ব্যাংকে ঋণ থাকায় ত্রয়োদশ জাতীয় নির্বাচনে প্রার্থী হওয়ার যোগ্যতা হারিয়েছিলেন নাগরিক ঐক্যের সভাপতি মাহমুদুর রহমান মান্না। ইসলামী ব্যাংক বগুড়া শাখা থেকে আফাকু কোল্ড স্টোরেজ লিমিটেডের নামে নেওয়া ঋণের কারণে তিনি প্রার্থী হতে পারছিলেন না। প্রতিষ্ঠানটির ৫০ শতাংশ শেয়ার তাঁর নিজের, আর ঋণ ৩৮ কোটি টাকার বেশি।
এই অবস্থায় হাইকোর্টে রিট খারিজ হওয়ার পর আপিল বিভাগের চেম্বার আদালত থেকে পাওয়া আদেশে মনোনয়ন জমাদানের শেষ দিনে নির্বাচনী মাঠে নামার বাধা পেরিয়েছেন তিনি। বাংলাদেশ ব্যাংকের ক্রেডিট ইনফরমেশন ব্যুরো (সিআইবি)-এর ঋণখেলাপি তালিকায় ‘মান্নার নাম অন্তর্ভুক্তের কার্যক্রম আট সপ্তাহের জন্য স্থগিত’ করেছেন বিচারক।
“জনাব মাহমুদুর রহমান মান্নাকে খেলাপি হিসেবে দেখানোর বিরুদ্ধে মাননীয় চেম্বার জজ আদালতের স্থগিতাদেশ। নির্বাচনে অংশগ্রহণে কোনো বাধা নেই,” ফেসবুক পোস্টে ২৯ ডিসেম্বর এভাবেই লিখেছেন মান্নার অন্যতম আইনজীবী জ্যোতির্ময় বড়ুয়া। সম্প্রতি ঋণ পুনঃতফসিল করার পর সিআইবি প্রতিবেদন থেকে নিজের নাম কাটাতে হাইকোর্টে রিট করেন মান্না।
বিচারপতি মো. বজলুর রহমান ও বিচারপতি মো. মনজুর আলমের সমন্বয়ে গঠিত হাইকোর্ট বেঞ্চ ২৪ ডিসেম্বর সেই রিট সরাসরি খারিজ করে দেন। তখন জ্যোতির্ময় বড়ুয়া সাংবাদিকদের বলেছিলেন, “আফাকু কোল্ড স্টোরেজ লিমিটেডের নামে ইসলামী ব্যাংক বগুড়া শাখা থেকে ঋণ নেওয়া হয়েছিল। বাংলাদেশ ব্যাংক পুনঃতফসিলের অনুমতি দেয় এবং মান্না ইতোমধ্যে ১ কোটি ২৬ লাখ টাকার বেশি জমা দিয়েছেন। ইসলামী ব্যাংকও ঋণ পুনঃতফসিল করেছে।”
সেদিন রাষ্ট্রপক্ষে শুনানিতে থাকা ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল মুহাম্মদ শফিকুর রহমান সাংবাদিকদের জানান, ঋণের একটা অংশ পরিশোধ করে হাইকোর্টে রিট করেছেন তিনি। সিআইবি থেকে তাঁদের নাম যেন প্রত্যাহার করা হয়, তাহলে তিনি নির্বাচনে অংশ নিতে পারবেন। কিন্তু হাইকোর্ট বিভাগ সন্তুষ্ট হননি, খারিজ করে দিয়েছেন।
“বাংলাদেশ ব্যাংকের নিয়ম হচ্ছে দুই শতাংশ জমা দেওয়ার কথা। তিনি দুই শতাংশের বেশি পরিশোধ করেছেন। কিন্তু আদালত বলছেন, তালিকা থেকে মাহমুদুর রহমান মান্নার নাম প্রত্যাহার করতে আদালত বাংলাদেশ ব্যাংককে কোনো নির্দেশনা দেবেন না। ঋণ গ্রহণকারী ইসলামী ব্যাংক এটি বাংলাদেশ ব্যাংককে (ঋণের তথ্য জানাবে) দেবে,” বলেছিলেন তিনি।
এরপর মান্না হাইকোর্টের আদেশের বিরুদ্ধে আপিল বিভাগের চেম্বার আদালতে আবেদন করেন। সোমবার (২৯ ডিসেম্বর) শুনানি শেষে আপিল বিভাগের বিচারপতি মো. রেজাউল হকের চেম্বার আদালত তাঁর পক্ষে আদেশ দেন। আদালতে মান্নার পক্ষে শুনানিতে জ্যোতির্ময় বড়ুয়া ছাড়াও ছিলেন জ্যেষ্ঠ আইনজীবী আহসানুল করিম ও আইনজীবী সৈয়দ মামুন মাহবুব। ইসলামী ব্যাংকের পক্ষে ছিলেন জ্যেষ্ঠ আইনজীবী আবদুল কাইয়ুম লিটন।
