দেশের ব্যাংকিং খাতে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনতে এবং খেলাপি ঋণের বোঝা কমাতে অভ্যন্তরীণ ও আন্তর্জাতিক—উভয় ক্ষেত্রেই কঠোর অবস্থান নিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক। একদিকে দেশের অভ্যন্তরে দীর্ঘ আইনি জটিলতা এড়াতে আদালতের বাইরে মধ্যস্থতার মাধ্যমে ঋণ আদায়ের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে, অন্যদিকে বিদেশে পাচার হওয়া সম্পদ পুনরুদ্ধারে আন্তর্জাতিক আইনি লড়াইয়ে ব্যাংকগুলোকে সরাসরি সম্পৃক্ত হওয়ার তাগিদ দেওয়া হয়েছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের এসব পদক্ষেপের মূল লক্ষ্য হলো সাধারণ আমানতকারীদের অর্থের সুরক্ষা নিশ্চিত করা এবং আর্থিক খাতের তারল্য সংকট নিরসন করা।
আদালতের দীর্ঘসূত্রতা কমিয়ে খেলাপি ঋণ দ্রুত আদায়ের লক্ষ্যে বুধবার (১১ মার্চ) কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ব্যাংকিং প্রবিধি ও নীতি বিভাগ (বিআরপিডি) থেকে একটি বিশেষ সার্কুলার জারি করা হয়েছে। এই নির্দেশনায় মামলা দায়েরের আগেই নিরপেক্ষ মধ্যস্থতাকারীর মাধ্যমে বিরোধ নিষ্পত্তির পদ্ধতি বা ‘প্রি-সুট মিডিয়েশন’ কার্যকর করার ওপর বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংক জানিয়েছে, চলতি বছরের ৩০ জুনের মধ্যে বিকল্প বিরোধ নিষ্পত্তি বা এডিআর পদ্ধতির মাধ্যমে প্রতিটি ব্যাংককে তাদের খেলাপি ঋণের কমপক্ষে ১ শতাংশ নগদ আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা অর্জন করতে হবে। এই পদ্ধতিতে ঋণদাতা ও ঋণগ্রহীতা আলোচনার মাধ্যমে একটি গ্রহণযোগ্য সমাধানে পৌঁছানোর চেষ্টা করে, যা দীর্ঘ আদালত প্রক্রিয়া, উচ্চ আইনি ব্যয় এবং সময়ক্ষেপণ কমাতে সহায়ক হয়। দক্ষ মধ্যস্থতাকারী নিয়োগের ক্ষেত্রে আইন, বাণিজ্য বা ব্যাংকিং খাতে অন্তত সাত বছরের অভিজ্ঞতাসহ নির্দিষ্ট যোগ্যতার মানদণ্ডও নির্ধারণ করে দিয়েছে নিয়ন্ত্রণ সংস্থা।
অভ্যন্তরীণ এই উদ্যোগের পাশাপাশি বিদেশে পাচার হওয়া সম্পদ পুনরুদ্ধারকে বর্তমান সরকারের অন্যতম অগ্রাধিকার হিসেবে ঘোষণা করেছেন বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর মো. মোস্তাকুর রহমান। মঙ্গলবার (১০ মার্চ) স্টোলেন অ্যাসেট রিকভারি টাস্কফোর্সের এক সভায় তিনি উল্লেখ করেন যে, পাচার হওয়া অর্থ প্রকৃতপক্ষে সাধারণ আমানতকারীদের রক্তঘামানো টাকা। তাই দ্রুততম সময়ের মধ্যে এই অর্থ উদ্ধার করে আমানতকারীদের কাছে ফিরিয়ে দেওয়ার চেষ্টা অব্যাহত থাকবে। সম্পদ পুনরুদ্ধারের এই প্রক্রিয়ায় কোনো ধরনের রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ কাম্য নয় জানিয়ে গভর্নর বলেন, কোনো ব্যাংক চাপ অনুভব করলে তারা যেন সরাসরি তাঁর সঙ্গে যোগাযোগ করে। তিনি জোর দিয়ে বলেন যে, দেওয়ানি কার্যক্রম পরিচালনায় ব্যাংকগুলোকেই কেন্দ্রীয় ভূমিকা পালন করতে হবে এবং পরিচালনা পর্ষদ ও ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষকে সম্পূর্ণ দায়িত্ব নিয়ে সক্রিয় হতে হবে।
পাচার হওয়া সম্পদ পুনরুদ্ধারে সরকার ফৌজদারি ও দেওয়ানি—এই দুই ধরনের আইনি প্রক্রিয়া গ্রহণ করেছে। ফৌজদারি কার্যক্রমগুলো সরকার-টু-সরকার (জি-টু-জি) ভিত্তিতে পরিচালিত হলেও ক্ষতিগ্রস্ত ব্যাংকগুলো তাদের অর্থ উদ্ধারে আন্তর্জাতিক সম্পদ পুনরুদ্ধারকারী প্রতিষ্ঠান ও মামলা অর্থায়নকারী প্রতিষ্ঠানের সহায়তায় দেওয়ানি মামলা পরিচালনার উদ্যোগ নিয়েছে। বর্তমানে সর্বোচ্চ পরিমাণ অর্থ পাচার ও বিদেশে স্থানান্তরের তথ্যের ভিত্তিতে দেওয়ানি কার্যক্রমের প্রথম ধাপে ছয়টি প্রধান মামলা নির্বাচন করা হয়েছে। আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠান নিয়োগের লক্ষ্যে ইতোমধ্যে ১০টি ব্যাংক ৯টি আন্তর্জাতিক সম্পদ পুনরুদ্ধারকারী প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে ৩৬টি গোপনীয়তা চুক্তি বা এনডিএ স্বাক্ষর করেছে। বিদেশে অর্থ পাচারের কারণে ক্ষতিগ্রস্ত ব্যাংকগুলোর প্রায় ৬০ শতাংশ এই প্রক্রিয়া সম্পন্ন করলেও সরকারি মালিকানাধীন ব্যাংকগুলো এখনো চুক্তি স্বাক্ষর প্রক্রিয়ায় কিছুটা পিছিয়ে রয়েছে।
প্রথম ধাপের কাজ হিসেবে কিছু ব্যাংক ইতোমধ্যে পাচার হওয়া ঋণসংক্রান্ত তথ্য যাচাই-বাছাই ও মূল্যায়নের জন্য আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানগুলোর কাছে সরবরাহ শুরু করেছে। এই ধাপ সফলভাবে সম্পন্ন হওয়ার পর বিদেশে অর্থ পাচারের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ১০০টির বেশি মামলা নিয়ে দ্বিতীয় ধাপ শুরু করার পরিকল্পনা রয়েছে টাস্কফোর্সের। ব্যাংকার ও আর্থিক খাতের বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, দেশের ভেতরে ‘প্রি-সুট মিডিয়েশন’ এবং বিদেশে ‘সিভিল অ্যাসেট রিকভারি’র এই সমন্বিত উদ্যোগ কার্যকরভাবে বাস্তবায়িত হলে ব্যাংকগুলোর খেলাপি ঋণের চাপ কমবে এবং সামগ্রিক অর্থনীতিতে স্থিতিশীলতা ফিরে আসবে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কর্মকর্তারা বলছেন, আদালতনির্ভর প্রক্রিয়ার পাশাপাশি বিকল্প বিরোধ নিষ্পত্তি এবং আন্তর্জাতিক আইনি সহায়তা গ্রহণ এখন সময়ের দাবি।













