এপ্রিলেও বাড়ছে না তেলের দাম, বিদ্যুৎ বাঁচাতে ‘মাস্টারপ্ল্যান’

ছবি: শরীফ খিয়াম আহমেদ/ঢাকা স্ট্রিট জার্নাল
ছবি: শরীফ খিয়াম আহমেদ/ঢাকা স্ট্রিট জার্নাল

বিশ্ববাজারে তেলের আকাশছোঁয়া দাম আর দেশের সাধারণ মানুষের নাভিশ্বাস—এই দুইয়ের সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে এক কঠিন ভারসাম্য রক্ষার লড়াই চালাচ্ছে বাংলাদেশ সরকার। এই লড়াইয়ের মূল অভীষ্ট একটাই: যেকোনো মূল্যে জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং জনগণের কাঁধ থেকে বাড়তি ব্যয়ের বোঝা নামিয়ে রাখা। মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধাবস্থা ও বৈশ্বিক সরবরাহ ব্যবস্থার চরম অস্থিরতার মাঝে অভ্যন্তরীণ বাজার স্থিতিশীল রাখতে এবার একযোগে বড় ধরনের প্রশাসনিক ও নীতিনির্ধারণী রণকৌশল নিয়েছে সরকার।

গত কয়েক সপ্তাহ ধরে সচিবালয় থেকে জাতীয় সংসদ—সবখানেই আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে ছিল জ্বালানি সংকট ও জনজীবনে এর সম্ভাব্য অভিঘাত। এরই ধারাবাহিকতায় মঙ্গলবার (৩১ মার্চ) সরকার একদিকে যেমন তেলের দাম না বাড়ানোর সাহসী সিদ্ধান্ত নিয়েছে, অন্যদিকে নিরবচ্ছিন্ন সরবরাহ নিশ্চিতে বিপুল পরিমাণ আমদানির পাশাপাশি অবৈধ মজুতদারদের বিরুদ্ধে শুরু করেছে দেশব্যাপী চিরুনি অভিযান।

একই সাথে বিদ্যুৎ সাশ্রয়ের লক্ষ্যে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও দাপ্তরিক কর্মঘণ্টায় আমূল পরিবর্তনের এক মহাপরিকল্পনা চূড়ান্ত করা হচ্ছে।

স্থিতিশীল বাজারদর ও বিশাল ভর্তুকির চ্যালেঞ্জ

আগামী মাসে জ্বালানি তেলের কেমন হবে, তা নিয়ে গত কয়েক দিন ধরেই জনমনে এক ধরনের উদ্বেগ ছিল। এপ্রিল মাসের জন্য দেশের বাজারে জ্বালানি তেলের মূল্য অপরিবর্তিত রাখার সিদ্ধান্তের মধ্য দিয়ে সাধারণ মানুষের মাঝে স্বস্তি ফিরেছে। মঙ্গলবার জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগের এক প্রজ্ঞাপনে জানানো হয়, বুধবার (১ এপ্রিল) থেকে ডিজেল ১০০ টাকা, কেরোসিন ১১২ টাকা, অকটেন ১২০ টাকা এবং পেট্রোল ১১৬ টাকা দরেই বিক্রি হবে।

তবে এই স্থিতিশীলতার পেছনে সরকারকে বহন করতে হচ্ছে বিশাল এক আর্থিক বোঝা। আগের দিন (৩০ মার্চ) জাতীয় সংসদে ৩০০ বিধিতে দেওয়া এক বিবৃতিতে বিদ্যুৎ ও জ্বালানিমন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ জানান, আন্তর্জাতিক বাজারে বর্তমানে প্রতি লিটার ডিজেলের প্রকৃত ব্যয় প্রায় ১৯৮ টাকা। অর্থাৎ সরকার প্রতিটি লিটারে প্রায় ৯৮ টাকা ভর্তুকি দিচ্ছে। কেবল মার্চ থেকে জুন মাস পর্যন্ত ডিজেল ও অকটেন খাতে সরকারকে মোট ১৬ হাজার ৪৫ কোটি টাকা ভর্তুকি গুনতে হবে।

মন্ত্রীর মতে, কৃষি উৎপাদন ও সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রা স্বাভাবিক রাখতেই সরকার এই বিপুল লোকসান মেনে নিচ্ছে। তাঁর ভাষায়, “সংকটের সময় মানুষের পাশে দাঁড়ানোই রাষ্ট্রের প্রথম দায়িত্ব।” তিনি জানিয়েছেন, এপ্রিল মাসে ৫০ হাজার মেট্রিক টন অকটেন আমদানির পাশাপাশি দেশীয় উৎস থেকে আরও ৩০ হাজার মেট্রিক টন সরবরাহ পাওয়া যাবে। এতে দেশে অন্তত দুই মাসের অতিরিক্ত মজুত নিশ্চিত হবে।

মধ্যপ্রাচ্যের উত্তেজনার মধ্যেও বাংলাদেশ আগাম প্রস্তুতির মাধ্যমে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রেখেছে বলে তিনি দেশবাসীকে আশ্বস্ত করেন।

