কৃষিপণ্যের বাজারে অস্থিরতার মূল কারণ কী?

ছবি: ডিএসজে আর্কাইভ
ছবি: ডিএসজে আর্কাইভ

বাংলাদেশের কৃষিপণ্যের বাজারে দাম বাড়ার পেছনে মধ্যস্বত্বভোগী, সংরক্ষণ ব্যবস্থার দুর্বলতা এবং বাজার ব্যবস্থাপনার অদক্ষতাই প্রধান কারণ—এমন তথ্য উঠে এসেছে বাংলাদেশ ব্যাংকের একটি গবেষণায়।

‘বাংলাদেশে কৃষিপণ্যের মূল্য শৃঙ্খলের দক্ষতা’ শীর্ষক এই গবেষণায় চাল, আলু, পেঁয়াজ, ব্রয়লার মুরগি ও ডিম—এই পাঁচটি কৃষিপণ্যের খামার বা উৎপাদন পর্যায় থেকে শুরু করে খুচরা বাজার পর্যন্ত মূল্য শৃঙ্খল বিশ্লেষণ করা হয়েছে।

ঢাকায় এক সংবাদ সম্মেলনে বুধবার (২১ জানুয়ারি) গবেষণা দলের প্রধান ও কেন্দ্রীয় ব্যাংকের গবেষণা বিভাগের পরিচালক সেলিম আল মামুন বিষয়টি উপস্থাপন করেন।

চাল ও ধানের বাজার
গবেষণায় চালকে মোটা ও চিকন—এই দুই ভাগে বিশ্লেষণ করা হয়েছে। বোরো মৌসুমের ধান জানুয়ারি থেকে জুন পর্যন্ত চাষ হয় এবং এপ্রিলের মাঝামাঝি থেকে জুনের শেষ পর্যন্ত ধান কাটা হয়। জরিপ অনুযায়ী, কৃষকের প্রতি মণ ধান উৎপাদনে গড় খরচ হয় ৮৭২ টাকা। কৃষকরা প্রতি মণ ধান ১,১২৫ থেকে ১,৪৫০ টাকায় বিক্রি করে গড়ে ৫৮৭ টাকা মুনাফা পান।

তবে ধান কৃষক থেকে সরাসরি ভোক্তার কাছে পৌঁছায় না। ফড়িয়া, আড়তদার, মিলার, পাইকারি ও খুচরা বিক্রেতা—এই একাধিক ধাপ পেরিয়ে চাল বাজারে আসে। প্রতি কেজি চালের দাম কৃষক পর্যায়ে যেখানে প্রায় ৫০ টাকা, সেখানে খুচরা পর্যায়ে তা বেড়ে দাঁড়ায় গড়ে ৫৮ টাকা ৫০ পয়সা। মিলাররা চাল বিক্রির পাশাপাশি তুষ ও কুঁড়া বিক্রি করে প্রতি মণে অতিরিক্ত ১০৬ টাকা আয় করেন।

আলু ও হিমাগার ব্যবস্থা
আলুর ক্ষেত্রে দাম বৃদ্ধির বড় কারণ হিসেবে হিমাগার বা কোল্ড স্টোরেজ ব্যবস্থাকে চিহ্নিত করেছে গবেষণা। কৃষক পর্যায়ে প্রতি কেজি আলু উৎপাদনে খরচ হয় গড়ে ১০ টাকা ৬৩ পয়সা। কৃষকরা আলু বিক্রি করেন গড়ে ১৮ টাকা ৪৪ পয়সায়। তবে হিমাগার থেকে বের হওয়ার সময় আলুর দাম দাঁড়ায় কেজি প্রতি প্রায় ২৮ টাকা ৮০ পয়সা, যা খুচরা পর্যায়ে গিয়ে বেড়ে হয় ৪৫ টাকা ৮০ পয়সা।

গবেষণায় বলা হয়েছে, কোল্ড স্টোরেজ গেট থেকে খুচরা বাজার পর্যন্ত বিভিন্ন মধ্যস্বত্বভোগীর উচ্চ মুনাফার প্রবণতাই আলুর দাম অস্বাভাবিকভাবে বাড়িয়ে দেয়। পাশাপাশি প্রতি কেজিতে ৬ টাকা ৭৫ পয়সা হিমাগার ভাড়াও দামের ওপর চাপ সৃষ্টি করছে।

