বাংলাদেশের প্রধান পুঁজিবাজার ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের (ডিএসই) তালিকাভুক্ত তথ্যপ্রযুক্তি খাতের কোম্পানি ইনটেক অনলাইন, যার বর্তমান নাম ‘ইনটেক লিমিটেড’—হঠাৎ করেই তুমুল আলোচনায় এসেছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের নতুন গভর্নর মো. মোস্তাকুর রহমান মূল উদ্যোক্তা হওয়ায় এই কোম্পানি ঘিরে বিনিয়োগকারীদের মাঝে ব্যাপক কৌতূহল তৈরি হয়েছে এবং তাঁর নিয়োগের খবরের ঠিক আগে-পরে শেয়ারদরও কিছুটা বেড়েছে।
যারই সূত্র ধরে সুইডেনভিত্তিক অনুসন্ধানী সংবাদমাধ্যম নেত্রনিউজ বুধবার (৪ মার্চ) প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে দাবি করে, চট্টগ্রামভিত্তিক বিতর্কিত শিল্পপ্রতিষ্ঠান এস আলম গ্রুপের সহযোগী প্রতিষ্ঠান ও সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের সঙ্গে ব্যবসায়িক সম্পর্ক থাকা এক স্পনসর শেয়ারহোল্ডারই এখন কেন্দ্রীয় ব্যাংকের গভর্নর। এস আলম গ্রুপের সহযোগী প্রতিষ্ঠান ও ব্যক্তিদের সঙ্গে নতুন গভর্নরের দীর্ঘদিনের ব্যবসায়িক যোগসূত্র রয়েছে বলেও উল্লেখ করা হয়েছে তাদের প্রতিবেদনে।
নেত্রনিউজের বরাত দিয়ে ইতিমধ্যে সংবাদটি প্রচার করেছে আরও একাধিক গণমাধ্যম। সারাবাংলার শিরোনাম ছিল, “বিবি গভর্নরের নিয়োগের আগে ও পরে ‘এস আলম সংশ্লিষ্ট’ কোম্পানির শেয়ার দরে বড় লাফ।” চট্টগ্রাম প্রতিদিনের শিরোনাম, “বাংলাদেশ ব্যাংক গভর্নরের এস আলম-সংযোগ, নেপথ্যে লাবুর ইনটেক কানেকশন।”
একইভাবে বাংলা স্ট্রিম “গভর্নর মোস্তাকুরের লোকসানি কোম্পানির শেয়ারের দামে উল্লম্ফন, এস আলম পরিবারের সংশ্লিষ্টতা” শিরোনামে প্রকাশ করেছে খবরটি। এসব নজরে আসার কথা স্বীকার করে এগুলো একটি বিশেষ মহলের পরিকল্পিত অপপ্রচার বলে দাবি করেছে ডিএসই কর্তৃপক্ষ।
ডিএসই পরিচালক মিনহাজ মান্নান ইমন ডিএসজে প্রতিবেদককে বলেন, “ব্যবসা-বাণিজ্যের ক্ষেত্রে যে কেউ যেকোনো কোম্পানির শেয়ারহোল্ডার হতে পারেন। ব্যবসা পরিচালনার প্রয়োজনে নিজে কিংবা পরিবারের সদস্যরাও মালিকানায় থাকতে পারেন—এটি একটি স্বাভাবিক প্রক্রিয়া। তবে ইনটেক অনলাইনের নথিপত্র পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, ২০০৬ সালের পর থেকেই প্রতিষ্ঠানটির সঙ্গে বর্তমান গভর্নরের কোনো ধরনের সম্পর্ক ছিল না।”
তিনি বলেন, “আমাদের কাছে থাকা তথ্য অনুযায়ী, ইনটেক অনলাইন কোম্পানিটি এক পর্যায়ে এটিএম মাহবুবুল আলমের কাছে হস্তান্তর করা হয়। পরবর্তীতে ২০২০-২১ অর্থবছরে তিনি (মাহবুবুল আলম) এস আলম গ্রুপ ও কেডিএস গ্রুপের নিকট মালিকানা স্থানান্তর করে বেরিয়ে যান। অর্থাৎ, ২০০৬ সালের পর থেকে দীর্ঘ এই পুরো সময়কালে কোম্পানির ব্যবস্থাপনা কিংবা পরিচালনায় মোস্তাকুর রহমানের কোনো সংশ্লিষ্টতাই ছিল না।”
অন্যদিকে নেত্রনিউজের প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে যে, ইনটেকের সাবেক চেয়ারম্যান এটিএম মাহবুবুল আলম নিশ্চিত করেছেন মোস্তাকুর রহমান তাঁর পারিবারিক বন্ধু। মন্তব্যের জন্য গভর্নরের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলেও তিনি নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে কোনো জবাব দেননি বলেও তারা জানিয়েছে।
