আর্থিক খাতের প্রধান নিয়ন্ত্রক সংস্থা বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর হিসেবে ব্যবসায়ী নিয়োগ নিয়ে যখন দেশজুড়ে তুমুল আলোচনা ও বিতর্ক চলছে, ঠিক তখনই শেয়ারবাজারের নিয়ন্ত্রক সংস্থা বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনও (বিএসইসি) প্রথমবারের মতো কোনো ব্যবসায়ীর হাতে যাওয়ার আলোচনা হালে পানি পাচ্ছে। নিয়ন্ত্রক সংস্থার চেয়ারম্যান হওয়ার দৌড়ে শামিল হয়েছেন ২১ বছর আগের প্রিমিয়ার ব্যাংক আইপিও (প্রাথমিক গণপ্রস্তাব) জালিয়াতি মামলার চার্জশিটভুক্ত আসামি সাইফুল ইসলাম।
তাঁর সক্রিয়তা নীতিনির্ধারক মহলের নৈতিকতা ও আইনি যোগ্যতার এক বড় পরীক্ষা হয়ে দাঁড়িয়েছে। তৈরি হয়েছে এক গভীর বিতর্ক। এই পরিস্থিতিতে ঢাকা স্ট্রিট জার্নালের (ডিএসজে) পক্ষ থেকে সাইফুল ইসলামের কাছে জানতে চাওয়া হয়েছিল, তিনি বিএসইসির চেয়ারম্যান হলে পুঁজিবাজারে কী পরিবর্তন আসবে?
জবাবে সাইফুল ইসলাম বলেন, “পুঁজিবাজারে গ্লোবাল স্ট্যান্ডার্ড যেভাবে কাজ করে আমাদের এখানে সেটা শুরুই হয়নি। ক্যাপিটাল মার্কেটের যে মূল কাজ—ক্যাপিটাল রেইজিং, সেটাও সেভাবে নাই। ব্যক্তিশ্রেণির ছোট ছোট পুঁজিগুলোকে কীভাবে মার্কেটে আনা যায়, তেমন কার্যকরী উদ্যোগও নেই। প্রোডাক্ট ডাইভারসিফিকেশন নাই। মিউচুয়াল ফান্ড শুরুই হয়নি। প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারী বলতে তেমন উল্লেখযোগ্য প্রতিষ্ঠানও নেই। তাই আমাদের পুঁজিবাজারে কাজের অভাব নেই।”
“বিএসইসির ওই পদে যাওয়া নিয়ে যাদের আগ্রহ দেখি, তারা তো ক্যাপিটাল মার্কেটের ফান্ডামেন্টাল কাজ কী—সে সম্পর্কেই কোনো ধারণা দিতে পারেন না। আমি বহু বছর ধরে ক্যাপিটাল মার্কেটের সঙ্গে ইনভলভড, এখন বয়সও হয়ে গেছে। তাই ভাবছিলাম, আমাদের ক্যাপিটাল মার্কেটের জন্য কিছু করা যায় কি না,” যোগ করেন তিনি।
বর্তমানে ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের ব্রোকারেজ হাউস মালিকদের সংগঠন ডিবিএ-এর প্রেসিডেন্ট এবং ব্র্যাক ইপিএল স্টক ব্রোকারেজের পরিচালক এই সাইফুল ইসলাম এখন বিএসইসির নিয়ন্ত্রক হওয়ার জন্য সরকারের নীতিনির্ধারক ও প্রভাবশালী মহলে জোর তদবির চালাচ্ছেন। তবে সংশ্লিষ্ট একাধিক ব্যক্তি ডিএসজে প্রতিবেদককে জানিয়েছেন, তাঁর এই চেষ্টার পেছনে লুকিয়ে আছে তিন দশকের এক কালো অধ্যায়ের ধারাবাহিকতা, যার শিকড় প্রোথিত ১৯৯৬ সালের ভয়াবহ শেয়ার কেলেঙ্কারির গভীরে।
