এপস্টেইন ফাইলে নাম আসায় দুবাইভিত্তিক লজিস্টিকস গ্রুপ ডিপি ওয়ার্ল্ডের প্রধান সুলতান আহমেদ বিন সুলাইয়েম পদত্যাগ করেছেন।
যৌন অপরাধী জেফ্রি এপস্টেইনের সঙ্গে তার সম্পর্কের বিষয়টি প্রকাশ্যে আসার পর থেকেই কোম্পানির পদ ছাড়ার ব্যাপারে তার ওপর চাপ বাড়ছিল বলে জানিয়েছে ব্লুমবার্গ।
সুলতান আহমেদ বিন সুলাইয়েম ছিলেন ডিপি ওয়ার্ল্ডের চেয়ারম্যান ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও)।
দুই সপ্তাহ আগে যুক্তরাষ্ট্রের বিচার বিভাগ এপস্টেইন ফাইলের ৩০ লাখের বেশি নথি ও ইমেইল প্রকাশ করে। সেখানেই সুলাইয়েমের সঙ্গে এপস্টেইনের ঘনিষ্ঠতার বিষয়টি সামনে আসে। উভয়ের মধ্যে ইমেইলে যৌন অভিজ্ঞতা সম্পর্কিত কথাবার্তা ছিল, যা মূলত বিতর্কের কারণ।
ব্লুমবার্গ জানিয়েছে, আন্তর্জাতিক বিভিন্ন সংস্থার চাপ ও কোম্পানির ভাবমূর্তি রক্ষায় সুলাইয়েম নিজেই পদত্যাগ করেছেন।
সংযুক্ত আরব আমিরাতের সরকার গতকাল শুক্রবার এক বিবৃতিতে সুলাইয়েমের নাম উল্লেখ না করেই বলা হয়, ইসা কাজিমকে ডিপি ওয়ার্ল্ডের পরিচালনা পর্ষদের চেয়ারম্যান ও যুবরাজ নারায়ণকে প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে।
কোম্পানিটির দুটি বৃহত্তম আন্তর্জাতিক অংশীদার; কানাডার লা ক্যাইস পেনশন ফান্ড ও যুক্তরাজ্যের উন্নয়ন অর্থায়ন সংস্থা ব্রিটিশ ইন্টারন্যাশনাল ইনভেস্টমেন্ট (বিআইআই) জানায় যে তারা ডিপি ওয়ার্ল্ডের সঙ্গে ভবিষ্যতের চুক্তি স্থগিত রাখবে।
বিআইআই আরও জানায়, “কোম্পানির পক্ষ থেকে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণ না করা পর্যন্ত” এই স্থগিতাদেশ বহাল থাকবে।
তবে শুক্রবার বিআইআই জানায়, “ডিপি ওয়ার্ল্ডের আজকের সিদ্ধান্তকে আমরা স্বাগত জানাই। আমরা আমাদের অংশীদারিত্ব পুনরায় শুরু করার অপেক্ষায় আছি।”
লা ক্যাইস জানায়, “ডিপি ওয়ার্ল্ড উপযুক্ত ব্যবস্থা নিয়েছে। কোম্পানি ডিপি ওয়ার্ল্ড ও ব্যক্তি সুলতান আহমেদ বিন সুলাইয়েম; এই দুইকে আলাদা করে দেখা সবসময়ই গুরুত্বপূর্ণ ছিল। আমরা দ্রুত ডিপি ওয়ার্ল্ডের নতুন নেতৃত্বের সঙ্গে কাজ শুরু করব, যাতে বন্দর প্রকল্পে আমাদের অংশীদারিত্ব অব্যাহত রাখা যায়।”
দুবাইয়ের শাসক পরিবারের তত্ত্বাবধানে পরিচালিত হয় ডিপি ওয়ার্ল্ড। ফাইন্যান্সিয়াল টাইমস প্রথমবার সুলাইয়েমের সঙ্গে অর্থলগ্নিকারী ও নারী পাচারকারী এপস্টেইনের যোগাযোগের বিষয়টি প্রথম প্রকাশ করে। এরপর থেকেই বিষয়টি নিয়ে কোনো মন্তব্য করতে চায়নি দুবাইয়ের শাসক পরিবার।
যুক্তরাষ্ট্রের বিচার বিভাগের নথিতে দুই ব্যক্তির যৌন অভিজ্ঞতা নিয়ে বার্তা বিনিময় এবং এপস্টেইনের “ব্যক্তিগত স্পা” থেকে একজন “ম্যাসিউজ” এর প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করতে সুলাইয়েমের ভূমিকার বিস্তারিত বিবরণ রয়েছে।
বার্তাগুলো থেকে ধারণা পাওয়া যায়, তারা যেসব ব্যক্তির সঙ্গে সম্পর্ক ছিল, তাদের নিয়ে আলোচনা করার সময় ছবি আদান-প্রদান করেছেন। পাশাপাশি বিভিন্ন শহরে এসকর্ট ও ম্যাসাজ সেবার তালিকাও ভাগাভাগি করেছেন।
২০০৮ সালে অপ্রাপ্তবয়স্ক এক ব্যক্তির কাছ থেকে যৌন সেবা নেওয়ার অপরাধে কারাদণ্ড ভোগ করার পরও এপস্টেইনের সঙ্গে সুলাইয়েমের সম্পর্ক দীর্ঘ সময় ধরে অব্যাহত ছিল।
