গভর্নরের প্রশাসনিক বিভিন্ন সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে প্রকাশ্যে সংবাদ সম্মেলন করায় বড় ধরনের শাস্তিমূলক ব্যবস্থার মুখে পড়েছেন বাংলাদেশ ব্যাংকের তিন পদস্থ কর্মকর্তা। তাঁদের ঢাকার বাইরে বিভিন্ন অফিসে ‘শাস্তিমূলক বদলি’ করা হয়েছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের মানবসম্পদ বিভাগ থেকে মঙ্গলবার (২৪ ফেব্রুয়ারি) এ সংক্রান্ত একটি বিজ্ঞপ্তি জারি করা হয়।
বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়েছে, এসএমই ও স্পেশাল প্রোগ্রামস বিভাগের পরিচালক নওশাদ মোস্তফাকে বরিশাল অফিসে, বৈদেশিক মুদ্রা নীতি বিভাগ-১ এর অতিরিক্ত পরিচালক এবং বাংলাদেশ ব্যাংক ওয়েলফেয়ার অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি মাসুম বিল্লাহকে রংপুর অফিসে এবং সংগঠনটির সাধারণ সম্পাদক ও ব্যাংকিং প্রবিধি ও নীতি বিভাগের অতিরিক্ত পরিচালক গোলাম মোস্তফা শ্রাবণকে বগুড়া অফিসে বদলি করা হয়েছে।
জাতীয় সংসদ নির্বাচনের ঠিক পরের কার্যদিবস, ১৬ ফেব্রুয়ারি এক সংবাদ সম্মেলনে এই কর্মকর্তারা গভর্নর আহসান এইচ মনসুরের তীব্র সমালোচনা করেন। তাঁরা গভর্নরকে ‘স্বৈরাচার’ আখ্যা দিয়ে দুর্বল ব্যাংক একীভূতকরণ, ডিজিটাল ব্যাংকের লাইসেন্স প্রদান এবং কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সিদ্ধান্ত গ্রহণের স্বচ্ছতা নিয়ে প্রশ্ন তোলেন।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের স্টাফ রেগুলেশন অনুযায়ী, কোনো কর্মকর্তা সংবাদ সম্মেলন বা প্রকাশ্য বক্তব্য দেওয়ার আগে যথাযথ কর্তৃপক্ষের অনুমোদন নিতে হয় এবং ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের বিষয়ে আপত্তি থাকলে তা অভ্যন্তরীণ ফোরামে উত্থাপনের সুযোগ রয়েছে। এই বিধি লঙ্ঘনের অভিযোগেই তিন কর্মকর্তাকে শোকজ করা হয়েছে বলে জানা গেছে।
সূত্র জানায়, সোমবার তাঁদের কারণ দর্শানোর নোটিশ (শোকজ) দিয়ে ১০ দিনের মধ্যে ব্যাখ্যা চাওয়া হয়েছিল। তবে জবাব দেওয়ার সময় শেষ হওয়ার আগেই এই বদলির আদেশ জারি করা হলো।
সেদিনের সংবাদ সম্মেলনে কর্মকর্তারা অভিযোগ করেন, এক্সিম ব্যাংক ও সোশ্যাল ইসলামী ব্যাংককে পাঁচটি ব্যাংকের সঙ্গে একীভূত করার প্রক্রিয়াটি প্রশ্নবিদ্ধ। ‘ব্যাংক রেজল্যুশন অধ্যাদেশ-২০২৫’ এর আওতায় সরকারি মালিকানায় একটি সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংক গঠনের বিষয়টি নিয়েও তাঁরা উদ্বেগ প্রকাশ করেন। এছাড়া মোবাইল আর্থিক সেবাদাতা প্রতিষ্ঠান বিকাশকে তড়িঘড়ি করে ডিজিটাল ব্যাংকের লাইসেন্স দেওয়ার চেষ্টা চলছে বলেও দাবি করা হয়।
সংবাদ সম্মেলনে মাসুম বিল্লাহ বলেন, “প্রতিষ্ঠানের স্বায়ত্তশাসন মানে এই নয় যে প্রতিষ্ঠানের প্রধান একনায়ক বা স্বৈরাচার হয়ে উঠবেন।” নওশাদ মোস্তফা মন্তব্য করেন, ৫ আগস্টের গণঅভ্যুত্থান না ঘটলে হয়তো তাঁরা এতটা খোলামেলা কথা বলতে পারতেন না।
গভর্নর আহসান এইচ মনসুর সংবাদ সম্মেলনের দিনই ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, নির্বাচনের পর একটি পক্ষ ইচ্ছাকৃতভাবে পরিস্থিতি ঘোলাটে করার চেষ্টা করছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদের অভ্যন্তরীণ আলোচ্য বিষয় প্রকাশ্যে আনাকে বড় ধরনের শৃঙ্খলাভঙ্গ হিসেবে দেখছে ব্যাংক কর্তৃপক্ষ।
এদিকে ডিজিটাল ব্যাংকের লাইসেন্স সংক্রান্ত অভিযোগ অস্বীকার করে মুখপাত্রের দপ্তর জানিয়েছে, শুধু বিকাশ নয়, পর্ষদ সভায় আটটি ভিন্ন এজেন্ডা ছিল।
এই ঘটনার প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশ ব্যাংকের ভেতরে অস্থিরতা তৈরি হয়েছে। কর্মকর্তাদের স্বায়ত্তশাসন ও পদোন্নতির দাবিতে নীল, হলুদ ও সবুজ—এই তিন প্যানেলের প্রতিনিধিদের সমন্বয়ে একটি ঐক্য গড়ার চেষ্টা চলছে। এ ঐক্যের সমন্বয়ক হিসেবে নির্বাহী পরিচালক ও বিএফআইইউর ডেপুটি হেড মফিজুর রহমান খান চৌধুরীকে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। তবে ১৬ ফেব্রুয়ারির সংবাদ সম্মেলনে তাঁকে উপস্থিত থাকতে দেখা যায়নি।
স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠানের অভ্যন্তরীণ শৃঙ্খলা এবং কর্মকর্তাদের বাক-স্বাধীনতার এই সংঘাত ব্যাংক খাতের ওপর কোনো নেতিবাচক প্রভাব ফেলে কি না, সেটিই এখন দেখার বিষয়।