সাইফুল ইসলামের উত্থান ও বিবর্তনের কাহিনী মূলত পেরিগ্রিন ক্যাপিটাল থেকে শুরু হয়ে প্রিমিয়ার ব্যাংকের জালিয়াতি পর্যন্ত বিস্তৃত এক নিরবচ্ছিন্ন পরম্পরা। ২০০৪ সালের ডিসেম্বরে প্রিমিয়ার ব্যাংক ৫৫ কোটি ৭৫ লাখ টাকা সংগ্রহের জন্য আইপিও অনুমোদন পেলে ব্যাংকটির তৎকালীন চেয়ারম্যান ডা. এইচ.বি.এম. ইকবাল এবং সাইফুল ইসলামের ইকুইটি পার্টনার্স সিকিউরিটিজ লিমিটেড মিলে এক ভয়াবহ জালিয়াতির ছক আঁকেন। ওই ঘটনায় বিএসইসির তদন্তে দেখা যায়, ২০০৫ সালের ১৭ জানুয়ারি থেকে ১২ ফেব্রুয়ারি, মাত্র ২৬ দিনের মধ্যে প্রিমিয়ার ব্যাংক ও ইকুইটি পার্টনার্স সিকিউরিটিজ মিলে প্রায় ২৬ হাজার ভুয়া বেনিফিশিয়ারি ওনার্স (বিও) হিসাব খোলে। এজন্য প্রিমিয়ার ব্যাংকের বিভিন্ন শাখায় প্রায় একই পরিমাণের ভুয়া ব্যাংক অ্যাকাউন্টও খোলা হয়েছিল।
এই বিপুল সংখ্যক ভুয়া বিও হিসাব খোলার একমাত্র উদ্দেশ্য ছিল সাধারণ বিনিয়োগকারীদের বঞ্চিত করে আইপিওর সিংহভাগ শেয়ার অবৈধভাবে নিজেদের কবজায় নেওয়া। ডিপোজিটরি আইন, ১৯৯৯ এর ধারা ৫, ১৩ ও ১৫ অনুযায়ী এই জালিয়াতি একটি গুরুতর ফৌজদারি অপরাধ। আইপিও জালিয়াতির এমন ঘটনা বিএসইসির তদন্তে প্রমাণিত হওয়ায় ২০০৫ সালের ৬ অক্টোবর প্রিমিয়ার ব্যাংক ও এর চেয়ারম্যান ডা. এইচ.বি.এম. ইকবাল, ব্যবস্থাপনা পরিচালক এবং ইকুইটি পার্টনার্স সিকিউরিটিজ লিমিটেড ও এর ব্যবস্থাপনা পরিচালক সাইফুল ইসলাম ও নির্বাহী পরিচালক সাইদুর রহমানসহ মোট ৯ ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে জালিয়াতির মামলা করে বিএসইসি।
পরবর্তীতে আসামিরা জামিন নিয়ে মামলাটি বাতিলের (কোয়াশ) আবেদন করলে ২০০৬ সালের ১০ ডিসেম্বর হাইকোর্ট তা মঞ্জুর করেন। এর বিরুদ্ধে কমিশন আপিল বিভাগে গেলে দীর্ঘ আইনি লড়াই শেষে ২০১৮ সালের ২৭ মার্চ আপিল বিভাগ হাইকোর্টের আদেশ বাতিল করে মামলাটি সচল করার নির্দেশ দেন।
২০১৯ সালে কমিশন মামলার বিচার শুরুর আবেদন করলে এক অবিশ্বাস্য তথ্য বেরিয়ে আসে। জানা যায়, উচ্চ আদালতে আপিল বিচারাধীন থাকা অবস্থাতেই ২০১৫ সালের ৪ নভেম্বর সিএমএম আদালতের রেকর্ড রুম থেকে মামলার মূল নথিটি ‘ধ্বংস’ করা হয়েছে। নিয়ম অনুযায়ী বিচারাধীন মামলার নথি ধ্বংস করা সম্পূর্ণ বেআইনি হলেও, নথিপত্র তৃতীয় শ্রেণির মামলা হিসেবে গণ্য করে বিনষ্ট করা হয়।
