাংলাদেশের (আটাব) সাবেক সভাপতি মনজুর মোর্শেদ মাহবুবসহ এই খাতের ব্যবসায়ী নেতারা অভিযোগ করেন, নতুন অধ্যাদেশ কার্যকর হলে দেশে প্রায় পাঁচ হাজার এজেন্সি বন্ধ হয়ে যেতে পারে।
তাদের মতে, অন্য এজেন্সি থেকে টিকিট ক্রয়-বিক্রয় নিষিদ্ধ করা হলে ক্ষুদ্র এজেন্সিগুলো কার্যত অচল হয়ে পড়বে। কারণ, ৫ হাজার ৮০০ নিবন্ধিত এজেন্সির মধ্যে মাত্র ৮০০টি ইন্টারন্যাশনাল এয়ার ট্রান্সপোর্ট অ্যাসোসিয়েশনের (আয়াটা) সদস্য, বাকিদের নিজস্বভাবে টিকিট ইস্যুর সক্ষমতা নেই। এছাড়া অফলাইন এজেন্সির জন্য ১০ লাখ টাকা ব্যাংক গ্যারান্টি এবং অনলাইন এজেন্সির জন্য ১ কোটি টাকার জামানত প্রদানের শর্ত ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের জন্য অযৌক্তিক।
তারা আরও বলেন, পৃথক অফিস ব্যবহারের বাধ্যবাধকতা অভিবাসী শ্রমিকদের ব্যয় বাড়াবে এবং শুনানি ছাড়াই লাইসেন্স স্থগিতের বিধান ব্যবসায়ীদের হয়রানির শিকার করবে। শাস্তি ও জরিমানা বৃদ্ধির বিষয়েও তারা আপত্তি জানান।
অন্যদিকে, সোমবার (৫ জানুয়অরি) সচিবালয়ে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে বেসামরিক বিমান চলাচল ও পর্যটন উপদেষ্টা শেখ বশিরউদ্দীন দাবি করেন, নতুন অধ্যাদেশ টিকিট ব্যবসায় সিন্ডিকেট ও অনৈতিক কার্যক্রম উল্লেখযোগ্যভাবে কমিয়েছে।
তিনি জানান, এয়ারলাইন অপারেটর, গ্লোবাল ডিস্ট্রিবিউশন সিস্টেম (জিডিএস), নিউ ডিস্ট্রিবিউশন ক্যাপাবিলিটি (এনডিসি), ট্রাভেল জিএসএ এবং এজেন্সিগুলোকে একক জবাবদিহির কাঠামোর মধ্যে আনা হয়েছে। এর ফলে সিন্ডিকেটে জড়িতরা সহজে কাজ করতে পারবে না।
উপদেষ্টা আরও বলেন, “টিকিটের দাম ইতোমধ্যে ৪০ থেকে ৫০ শতাংশ কমেছে, তবে তা এখনো অযৌক্তিক। লক্ষ্য হলো দাম আরও কমিয়ে যুক্তিসঙ্গত পর্যায়ে আনা।”
মন্ত্রণালয়ের সচিব নাসরিন জাহান লিখিত বক্তব্যে জানান, ২০২৫ সালের আগস্ট থেকে অক্টোবরের মধ্যে কয়েকটি অনলাইন ট্রাভেল এজেন্সি বিপুল অর্থ আত্মসাৎ করে বিদেশে পালিয়ে যায়। একই সময়ে প্রবাসী শ্রমিকদের কাছ থেকে প্রতারণা ও অতিরিক্ত ভাড়া আদায়ের অসংখ্য অভিযোগ পাওয়া যায়।
এসব অনিয়ম ঠেকাতে নতুন অধ্যাদেশে ভোক্তা ও প্রবাসী শ্রমিক সুরক্ষায় শক্তিশালী ব্যবস্থা যুক্ত করা হয়েছে। টিকিটে এজেন্সির নাম, নিবন্ধন নম্বর ও প্রকৃত মূল্য ছাপানো বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। ভুয়া বুকিং ও জিডিএস লগইন তথ্য শেয়ার করাকে শাস্তিযোগ্য অপরাধ ঘোষণা করা হয়েছে।
সরকারের দাবি, এই অধ্যাদেশ কার্যকর হলে ট্রাভেল এজেন্সি খাতে শৃঙ্খলা ফিরবে, ভোক্তা ও প্রবাসী শ্রমিকদের আস্থা বাড়বে এবং একটি স্বচ্ছ, জবাবদিহিমূলক ও আন্তর্জাতিক মানসম্মত ভ্রমণ ও পর্যটন শিল্প গড়ে উঠবে। অন্যদিকে, ব্যবসায়ীরা বলছেন, প্রায় পাঁচ হাজার এজেন্সির মালিক, কর্মকর্তা-কর্মচারী এবং তাদের পরিবারের ভবিষ্যত ঝুঁকির মুখে পড়বে।