আগের দিন (২৮ ডিসেম্বর) একই আদালতে শুনানি শেষে রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবী সহকারী অ্যাটর্নি জেনারেল মো. উজ্জ্বল হোসাইন গণমাধ্যমকে বলেছিলেন, জাতীয় সংসদ নির্বাচন পরিচালনা ম্যানুয়েলের ১২ এর দফা (১), উপদফা (ঠ) অনুযায়ী মাহমুদুর রহমান মান্না ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে অংশগ্রহণের যোগ্য নন। কারণ, সেখানে স্পষ্ট করে বলা আছে—যদি কোনো ব্যক্তি এমন কোনো কোম্পানি বা প্রতিষ্ঠানের পরিচালক বা ফার্মের অংশীদার হন যা কোনো ব্যাংক বা আর্থিক প্রতিষ্ঠান থেকে গৃহীত ঋণ বা তার কোনো কিস্তি মনোনয়নপত্র জমা দেওয়ার দিনের আগে পরিশোধে খেলাপি হয়, তাহলে তিনি নির্বাচনে অংশগ্রহণ করতে পারবেন না।
তবে মনোনয়ন জমাদানের শেষ দিনে নিজের পক্ষে রায় পেয়েই ভোটের মাঠে ফিরেছেন মান্না। তিনি ঢাকা-১৮ ও বগুড়া-২ আসনে মনোনয়ন জমা দিয়েছেন বলে তাঁর ভেরিফায়েড ফেসবুক পেজ থেকে জানানো হয়েছে।
আগামী নির্বাচনে ঋণখেলাপিরা অংশ নিতে পারবেন না বলে জানিয়ে ১৩ আগস্ট অর্থ উপদেষ্টা ড. সালেহ উদ্দিন আহমেদ বলেছিলেন, “নির্বাচন কমিশনের উচিত ঋণখেলাপিদের শনাক্ত করা। কিন্তু সমস্যা হচ্ছে কোর্টের স্টে-অর্ডার নিয়ে। মহিউদ্দিন খান আলমগীর তো ঋণখেলাপি অবস্থায় পাঁচ বছর কাটিয়ে দিয়েছিলেন।”
আগামী নির্বাচনে কালো টাকা রোধে সরকার কোনো পদক্ষেপ নিচ্ছে কি না—এমন প্রশ্নের উত্তরে সচিবালয়ে সেদিন এই অর্থনীতিবিদ বলেছিলেন, “কালো টাকার ক্ষেত্রে দুটি বিষয় হচ্ছে উৎস আর প্রক্রিয়া। উৎসটা কিন্তু আগের চেয়ে মোটামুটি বন্ধ হয়েছে।” তিনি আরও বলেন, “আমরা সবসময় বলি অর্থনৈতিক উন্নয়ন নির্ভর করে রাজনৈতিক সংস্কৃতির ওপর। রাজনীতিবিদরা যদি উৎসাহ দেন যে টাকা-পয়সা দিয়ে মনোনয়ন দেবেন, ভোট দেবেন, তাহলে আমি অর্থ মন্ত্রণালয় থেকে কিছুই করতে পারব না।”
সর্বশেষ ৯ ডিসেম্বর দুর্নীতিবিরোধী দিবসের অনুষ্ঠানে অর্থ উপদেষ্টা বলেছেন, “রাজনীতিবিদদের সদিচ্ছা না থাকলে সমাজে পচন ধরবে। রাজনীতিবিদরা ঠিক থাকলে সহজে সমাজে পচন ধরবে না, দুর্নীতি কমে আসবে।” তাঁর মতে, শুধু শাস্তি দিয়েই নয়, সামাজিকভাবে দুর্নীতিবাজদের প্রতিরোধ করলে দুর্নীতি কমে আসবে। দুর্নীতি বন্ধে সামাজিক আন্দোলন গড়ে তুলতে হবে।