মামলার নথিটি অনিয়মিতভাবে ধ্বংস করায় ২০২১ সালে বিএসইসি পুনরায় সিএমএম আদালতে নথি পুনর্গঠনের আবেদন জানায়। কমিশনের অতিরিক্ত পরিচালক মুহাম্মদ জিয়াউর রহমান বাদী হয়ে আগের ২৯০৯/২০০৫ নম্বর মামলার ধারাবাহিকতায় নতুন করে কগনিজেন্স গ্রহণ ও আসামিদের বিরুদ্ধে বিচার কার্যক্রম শুরুর নিবেদন জানান। বর্তমানে এই পুনর্গঠিত নথির ভিত্তিতেই মামলাটি সচল করার আইনি প্রক্রিয়া চলমান। যার অর্থ সাইফুল ইসলাম আজও একজন সক্রিয় আসামি। এই জালিয়াতি মামলার আসামি এবং একজন ব্রোকার মালিক হিসেবে বিএসইসির চেয়ারম্যান পদে সাইফুল ইসলামের লবিং নৈতিকতা ও আইনি শাসনের চরম অবমাননা।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে বিএসইসির কর্মকর্তারা জানান, এই নিয়ন্ত্রক সংস্থাটি আধা-বিচার বিভাগীয় প্রতিষ্ঠান, যার প্রধানের কাজ হলো পুঁজিবাজারে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা। কিন্তু সাইফুল ইসলামের পুরো কর্মজীবন পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, ১৯৯৬-এর পেরিগ্রিন কেলেঙ্কারি এবং ২০০৫-এর প্রিমিয়ার ব্যাংক জালিয়াতি—উভয় ক্ষেত্রেই তাঁর অপারেশনাল ভূমিকা ছিল প্রধান। রুনা আলমের সাথে তাঁর দীর্ঘদিনের ব্যবসায়িক পার্টনারশিপ এবং পরবর্তী সময়ে ইকুইটি পার্টনার্সকে ব্র্যাক ব্যাংকের সাথে মার্জ করিয়ে ‘ব্র্যাক ইপিএল স্টক ব্রোকারেজ’ নাম দিয়ে কর্পোরেট তকমা লাগানো মূলত পুরনো জালিয়াতির দাগ ঢাকার এক চতুর কৌশল মাত্র।
জানতে চাইলে বিএসইসির মুখপাত্র মোহাম্মদ আবুল কালাম ডিএসজে প্রতিবেদককে বলেন, “২০০৫ সালে মামলাটি দায়েরের পর আসামি পক্ষের আবেদনের প্রেক্ষিতে হাইকোর্টের আদেশে মামলাটি বাতিল হয়ে যায়। বিএসইসি হাইকোর্টের আদেশ চ্যালেঞ্জ করে আপিল করলে ২০১৮ সালে আপিল বিভাগে তা গৃহীত হয়। এরপর সিএমএম আদালতে মামলাটি শুনানির আবেদন জানানো হলেও পরবর্তীতে মামলাটি পুঁজিবাজার স্পেশাল ট্রাইব্যুনালে স্থানান্তর করা হয়। তবে আসামি পক্ষ পুনরায় চ্যালেঞ্জ জানিয়ে হাইকোর্টে আবেদন জানালে মামলাটির কার্যক্রম স্থগিত হয়ে যায়।”
আবুল কালাম আরও বলেন, “এখন উচ্চ আদালতের স্থগিতাদেশ প্রত্যাহারে বিশিষ্ট আইনজীবী ড. শাহদীন মালিককে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। হাইকোর্টের স্থগিতাদেশ প্রত্যাহার হলে পুঁজিবাজার সম্পর্কিত বিশেষ ট্রাইব্যুনালে মামলাটির শুনানি শুরু হবে।” জালিয়াতির এই মামলাটি এখনো সচল বলেও উল্লেখ করেন বিএসইসি মুখপাত্র।
