বাংলাদেশ ব্যাংকের নতুন গভর্নর হিসেবে মো. মোস্তাকুর রহমানের নিয়োগের বৈধতা নিয়ে আইনি ও সামাজিক উভয় ক্ষেত্রেই তীব্র বিতর্ক তৈরি হয়েছে। তাঁর নিয়োগের বৈধতা চ্যালেঞ্জ করে হাইকোর্টে রিট দায়ের করা হয়েছে। একই দিন স্বার্থের সংঘাত এড়াতে তাঁর নিয়োগ বাতিল করে সংশ্লিষ্ট খাতে দক্ষ ও যোগ্য ব্যক্তিকে পদে বসানোর জোর দাবি জানিয়েছে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি)।
সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী আবদুল্লাহ আল মামুন বৃহস্পতিবার (৫ মার্চ) হাইকোর্টে এই রিট দায়ের করেন। রিটে বিদায়ী গভর্নর আহসান এইচ মনসুরকে অপসারণের বৈধতাও চ্যালেঞ্জ করা হয়েছে।
রিট আবেদনকারীর পক্ষে শুনানি করবেন ব্যারিস্টার সারোয়ার হোসেন। তিনি সাংবাদিকদের বলেন, “বাংলাদেশ ব্যাংক আদেশ, ১৯৭২–এর সংশ্লিষ্ট ধারা লঙ্ঘন করে সরকার আহসান এইচ মনসুরকে অপসারণ করেছে। আইনে স্পষ্টভাবে বলা আছে, গভর্নর অক্ষম বা অযোগ্য না হলে তাঁকে অপসারণ করা যায় না।”
নতুন গভর্নরের নিয়োগের বিরুদ্ধে গুরুতর অভিযোগ তুলে ব্যারিস্টার সারোয়ার বলেন, “মোস্তাকুর রহমান একজন ঋণখেলাপি এবং বিতর্কিত এস আলম গ্রুপের ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে তাঁর সংশ্লিষ্টতা রয়েছে। যোগসাজশের মাধ্যমে তাঁকে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর নিয়োগের বিষয়টি অনেকটা শুটকি মাছের পাহারাদার হিসেবে বিড়ালকে বসানোর মতো।”
তিনি অভিযোগ করেন, দায়িত্ব পাওয়ার পর তিনি একটি ব্যাংকে এক হাজার কোটি টাকা দেওয়ার ব্যবস্থা করেছেন এবং তাঁর বাবার শিল্প প্রতিষ্ঠানে ৮০০ কোটি টাকা ঋণ পাইয়ে দেওয়ার কাজ করেছেন। আগামী সপ্তাহে হাইকোর্টের একটি বেঞ্চে রিটটির শুনানি হতে পারে বলে জানা গেছে।
অন্যদিকে, গভর্নর মোস্তাকুর রহমানের নিয়োগ বাতিল করে সংশ্লিষ্ট খাতে ‘দক্ষতা ও অভিজ্ঞতাসম্পন্ন এবং স্বার্থের সংঘাতমুক্ত’ ব্যক্তিকে ওই পদে দায়িত্ব দেওয়ার আহ্বান জানিয়েছে টিআইবি। টিআইবি কার্যালয়ে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে সংস্থার নির্বাহী পরিচালক ইফতেখারুজ্জামান এ দাবি জানান।
ইফতেখারুজ্জামান বলেন, “কেন্দ্রীয় ব্যাংক হিসেবে বাংলাদেশ ব্যাংকের স্বাধীন, নিরপেক্ষ ও বিশেষ করে ‘স্বার্থের সংঘাতমুক্ত’ ভূমিকা নিশ্চিত করা জরুরি। যিনি গভর্নর হবেন, তাঁকে অবশ্যই সব ধরনের স্বার্থের দ্বন্দ্বের ঊর্ধ্বে থেকে ভূমিকা পালনে সক্ষম হতে হবে।”
গত ২৫ ফেব্রুয়ারি অর্থ মন্ত্রণালয়ের এক প্রজ্ঞাপনে আহসান এইচ মনসুরকে গভর্নর পদ থেকে অপসারণ করা হয়। একই দিন পোশাক খাতের ব্যবসায়ী ও বিএনপির নির্বাচন পরিচালনা কমিটির সদস্য মো. মোস্তাকুর রহমানকে চার বছরের জন্য নতুন গভর্নর হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়।
নিয়োগের পর থেকেই বিভিন্ন মহলে সমালোচনা শুরু হয়। বিশেষ করে, মিউচুয়াল ট্রাস্ট ব্যাংক (এমটিবি) থেকে মাস দুয়েক আগে মোস্তাকুর রহমানের মালিকানাধীন ‘হেরা সোয়েটার্স’-এর ৮৬ কোটি টাকার খেলাপি ঋণ পুনঃতফসিল করার খবরটি জনমনে আলোচনার জন্ম দেয়।
টিআইবি তাদের সংবাদ সম্মেলনে দেশের দুর্নীতিবিরোধী প্রতিশ্রুতি ও সুশাসন নিশ্চিতে দুদক সংস্কারসহ বিভিন্ন সুপারিশ তুলে ধরে। সংস্থাটি মনে করে, দুর্নীতি ও লুটপাটের সঙ্গে যুক্ত কিংবা স্বার্থের সংঘাত থাকতে পারে এমন কাউকে গুরুত্বপূর্ণ আর্থিক প্রতিষ্ঠানে নিয়োগ দেওয়া সুশাসনের জন্য হুমকি।
এখন দেখার বিষয়, হাইকোর্টের শুনানি এবং টিআইবির দাবির মুখে সরকার এই নিয়োগের বিষয়ে পরবর্তী কী পদক্ষেপ নেয়।
উল্লেখ্য, মোস্তাকুর রহমান বিএনপির জাতীয় নির্বাচন পরিচালনা কমিটির সদস্য ছিলেন এবং তিনি তৈরি পোশাক খাতের ব্যবসায়ী। তাঁর সঙ্গে দেশের ব্যাংক খাতের ‘লুটপাটকারী’ হিসেবে পরিচিত এস আলম গ্রুপের সাথে ব্যবসায়িক যোগসাজশ ও শেয়ার থাকার অভিযোগ রয়েছে।