“আগে দুর্নীতিগ্রস্ত লোককে সামাজিকভাবে এড়িয়ে চলা হতো। দুর্নীতিবাজদের খারাপ লোক হিসেবে ঘৃণা করা হতো। মেয়ে বিয়ে দিতে চাইত না; এখন টাকা আছে—লাফিয়ে বিয়ে দিতে যায়, অনুষ্ঠানে সম্মান জানাতে যায়,” বলেন তিনি। বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের লুটপাটের দিকে ইঙ্গিত করে বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর সালেহ উদ্দিন বলেন, “এই যে হাজার হাজার কোটি টাকা নিয়ে গেল—তাদের শাস্তি কী দেবেন? সারাজীবন জেলে থাকলেও তো শাস্তি হবে না, দেশের ক্ষতি পূরণ হবে না।”
গত ৭ ডিসেম্বর বাংলাদেশ উন্নয়ন গবেষণা প্রতিষ্ঠানের (বিআইডিএস) বার্ষিক গবেষণা সম্মেলনে আরেক অর্থনীতিবিদ, পরিকল্পনা উপদেষ্টা ড. ওয়াহিদ উদ্দিন মাহমুদ বলেন, “অবৈধ সম্পদ উপার্জনে রাজনীতির চাহিদা থাকলে বিধিবিধান দিয়ে কোনো কিছুরই সমাধান হবে না। এক্ষেত্রে একটা অনিয়মের উৎস বন্ধ করলে অন্য উৎস খোঁজা হবে। এজন্য আমাদের সামাজিক, রাজনৈতিক ও ব্যক্তিগত মানসিকতার পরিবর্তন ঘটাতে হবে। সমাজের বিভিন্ন শ্রেণির মধ্যে স্বার্থের ভারসাম্য রক্ষা করতে হবে।”
উল্লেখ্য, আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ৩০০ নির্বাচনী এলাকায় রিটার্নিং কর্মকর্তা বা সহকারী রিটার্নিং কর্মকর্তার কাছে মোট ২ হাজার ৫৮২টি মনোনয়নপত্র জমা পড়েছে। প্রার্থীরা ৩ হাজার ৪০৭টি মনোনয়নপত্র সংগ্রহ করেছিলেন বলেও নির্বাচন কমিশন (ইসি) থেকে জানানো হয়েছে। মনোনয়নপত্র বাছাই কার্যক্রম চলবে ৪ জানুয়ারি পর্যন্ত
মান্নার ঋণ নিয়ে যা জানা যায়
এদিকে, আইনজীবীদের বরাত দিয়ে একাধিক গণমাধ্যমে প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, গত ১০ ডিসেম্বর নাগরিক ঐক্যের সভাপতি মাহমুদুর রহমান মান্নার নেতৃত্বাধীন প্রতিষ্ঠান আফাকু কোল্ড স্টোরেজ লিমিটেডের কাছে খেলাপি ৩৮ কোটি ৪ লাখ ৭৬ হাজার টাকা আদায়ে ‘কল ব্যাক নোটিশ’ জারি করে ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ লিমিটেডের বগুড়া বড়গোলা শাখা। মান্না ও তাঁর দুই অংশীদারের ঠিকানায় পাঠানো এই নোটিশে ১৮ ডিসেম্বরের মধ্যে বকেয়া পরিশোধের নির্দেশ দেওয়া হয়।
নির্ধারিত সময়ের মধ্যে বকেয়া পরিশোধ না করলে তাঁদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলে উল্লেখ করা হয়। শাখা প্রধান তৌহিদ রেজার স্বাক্ষরিত নোটিশটি প্রতিষ্ঠানটির চেয়ারম্যান, নাগরিক ঐক্যের সভাপতি মাহমুদুর রহমান মান্না এবং ব্যবস্থাপনা পরিচালক এ বি এম নাজমুল কাদির শাজাহান চৌধুরীর ঠিকানায় পাঠানো হয়।