প্রিমিয়ার ব্যাংকের আইপিও জালিয়াতির এই মামলাটি বিএসইসির চেয়ারম্যান পদে নিয়োগের ক্ষেত্রে কোনো বাধা হয়ে দাঁড়াতে পারে কি না, এমন প্রশ্নে সাইফুল ইসলাম ডিএসজে প্রতিবেদককে বলেন, “মামলাটির তো এখনো পর্যন্ত চার্জ ফ্রেমই হয়নি। দোষী সাব্যস্ত হওয়ার বিষয়টি তো অনেক পরের বিষয়। মামলাটি হাইকোর্টে বাতিল হয়ে গিয়েছিল। অনেক পরে যখন আপিল বিভাগে আপিল শুনানি হয়, তখন তো আমরা কেউ ছিলাম না। এখন তো আবার সেটি স্থগিত হয়ে আছে।”
“আসলে, গভর্নর নিয়োগের পর বিভিন্ন মাধ্যমে যে ধরনের রিঅ্যাকশন দেখছি, তাতে করে বিএসইসির চেয়ারম্যান পদে আমার আর কোনো ইন্টারেস্ট নাই,” যোগ করেন তিনি।
বেসরকারি গবেষণাপ্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) গবেষণা পরিচালক খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম শনিবার (২৮ ফেব্রুয়ারি) বলেছেন, “বর্তমান সরকার গভর্নর নিয়োগের ক্ষেত্রে একটি দুর্বল পদক্ষেপ নিয়েছে। একই সঙ্গে প্রক্রিয়াটি অস্বচ্ছ ছিল। সরকার রাজনৈতিক বিবেচনায় গভর্নর নিয়োগ দিতে চাইলে এর চেয়ে আরও ভালো নিয়োগ দিতে পারত।”
তার আগে নতুন গভর্নর নিয়োগ নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি)। সংস্থাটি বলেছে, কর্পোরেট স্বার্থ ও স্বার্থের দ্বন্দ্বের ঊর্ধ্বে থেকে নবনিযুক্ত গভর্নর কতটা স্বাধীনভাবে দায়িত্ব পালন করতে পারবেন তা নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন তৈরি হয়েছে।
উল্লেখ্য, নতুন গভর্নর নিয়োগ নিয়ে দেশের ভেতরেই বড় ধরনের চমক দিয়েছে নতুন বিএনপি সরকার। নতুন গভর্নর মোস্তাকুর রহমান পোশাক ও রিয়েল এস্টেট খাতের একজন ব্যবসায়ী। এর আগে বাংলাদেশে কখনোই কোনো ব্যবসায়ীকে গভর্নর পদে নিয়োগ দেওয়া হয়নি। তবে আইন বা নীতিমালা অনুযায়ী একজন ব্যবসায়ীকে গভর্নর নিয়োগে কোনো বাধা নেই।
আলোচিত সেই আইপিও জালিয়াতি
এই সাইফুল ইসলাম সম্পর্কে সবিস্তারে জানার চেষ্টা করেছে ডিএসজে। অনুসন্ধানে প্রকাশ, ২০০৪ সালের ডিসেম্বরে আইপিও অনুমোদন পাওয়ার পর থেকেই প্রিমিয়ার ব্যাংক জালিয়াতির উদ্দেশ্যে প্রায় ২৬ হাজার ভুয়া বিও হিসাব খোলে। এর মধ্যে ১৫ হাজার হিসাব খোলা হয়েছিল চট্টগ্রামের আসাদগঞ্জে এস. আলম গ্রুপের প্রধান কার্যালয়ের ঠিকানা ব্যবহার করে।
