সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন-ভাতা ও রাষ্ট্রের দৈনন্দিন পরিচালন ব্যয় মেটাতেও বিদেশি ঋণের ওপর নির্ভর করেছে ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকার। গত ২০২৪-২৫ অর্থবছরে রেকর্ড পরিমাণ বাজেট সহায়তা নিয়েছে তারা, যার বড় অংশই খরচ করেছে অনুৎপাদনশীল খাতে অর্থাৎ কর্মকর্তা-কর্মচারীর বেতন ও পরিচালন ব্যয়ে।
গত ২৯ জানুয়ারি নিজেদের ওয়েবসাইটে প্রকাশ করা এক প্রতিবেদনে এমনটা জানিয়েছে সরকারের অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগ (ইআরডি)। প্রতিবেদনটি বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, বাংলাদেশের স্বাধীনতার পর থেকে ২০২৪-২৫ অর্থবছর পর্যন্ত বিভিন্ন সরকার উন্নয়ন সহযোগীদের কাছ থেকে মোট ১৪ দশমিক ৪৯ বিলিয়ন ডলার বাজেট সহায়তা পেয়েছে। এর মধ্যে ২০২৪-২৫ অর্থবছরে ড. ইউনূসের নেতৃত্বাধীন সরকার গ্রহণ করেছে ৪ দশমিক ০৬ বিলিয়ন ডলার (৪৯ হাজার ৫৩২ কোটি টাকা)। অর্থাৎ, গত ৫৪ বছরে দেশ যত বাজেট সহায়তা পেয়েছে, তার প্রায় ৩০ শতাংশই এসেছে ড. ইউনূস সরকারের এই স্বল্প সময়ে।
প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে সরকার মোট ৯ দশমিক ৩২ বিলিয়ন ডলার বিদেশি ঋণ নিয়েছে। যার সবচেয়ে বড় অংশ অর্থাৎ ৪ দশমিক ০৬ বিলিয়ন ডলার বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে ‘সাধারণ সরকারি সেবা’ খাতে। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এই অর্থের সিংহভাগ ব্যয় হয়েছে সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন-ভাতা পরিশোধ এবং সরকারের দৈনন্দিন পরিচালন ব্যয় মেটাতে।
চলতি ব্যয় বা বেতন মেটাতে বিদেশি ঋণ নেওয়ার এই প্রবণতাকে উচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ বলে মনে করছেন অর্থনীতিবিদরা। বিআইডিএসের সাবেক মহাপরিচালক মুস্তফা কে মুজেরি সাংবাদিকদের বলেন, “গত চার দশকে পরিচালন ব্যয় মেটাতে এমন ঋণের নজির খুব কম। এটি অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ। প্রকল্প ঋণে সরাসরি ফলাফল বা রিটার্ন পাওয়া যায়, কিন্তু বেতন-ভাতা বা সেবায় এই অর্থ খরচ করলে তা থেকে কোনো সরাসরি রিটার্ন আসে না। এটি অর্থনীতির ওপর দীর্ঘমেয়াদি চাপ তৈরি করবে।”
তবে পলিসি এক্সচেঞ্জ বাংলাদেশের চেয়ারম্যান মাশরুর রিয়াজ ভিন্ন মত পোষণ করেছেন। তিনি এই প্রতিবেদককে বলেন, “অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব নেওয়ার সময় রিজার্ভের চরম সংকটে ছিল। সেই সময় রিজার্ভ বাড়াতে এই বাজেট সহায়তার খুব প্রয়োজন ছিল। প্রকল্প ঋণ আসতে দীর্ঘ সময় লাগে, কিন্তু বাজেট সাপোর্ট তাৎক্ষণিক পাওয়া যায়, যা সরকার প্রয়োজন অনুযায়ী খরচ করতে পারে।”
ইআরডির হিসাবে, ২০২৫ সালের জুন পর্যন্ত বাংলাদেশের মোট বিদেশি ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে প্রায় ৭৭ বিলিয়ন ডলার, যা মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) ১৯ শতাংশ। ইআরডি এই অবস্থাকে ‘সন্তোষজনক’ বললেও বিশ্বব্যাংক সতর্ক করেছে যে, বাংলাদেশের ঋণ ঝুঁকি এখন ‘নিম্ন’ অবস্থান থেকে ‘মাঝারি’ পর্যায়ে পৌঁছেছে।
স্বাধীনতার পর থেকে এ পর্যন্ত দেশ প্রায় ২০০ বিলিয়ন ডলার ঋণ করেছে। গত অর্থবছরে ৪ বিলিয়ন ডলারের বেশি পরিশোধ করতে হয়েছে এবং চলতি অর্থবছরেও সেই চাপের ধারা অব্যাহত আছে।
ইআরডির প্রতিবেদন অনুযায়ী, চলতি অর্থবছরের প্রথম সাত মাসে (জুলাই-জানুয়ারি) বাংলাদেশ যে পরিমাণ বিদেশি ঋণ ও অনুদান পেয়েছে, তার চেয়ে বেশি অর্থ কিস্তি হিসেবে পরিশোধ করতে হয়েছে। এই সময়ে মোট ২৬৪ কোটি ১৬ লাখ ডলার বিদেশি সহায়তা এলেও বিভিন্ন দাতা সংস্থা ও দেশকে সুদ ও আসল বাবদ পরিশোধ করতে হয়েছে ২৬৭ কোটি ৬৮ লাখ ডলার।
পরিশোধিত অর্থের মধ্যে ১৭৮ কোটি ৫০ লাখ ডলার আসলের পাশাপাশি ৮৯ কোটি ডলার সুদের বোঝা টানতে হয়েছে সরকারকে, যা গত কয়েক বছর ধরে বাড়তে থাকা বিদেশি ঋণ পরিশোধের ক্রমবর্ধমান চাপের প্রতিফলন।
বিশেষজ্ঞদের অনেকেই আশঙ্কা করছেন, দেশ ধীরে ধীরে ঋণের ফাঁদের দিকে এগোচ্ছে। তাঁদের ভাষ্য, আওয়ামী লীগ ও অন্তর্বর্তী সরকারের নেওয়া এই বিপুল ঋণের দায় এবং তা পরিশোধের কঠিন বাস্তবতা এখন নতুন বিএনপি সরকারকে সামাল দিতে হবে।
উন্নয়ন বাজেট সংকুচিত করে কেবল ঋণের সুদ ও বেতন পরিশোধ করতে গেলে দেশের সাধারণ মানুষের প্রত্যাশা পূরণ করা সরকারের জন্য কঠিন হয়ে পড়বে।