গভর্নরকে ঘিরে এই ধরনের প্রচারণাকে ‘দুঃখজনক’ আখ্যা দিয়ে স্টক এক্সচেঞ্জের পরিচালক আরও বলেন, “প্রায় ২০ বছর আগে ছেড়ে যাওয়া কোম্পানির একজন সাবেক উদ্যোক্তা এখন গভর্নর হওয়ায় তাঁর সঙ্গে এস আলম গ্রুপের যোগসূত্র খোঁজা হচ্ছে, যা অত্যন্ত অনভিপ্রেত। অথচ সেই কোম্পানির কোনো কার্যক্রমের সঙ্গেই তিনি যুক্ত ছিলেন না। শুধুমাত্র গভর্নর হওয়ার কারণেই এমন কাল্পনিক সূত্র খুঁজে বেড়ানো দুঃখজনক।”
একটি বিশেষ মহল বিষয়টিকে পরিকল্পিতভাবে বিতর্কিত করে গভর্নরের নিয়োগটিকে সরকারের একটি ‘ভুল সিদ্ধান্ত’ হিসেবে প্রমাণের চেষ্টা চালাচ্ছে বলে মনে করেন মিনহাজ মান্নান ইমন। জানতে চাইলে বাংলাদেশ ব্যাংকের মুখপাত্র আরিফ হোসেন খান ডিএসজে প্রতিবেদককে বলেন, “এটি গভর্নরের ব্যক্তিগত বিষয় এবং এটি নিয়ে বাংলাদেশ ব্যাংক কোনো মন্তব্য করতে পারে না।”
নথিপত্র ও পরিচালনা পর্ষদ পরিবর্তনের ইতিহাস বিশ্লেষণ করে ডিএসজে প্রতিবেদকও দেখেছেন, গত ২০ বছর ধরে কোম্পানিটির ব্যবস্থাপনা বা নীতিনির্ধারণে মোস্তাকুর রহমানের কোনো কার্যকর ভূমিকা নেই। ২০০৬ সালের পর থেকেই তিনি আর কোম্পানিটির পরিচালনা পর্ষদে ছিলেন না। যদিও ২০০২ সালে ইনটেক অনলাইন যখন পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত হয়, তখন এর প্রধান উদ্যোক্তা ও ৬৬.৩৩ শতাংশ শেয়ারের মালিক ছিলেন বর্তমান বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর মো. মোস্তাকুর রহমান।
বিগত ১৫ বছরের নিরীক্ষিত বার্ষিক প্রতিবেদন অনুযায়ী মোস্তাকুর রহমানের প্রস্থানের পর বিভিন্ন সময়ে ইনটেক অনলাইনের চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন মো. আশিকুর রহমান, মোসলেহউদ্দিন আহমেদ এবং এটিএম মাহবুবুল আলমসহ আরও কয়েকজন। বর্তমানে কোম্পানিতে গভর্নরের শেয়ারের পরিমাণ মাত্র ০.৫০ শতাংশ। পুঁজিবাজারের আইন অনুযায়ী উদ্যোক্তা-পরিচালকদের সম্মিলিত শেয়ার ধারণের পরিমাণ ৩০ শতাংশের বেশি না থাকলে তাঁরা কোনো শেয়ার বিক্রি করতে পারেন না, যে কারণে এই সামান্য শেয়ারটি তিনি বিক্রি করতে পারছেন না।
তবে নেত্রনিউজের অনুসন্ধানে উঠে এসেছে যে, তথ্যপ্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান ‘ইনটেক লিমিটেড’ বর্তমানে এস আলম গ্রুপের ভাইস চেয়ারম্যান আবদুস সালাম লাবুর পরিবারের নিয়ন্ত্রণে রয়েছে। লাবুর ছেলে আতিকুল আলম চৌধুরী হলেন ইনটেকের বর্তমান চেয়ারম্যান এবং লাবুর ছেলের স্ত্রী হলেন সাবেক ভূমিমন্ত্রী সাইফুজ্জামান চৌধুরী জাবেদের মেয়ে জেবা জামান চৌধুরী।
ডিএসজে প্রতিবেদক দেখেছেন, এস আলম গ্রুপের কাছে ইনটেক অনলাইনের নিয়ন্ত্রণ স্থানান্তর হয় মূলত ২০২০-২১ অর্থবছরে, যা মোস্তাকুর রহমান প্রতিষ্ঠানটি থেকে বিচ্ছিন্ন হওয়ার অন্তত দেড় দশক পরের ঘটনা। ফলে বর্তমান গভর্নরের দাপ্তরিক অবস্থানের সঙ্গে এস আলম নিয়ন্ত্রিত ইনটেক অনলাইনের ব্যবসায়িক কর্মকাণ্ডের কোনো প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ যোগসূত্র নথিপত্রে পাওয়া যায় না।