সরেজমিন তদন্তে এস. আলম গ্রুপ কর্তৃপক্ষ বিএসইসিকে লিখিতভাবে জানায় যে, এমন কর্মকাণ্ডের সঙ্গে তাদের কোনো সংশ্লিষ্টতা নেই। এমনকি তাদের ২১১৯নং, আসাদগঞ্জ, চট্টগ্রাম ঠিকানা ব্যবহার করে যেসকল বিও হিসাব প্রিমিয়ার ব্যাংকের বিভিন্ন শাখায় বিভিন্ন নামে খোলা হয়েছে—সে বিষয়ে তাদের জানা নাই। চিঠিতে এস. আলম গ্রুপ আরও জানায় যে, বর্ণিত ঠিকানায় ১৬০-১৭০ জন কর্মকর্তা-কর্মচারী কর্মরত আছেন।
বিএসইসির তদন্ত দল এরপর ৬৭১/১ শোলকবাহার, বহদ্দারহাট, চট্টগ্রামে গিয়ে লেগুন ক্লোদিং লিমিটেড নামের একটি কারখানা দেখতে পায়, যার ঠিকানা ব্যবহার করে ৭৮টি বিও হিসাব খোলা হয়। বিও হিসাবধারীদের বিষয়ে তদন্ত দল জানতে চাইলে, লেগুন ক্লোদিংয়ের পরিচালক (প্রোডাকশন) কুমকুম সেনসহ চার জন কর্মকর্তা লিখিতভাবে জানায় যে, উল্লিখিত বিও হিসাবধারীদের তারা চেনেন না এবং এই ঠিকানায় থাকেন না।
একইভাবে আসকারাবাদ, আগ্রাবাদ, মেহের সুপার মার্কেট ও বাড্ডার বেরাইদে গিয়েও বিও হিসাবধারীদের কাউকেই পায়নি বিএসইসির তদন্ত দল। তদন্তে বেরিয়ে আসে, প্রিমিয়ার ব্যাংকের তৎকালীন চেয়ারম্যান ডা. এইচ.বি.এম. ইকবাল এবং এমডি কাজী আব্দুল মজিদের প্রত্যক্ষ নির্দেশে এই জালিয়াতি সংগঠিত হয়।
বনানী শাখার ব্যবস্থাপক সৈয়দ নওশের আলী অন্যান্য শাখা ব্যবস্থাপকদের ওপর প্রচণ্ড চাপ সৃষ্টি করে হাজার হাজার ভুয়া ব্যাংক অ্যাকাউন্ট নম্বর সংগ্রহ করেন। মতিঝিল শাখার ব্যবস্থাপক দেওয়ান আনোয়ারুল লতিফ লিখিত জবানবন্দিতে জানান, এমডি তাকে সরাসরি ফোন করে সঞ্চয়ী হিসাব নম্বর বরাদ্দ দিতে বলেন এবং জানান যে, এই নম্বরগুলো খোদ চেয়ারম্যান ব্যবহার করবেন। রাজি না হলে কর্মকর্তাদের চাকরিচ্যুতির হুমকিও দেওয়া হয়েছিল।
এই জালিয়াতি প্রক্রিয়ার অন্যতম কেন্দ্রবিন্দু ছিল সাইফুল ইসলামের মালিকানাধীন প্রতিষ্ঠান ‘ইকুইটি পার্টনার্স সিকিউরিটিজ লিমিটেড’। সিডিবিএলের রেকর্ড অনুযায়ী, প্রতিষ্ঠানটি ২০০৪ সালের ডিসেম্বর থেকে ২০০৫ সালের ফেব্রুয়ারির মধ্যে প্রায় ৮ হাজার ভুয়া বিও হিসাব খোলে।
তদন্ত কর্মকর্তারা পরিদর্শনে গিয়ে ব্যবস্থাপনা পরিচালক সাইফুল ইসলাম ও নির্বাহী পরিচালক সাইদুর রহমানের জিম্মায় অসংখ্য অসম্পূর্ণ ও ছবিবিহীন ফরম খুঁজে পান। প্রমাণিত হয় যে, সাইফুল ইসলাম ও তাঁর সহযোগীরা ব্যাংকের চেয়ারম্যান ও এমডির সাথে যোগসাজশে এই ভুয়া অ্যাকাউন্টগুলো পরিচালনা ও তদারকি করেছেন।