পেঁয়াজের সংকট ও সংরক্ষণ
পেঁয়াজ পচনশীল হওয়ায় এবং পর্যাপ্ত সংরক্ষণ সুবিধা না থাকায় বাজারে অস্থিরতা বেশি দেখা যায়। কৃষকের প্রতি কেজি পেঁয়াজ উৎপাদনে গড় খরচ ১৯ টাকা ২৪ পয়সা হলেও বিক্রয়মূল্য প্রায় ৪৬ টাকা ৯৪ পয়সা। কিন্তু সংরক্ষণের অভাবে বাড়িতে দীর্ঘদিন রাখলে প্রতি মণে প্রায় ১২ কেজি ওজন কমে যায়।

এর ফলে অক্টোবর থেকে ডিসেম্বর সময়ে বাজারে সংকট তৈরি হয় এবং দাম কেজি প্রতি ৬০ থেকে ১০০ টাকা পর্যন্ত উঠতে পারে। গবেষণায় উল্লেখ করা হয়েছে, পেঁয়াজের বাজারে কোনো সিন্ডিকেটের প্রমাণ পাওয়া যায়নি; বরং চাহিদা-সরবরাহের স্বাভাবিক নিয়ম ও সংরক্ষণ ঘাটতিই মূল কারণ।

মুরগি ও ডিম উৎপাদন
গবেষণায় দেখা গেছে, ব্রয়লার মুরগি উৎপাদনে প্রতি কেজিতে খামারির গড় খরচ ১৬৩ টাকা ৫৩ পয়সা হলেও বিক্রয়মূল্য মাত্র ১৭২ টাকা ১৮ পয়সা। অনেক সময় খামারিরা লোকসানের মুখে পড়েন, অথচ পাইকারি ও খুচরা পর্যায়ে মুনাফা তুলনামূলক বেশি থাকে।

ডিমের ক্ষেত্রেও একই চিত্র দেখা যায়। একটি ডিম উৎপাদনে খরচ ৯ টাকা ৪৭ পয়সা হলেও খামারিরা সামান্য লাভ পান। গবেষণায় বলা হয়েছে, ডিম ও মুরগির মোট উৎপাদন খরচের ৭০ থেকে ৮৫ শতাংশই ব্যয় হয় খাবারের (ফিড) পেছনে, যা ক্ষুদ্র খামারিদের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ।

গবেষকদের সুপারিশ
গবেষণা দল কৃষিপণ্যের বাজার স্থিতিশীল রাখতে উন্নত রেফ্রিজারেশন ব্যবস্থা, হিমাগার ভাড়া যৌক্তিক করা, নগদ সহায়তা কার্যকর বাস্তবায়ন, ফিডের দাম মনিটরিং এবং কন্ট্রাক্ট ফার্মিং চালুর সুপারিশ করেছে। পাশাপাশি পেঁয়াজ ও আলুর সংরক্ষণে আধুনিক ‘এয়ারফ্লো’ প্রযুক্তি সম্প্রসারণের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের ডেপুটি গভর্নর ড. হাবিবুর রহমানের নির্দেশনায় পরিচালিত এই গবেষণা দুটি ধাপে সম্পন্ন হয়। প্রথম ধাপ চলে ২০২৫ সালের ৫ থেকে ১৬ জানুয়ারি এবং দ্বিতীয় ধাপ ১৫ জুন থেকে ২৭ জুলাই পর্যন্ত।

মাঠপর্যায়ের জরিপের ভিত্তিতে প্রস্তুত এই গবেষণা প্রতিবেদনটি আগস্ট মাসে চূড়ান্ত করা হয়। তবে উল্লেখ্য যে, গবেষণার ফলাফল গবেষক দলের নিজস্ব পর্যবেক্ষণের ওপর ভিত্তি করে তৈরি এবং এটি বাংলাদেশ ব্যাংকের আনুষ্ঠানিক নীতিগত অবস্থান নয়।

গবেষণাটি দেশের ১৮টি জেলার ১০০টি উপজেলায় পরিচালিত হয়। পণ্যের উৎপাদন ঘনত্বের ভিত্তিতে জেলা নির্বাচন করা হয় এবং ‘পারপাসিভ র‍্যান্ডম স্যাম্পলিং’ পদ্ধতিতে ৪২৬ জন উত্তরদাতার কাছ থেকে তথ্য সংগ্রহ করা হয়।

Share this article

আপনারা চাইলে কাস্টম বিজ্ঞাপন এইখানে দিতে পারেন
বিজ্ঞাপনের ছবি বা ভিডিও সাইজ ৩৩৬x২৮০ পিক্সাল হতে হবে

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Scroll to Top