তবে ডিপি ওয়ার্ল্ডের ঘনিষ্ঠ ব্যক্তিরা জানান, রাষ্ট্র-সমর্থিত তাদের অন্যতম প্রধান আন্তর্জাতিক উদ্যোগ থেকে ব্যবসায়িক অংশীদারদের সরে যাওয়ার আশঙ্কাই সম্ভবত শাসক পরিবারকে পদক্ষেপ নিতে বাধ্য করেছে।
নেইল কুইলিয়াম হলেন চ্যাথাম হাউজের মধ্যপ্রাচ্য ও উত্তর আফ্রিকা কর্মসূচির অ্যাসোসিয়েট ফেলো। তিনি বলেন, এ ধরনের পদত্যাগ “অত্যন্ত অস্বাভাবিক”।
তিনি আরও বলেন, “সংযুক্ত আরব আমিরাতের ঝুঁকি সহনশীলতা অনেক বেশি। কিন্তু ডিপি ওয়ার্ল্ডের ক্ষেত্রে, কারণ বাণিজ্যিকভাবে এটি দেশের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এবং এটি রাষ্ট্রের প্রধান কাঠামোর অংশ। সুনাম রক্ষার জন্য তাৎক্ষণিকভাবে এই পদক্ষেপ নেওয়া ছাড়া উপায় ছিল না।”
ডিপি ওয়ার্ল্ডের বাংলাদেশের সঙ্গে চট্টগ্রাম বন্দরের নিউমুরিং কনটেইনার টার্মিনালের ইজারা সংক্রান্ত চুক্তি হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু শেষমেষ তা হয়নি। কোম্পানিটি বাংলাদেশের সরকারের কাছে চুক্তির খসড়াটি আরও পুনর্মূল্যায়ন (রিভিউ) করার জন্য কিছু সময় চায়।
ডিপি ওয়ার্ল্ডের সঙ্গে চট্টগ্রাম বন্দর ইজারা নিয়ে ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগ সরকারের আমল থেকেই আলোচনা চলছিল। ছাত্র জনতার আন্দোলনের পর দায়িত্ব নেওয়া অন্তর্বর্তী সরকারের সময়েও সেই আলোচনা চুক্তি অবধি গড়ায়। কিন্তু বাঁধ সাধে চট্টগ্রাম বন্দরের শ্রমিক কর্মচারীরা।
গত ৩১ জানুয়ারি থেকে প্রথমে তিন দিন আট ঘণ্টা করে কর্মবিরতি পালন করে তারা। এরপর শুরু হয় লাগাতার কর্মসূচি। নৌপরিবহন উপদেষ্টা সঙ্গে বৈঠকের পর দুই দিনের জন্য কর্মসূচি স্থগিত করা হয় কিছু শর্তের মাধ্যমে। দুই দিন পরে ফের আন্দোলন শুরু হয়। তখন দেশের শীর্ষস্থানীয় ব্যবসায়িরা সরকার বরাবর চিঠিও দেয় চট্টগ্রাম বন্দর নিয়ে দ্রুত সিদ্ধান্তে গ্রহণের জন্য। এক পরায়ে সরকারের পক্ষ থেকে জানানো হয়, চুক্তি হচ্ছে না।
সুলাইয়েম দুবাইয়ের অন্যতম জ্যেষ্ঠ ব্যবসায়িক ব্যক্তিত্ব ছিলেন। চার দশকের বেশি সময় ধরে তিনি ডিপি ওয়ার্ল্ডকে আমিরাতের জেবেল আলি বন্দরের অপারেটর থেকে বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ লজিস্টিকস কোম্পানিতে রূপান্তর করেন।
কোম্পানিটির উত্থান অনেকাংশে দুবাইয়ের নিজস্ব বিকাশের প্রতিচ্ছবি। একটি ছোট উপসাগরীয় রাষ্ট্র থেকে বৈশ্বিক বাণিজ্যের কেন্দ্রে পরিণত হওয়া।
গ্রুপটির কানাডায় ছয়টি বন্দর রয়েছে। পাশাপাশি লন্ডন গেটওয়ে লজিস্টিকস হাব এবং এশিয়া থেকে লাতিন আমেরিকা পর্যন্ত বিস্তৃত অবকাঠামো প্রকল্প রয়েছে।
ডিপি ওয়ার্ল্ড বিশ্বব্যাপী নিজেদের ব্র্যান্ড শক্তিশালী করতে উল্লেখযোগ্য প্রচেষ্টা চালিয়েছে। তারা গলফের ইউরোপীয় ট্যুর স্পনসর করেছে এবং ক্রিকেট ও ফর্মুলা ১–এর বিভিন্ন উদ্যোগেও সম্পৃক্ত হয়েছে।
ডিপি ওয়ার্ল্ড জানিয়েছে, নতুন চেয়ারম্যান কাজিম “আর্থিক ও অর্থনৈতিক বিষয়ে ব্যাপক অভিজ্ঞতা” নিয়ে আসবেন। তিনি বর্তমানে বোর্স দুবাইয়ের চেয়ারম্যান এবং দুবাই ইন্টারন্যাশনাল ফাইন্যান্সিয়াল সেন্টারের গভর্নর হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন।
নতুন প্রধান নির্বাহী যুবরাজ নারায়ণ আগে কোম্পানির প্রধান আর্থিক কর্মকর্তা ছিলেন। এমনকি সুলাইয়েমের ডেপুটি হিসেবেও কাজ করেছেন।