তদন্তে দেখা যায়, ভুয়া বিও ও ব্যাংক অ্যাকাউন্ট খোলার পেছনে যারা ‘পরিচয়দানকারী’ ছিলেন, তারা মূলত ডা. ইকবালের একান্ত সচিব, রাজনৈতিক সচিব, কাজিন কিংবা নিকটাত্মীয়। জালিয়াতির ফরমগুলো পূরণের জন্য ডা. ইকবালের ব্যক্তিগত প্রতিষ্ঠান ‘কনসার্ন ইন্টারন্যাশনাল’-এর অফিস ব্যবহার করা হয়েছিল।
কারসাজির এক নিরবচ্ছিন্ন পরম্পরা
১৯৯০-এর দশকের মাঝামাঝি সময়ে হংকংভিত্তিক বিনিয়োগ ব্যাংক পেরিগ্রিন ক্যাপিটাল যখন বাংলাদেশে কার্যক্রম শুরু করে, তখন এর নেপথ্যে ছিলেন প্রভাবশালী বিনিয়োগকারী রুনা আলম। আর সেই পেরিগ্রিন বাংলাদেশের ‘হেড অব অপারেশনস’ হিসেবে রুনা আলমের সবচেয়ে বিশ্বস্ত ও ঘনিষ্ঠ সহযোগী ছিলেন এই সাইফুল ইসলাম।
১৯৯৬ সালের পুঁজিবাজার কেলেঙ্কারির তদন্তে গঠিত কমিটির প্রতিবেদনে পেরিগ্রিন ক্যাপিটাল এবং সেখানে কর্মরত কর্মকর্তাদের সন্দেহজনক ট্রেডিং কার্যক্রম নিয়ে অত্যন্ত কঠোর পর্যবেক্ষণ ছিল। হেড অব অপারেশনস হিসেবে সাইফুল ইসলাম সেই সময়ে বিদেশি বিনিয়োগের ধোঁয়াশা তৈরি করে কৃত্রিম চাহিদা সৃষ্টির মাধ্যমে বাজার অস্থিতিশীল করার নেপথ্য কারিগর ছিলেন বলে অভিযোগ উঠে। তবে বিদেশিদের চাপে পেরিগ্রিনের বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নেওয়া যায়নি। ওই কেলেঙ্কারির পর পেরিগ্রিন বাংলাদেশের কার্যক্রম বন্ধ হয়ে যায়।
পেরিগ্রিন বন্ধ হওয়ার পর রুনা আলম ও সাইফুল ইসলাম মিলে ‘ইকুইটি পার্টনার্স’ নামক প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলেন, যেটির অধীনে ইকুইটি পার্টনার্স লিমিটেড নামে একটি মার্চেন্ট ব্যাংক ও ইকুইটি পার্টনার্স সিকিউরিটিজ লিমিটেড নামে একটি ব্রোকারেজ হাউস প্রতিষ্ঠিত হয়। ইকুইটি পার্টনার্স মূলত পেরিগ্রিনের পুরনো কৌশলেরই নতুন নাম ছিল। এই প্রতিষ্ঠানের সূত্র ধরেই পরবর্তীতে ২০০৫ সালের সেই প্রিমিয়ার ব্যাংকের আইপিও জালিয়াতি ঘটে।
২০০৯ সালে ব্র্যাক ব্যাংক ইকুইটি পার্টনার্স লিমিটেড ও ইকুইটি পার্টনার্স সিকিউরিটিজ লিমিটেড অধিগ্রহণ করে। দুই দফায় ২০১১ সালের মধ্যে ইকুইটি পার্টনার্স সিকিউরিটিজ লিমিটেডের ৯০ শতাংশ শেয়ার অধিগ্রহণ করে। প্রতিষ্ঠানটির নতুন নামকরণ হয় ব্র্যাক ইপিএল স্টক ব্রোকারেজ লিমিটেড। আর ইকুইটি পার্টনার্স লিমিটেডের নাম হয় ব্র্যাক ইপিএল ইনভেস্টমেন্টস লিমিটেড।