তথ্য অনুযায়ী, আফাকু কোল্ড স্টোরেজের মালিকানায় মান্না ৫০ শতাংশ, ব্যবস্থাপনা পরিচালক এ বি এম নাজমুল কাদির শাজাহান চৌধুরী ২৫ শতাংশ এবং তাঁর স্ত্রী ও পরিচালক ইসমত আরা লাইজু ২৫ শতাংশ অংশীদার। গত ৩ ডিসেম্বর পাঠানো নোটিশে বগুড়ার শিবগঞ্জের কিচক বাজারে অবস্থিত প্রতিষ্ঠানটির কাছে খেলাপি বিনিয়োগ বাবদ মোট ৩৮ কোটি ৪ লাখ ৭৬ হাজার টাকা পরিশোধের নির্দেশ দেওয়া হয়।
ব্যাংকের নোটিশে বলা হয়, “২০১০ সালে প্রতিষ্ঠানটিকে ২২ কোটি টাকা বিনিয়োগ অনুমোদন দেওয়া হয়। কিন্তু প্রতিষ্ঠানটি নিয়মিত মুনাফা, চার্জ ও জরিমানা পরিশোধ করেনি। ফলে বকেয়া বেড়ে বর্তমান পরিমাণে দাঁড়িয়েছে। লাভজনক প্রতিষ্ঠান হওয়া সত্ত্বেও কোনো অগ্রগতি না থাকায় চূড়ান্ত সতর্কতা হিসেবে এই নোটিশ পাঠানো হয়েছে।”
সম্পূর্ণ বকেয়া ১৮ ডিসেম্বরের মধ্যে পরিশোধ না করলে ব্যাংক আইনি ব্যবস্থা নিতে বাধ্য হবে বলেও উল্লেখ করা হয়েছিল। গত ২১ ডিসেম্বর ঋণ পুনঃতফসিলের আবেদনে নথিপত্র জালিয়াতির প্রমাণ পাওয়ায় ইসলামী ব্যাংক পুনঃতফসিলের আগে দেওয়া স্যাংশন লেটার বাতিল করে দেয়। এতে করে মান্নার ঋণসংক্রান্ত জটিলতা আরও বেড়ে গেছে বলেও জানানো হয়েছিল একটি খবরে।
কে এই মাহমুদুর রহমান মান্না?
ছাত্র রাজনীতি থেকে জাতীয় রাজনীতির দীর্ঘ পথচলা, বিতর্কিত ফোনালাপ, কারাভোগ—সবকিছু পেরিয়ে আদালতের সর্বশেষ আদেশে তাঁর ত্রয়োদশ নির্বাচনে অংশ নেওয়ার পথ খুলে যায়। আবারও তিনি আলোচনায় এলেন।
মান্নার রাজনৈতিক জীবন বৈচিত্র্যময়। চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদের সাধারণ সম্পাদক ছিলেন তিনি। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র সংসদে (ডাকসু) দুইবার সহসভাপতি নির্বাচিত হন। ছাত্রলীগ (জাসদ) থেকে শুরু করে জাসদ, বাসদ, জনতা মুক্তি পার্টি হয়ে ১৯৯১ সালে যোগ দেন আওয়ামী লীগে। সেখানে সাংগঠনিক সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। ২০১২ সালের ১ জুন তিনি গঠন করেন নাগরিক ঐক্য, যার সভাপতি হিসেবে এখনো দায়িত্ব পালন করছেন।
তবে তাঁর রাজনৈতিক পথচলা বিতর্কহীন ছিল না। ২০১৫ সালের ফেব্রুয়ারিতে বিএনপি-জামায়াতের অবরোধ চলাকালে দুটি ফোনালাপ ফাঁস হয়। সেখানে আন্দোলন বেগবান করতে বিশ্ববিদ্যালয়ে ‘কয়েকটা লাশ ফেলা’ বা হলে সিট দখলের প্রসঙ্গ উঠে আসে। অন্য এক কথোপকথনে সেনাবাহিনীর হস্তক্ষেপের বিষয়েও ইঙ্গিত পাওয়া যায়। অডিও ফাঁস হওয়ার পরপরই সে বছরের ২৪ ফেব্রুয়ারি তাঁকে আটক করা হয়। রাষ্ট্রদ্রোহ ও সেনাবাহিনীতে বিদ্রোহে উসকানির অভিযোগে মামলা হয়।
তিনি ২১ মাস কারাভোগের পর ২০১৬ সালের শেষদিকে জামিনে মুক্তি পান। মান্না পরে স্বীকার করেন ফোনালাপের সত্যতা, তবে দাবি করেন ব্যক্তিগত গোপনীয়তা লঙ্ঘন করে কথার খণ্ডিতাংশ উদ্দেশ্যমূলকভাবে প্রচার করা হয়েছে।