দুই লাখ ৬০ হাজার টন তেল আমদানির সিদ্ধান্ত

অভ্যন্তরীণ চাহিদা মেটাতে এবং আপৎকালীন মজুত গড়ে তুলতে সরকার জরুরি ভিত্তিতে বিপুল পরিমাণ জ্বালানি তেল আমদানির চূড়ান্ত অনুমোদন দিয়েছে। মঙ্গলবার বাংলাদেশ সচিবালয়ে অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরীর সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত সরকারি ক্রয় সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটির বৈঠকে দুই লাখ ৬০ হাজার টন তেল সরাসরি ক্রয় পদ্ধতিতে কেনার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।

এর মধ্যে কাজাখস্তান ও ইন্দোনেশিয়া থেকে এক লাখ ৬০ হাজার টন ডিজেল এবং মধ্যপ্রাচ্যের অস্থিরতা বিবেচনায় আবির ট্রেড অ্যান্ড গ্লোবাল মার্কেটস থেকে এক লাখ টন অপরিশোধিত তেল কেনা হবে। বৈঠক শেষে অর্থমন্ত্রী সাংবাদিকদের জানান, এই মুহূর্তে জ্বালানি তেল সরবরাহ নিশ্চিত করাই সরকারের সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার।

একই বৈঠকে রাশিয়ার একটি প্রতিষ্ঠান থেকে ৩৫ হাজার মেট্রিক টন এমওপি সার আমদানির প্রস্তাবও অনুমোদিত হয়, যা আসন্ন মৌসুমে কৃষি উৎপাদন নিশ্চিত করতে সহায়ক হবে।

অবৈধ মজুতের বিরুদ্ধে অভিযান ও নজরদারি

সরকার যখন বিপুল ভর্তুকি দিয়ে তেলের দাম নিয়ন্ত্রণ করছে, তখন একদল অসাধু চক্র কৃত্রিম সংকট তৈরির অপচেষ্টায় লিপ্ত হয়েছে বলে মঙ্গলবার সচিবালয়ে নিয়মিত প্রেস ব্রিফিংয়ে জানানো হয়েছে। এই অপতৎপরতা রুখতে গত ২৪ ঘণ্টায় দেশের ৬৪ জেলায় ৩৯১টি অভিযান চালিয়ে মোট ৮৭ হাজার ৭০০ লিটার অবৈধভাবে মজুত করা জ্বালানি তেল উদ্ধার করা হয়েছে।

এর মধ্যে ৬৭ হাজার ৪০০ লিটার ডিজেল, ১৩ হাজার ৮৫৬ লিটার পেট্রোল এবং ছয় হাজার ৪৪৪ লিটার অকটেন রয়েছে। অভিযানকালে ১৯১টি মামলায় জরিমানা আদায়ের পাশাপাশি সাতক্ষীরা, চাঁদপুর ও গাজীপুরে তিনজনকে বিভিন্ন মেয়াদে কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে।

গত শুক্রবার (২৭ মার্চ) নেওয়া এক সিদ্ধান্তের আলোকে সারা দেশে দুই হাজার ৩৯৩ জন সরকারি কর্মকর্তাকে ‘ট্যাগ অফিসার’ হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে, যারা প্রতিটি পেট্রোল পাম্পের সরবরাহ ও মজুত পরিস্থিতি নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করছেন বলেও সংবাদ সম্মেলনে জানানো হয়েছে।

সরকারের পক্ষ থেকে জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগের যুগ্মসচিব মনির হোসেন চৌধুরী সাংবাদিকদের আরও জানান, দেশে বর্তমানে তেলের কোনো সংকট নেই এবং পর্যাপ্ত মজুত রয়েছে।

বিদ্যুৎ সাশ্রয় ও নতুন শিক্ষাক্রমের পরিকল্পনা

জ্বালানি সংকটের এই সময়ে বিদ্যুৎ সাশ্রয়কে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিচ্ছে সরকার। মঙ্গলবার (৩১ মার্চ) সচিবালয়ে অনুষ্ঠিত এক উচ্চপর্যায়ের সমন্বয় সভায় বিদ্যুৎ সাশ্রয়ের লক্ষ্যে সাপ্তাহিক ছুটি তিন দিন করা এবং শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে অনলাইন ক্লাস চালুর বিষয়ে প্রাথমিক সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।

সভায় উপস্থিত শিক্ষক ও শিক্ষা বোর্ডের কর্মকর্তাদের সাথে আলোচনা শেষে আটটি সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা গ্রহণ করা হয়। মূলত সড়ক ও পরিবহনে জ্বালানির ব্যবহার কমাতে এবং বিদ্যুতের চাহিদা নিয়ন্ত্রণে রাখতেই এই পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে।

এই পরিকল্পনাগুলোর মধ্য থেকে কোনগুলো মাঠপর্যায়ে সরাসরি কার্যকর হবে, তা নিয়ে আগামী বৃহস্পতিবার (২ এপ্রিল ২০২৬) মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের সভায় চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হওয়ার কথা রয়েছে। এই পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে যেমন বিদ্যুৎ সাশ্রয় সম্ভব হবে, তেমনি বৈশ্বিক সংকটকালীন পরিস্থিতিতে দেশের অর্থনীতিকে আরও সহনশীল করে গড়ে তোলা যাবে বলে আশা করছেন নীতিনির্ধারকরা।

Share this article

আপনারা চাইলে কাস্টম বিজ্ঞাপন এইখানে দিতে পারেন
বিজ্ঞাপনের ছবি বা ভিডিও সাইজ ৩৩৬x২৮০ পিক্সাল হতে হবে

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Scroll to Top