২০২০-২১ হিসাববছরে ইনটেক অনলাইনের চেয়ারম্যান হন আতিকুল আলম চৌধুরী, যিনি এস আলম গ্রুপের ভাইস চেয়ারম্যান এবং এস আলমের ছোট ভাই আবদুস সালাম লাবুর ছেলে। তবে ২০২৩-২৪ হিসাববছর থেকে পর্ষদে চেয়ারম্যান হিসেবে রয়েছেন খন্দকার সাকিব আহমেদ এবং পরিচালক হিসেবে এখনও বহাল রয়েছেন এস আলম পরিবারের সদস্য আতিকুল আলম চৌধুরী।
নেত্রনিউজের অনুসন্ধান বলছে, গভর্নরের স্ত্রী আখতার সানজিদা কাসেম একজন চার্টার্ড অ্যাকাউন্ট্যান্ট এবং তাঁর ফার্ম ২০১৭ সালে এস আলম গ্রুপ ইসলামী ব্যাংকের নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার সময় অডিট কাজের জন্য নিযুক্ত ছিল। নেত্রনিউজ আরও দাবি করেছে, মোস্তাকুর রহমান একটি মাঝারি আকারের সোয়েটার কারখানার মালিক এবং তাঁর মালিকানাধীন ‘হেরা সোয়েটার্স লিমিটেড’-এর ৮৯ কোটি টাকার খেলাপি ঋণ গত ডিসেম্বরেই বাংলাদেশ ব্যাংকের অনুমোদনে পুনঃ তফসিল করা হয়েছে।
দায়িত্ব নেওয়ার পরই তিনি রপ্তানিমুখী শিল্পের জন্য ঋণ সুবিধা অনুমোদন করায় সেখানেও স্বার্থের সংঘাতের প্রশ্ন তুলেছেন অর্থনীতিবিদ জ্যোতি রহমান। নেত্রনিউজকে তিনি বলেন, “সরাসরি নিজের বা সহযোগীদের স্বার্থ জড়িত এমন সিদ্ধান্ত থেকে নিজেকে বিরত রাখার মাধ্যমে গভর্নর নিজেকে সুরক্ষিত রাখতে পারেন।”
নেত্রনিউজ বিশেষ গুরুত্ব দিয়ে জানিয়েছে, ইনটেক বর্তমানে একটি লোকসানি প্রতিষ্ঠান এবং সর্বশেষ প্রান্তিকে কোম্পানিটির নিট লোকসান হয়েছে ২৫ লাখ ৬০ হাজার টাকার বেশি। কোনো সংগত কারণ ছাড়াই এমন দুর্বল মৌলভিত্তির শেয়ারের দাম বাড়ায় বাজারসংশ্লিষ্টদের মধ্যে সন্দেহ দেখা দিয়েছে।
ডিএসজে প্রতিবেদকের বিশ্লেষণ অনুযায়ী, মোস্তাকুর রহমান গভর্নর হিসেবে দায়িত্ব নেওয়ার পরদিন ২৬ ফেব্রুয়ারি ইনটেক অনলাইনের শেয়ারদর সর্বোচ্চ বাড়লেও পরবর্তী দিনগুলোতে তা সমন্বয় হতে দেখা যায়। গভর্নর দায়িত্ব নেওয়ার দিন ডিএসইতে শেয়ারটির দাম ছিল ৩৪ টাকা ১০ পয়সা, যা আজ ৫ মার্চ দাঁড়িয়েছে ৩৫ টাকা ৯০ পয়সা; যা শতাংশের হিসেবে ৫.২৭ শতাংশ বৃদ্ধি।
তবে নেত্রনিউজের প্রতিবেদনে ভিন্ন একটি হিসাব তুলে ধরা হয়েছে। তাদের তথ্যমতে, গত ২৪ ফেব্রুয়ারি নিয়োগের আনুষ্ঠানিক ঘোষণার ঠিক এক দিন আগে কোম্পানিটির শেয়ারদর ৩০ টাকা থেকে বেড়ে ৩৩ টাকায় দাঁড়ায় এবং নিয়োগের এক দিন পর তা ৩৮.৮ টাকায় পৌঁছায়, যা মাত্র কয়েক দিনে প্রায় ১৭ শতাংশ বৃদ্ধি।
তারা আরও লিখেছে, অর্থনীতিবিদ আহসান এইচ মনসুরকে বিদায় করে গত ২৫ ফেব্রুয়ারি গভর্নর পদে বসানো হয় মোস্তাকুর রহমানকে, যিনি সরাসরি রাজনীতির সঙ্গেও যুক্ত এবং বিএনপির ৪১ সদস্যের কেন্দ্রীয় নির্বাচন পরিচালনা কমিটির সদস্য ছিলেন। তাঁর বড় ভাই মোস্তাফিজুর রহমান মামুন ছিলেন নারায়ণগঞ্জ সোনারগাঁ থানা বিএনপির সিনিয়র সহসভাপতি।













