ঋণের নামে লুট হওয়া সমস্যাগ্রস্ত পাঁচটি ইসলামী ব্যাংক নিয়ে গঠিত সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংকের আমানতকারীদের ওপর চাপিয়ে দেওয়া বিতর্কিত ‘হেয়ারকাট’ সিদ্ধান্ত থেকে আংশিক সরে এসেছে বাংলাদেশ ব্যাংক।
নতুন সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, এসব ব্যাংকের আমানতকারীরা গত দুই বছরের (২০২৪ ও ২০২৫) জন্য একেবারে রিক্ত হস্তে ফিরছেন না; বরং এই সময়ের জন্য চার শতাংশ হারে মুনাফা পাবেন। একীভূত হতে যাওয়া ব্যাংকগুলোর প্রশাসকদের কাছে বুধবার (২১ জানুয়ারি) পাঠানো এক চিঠির মাধ্যমে ব্যক্তিগত আমানতকারীদের মুনাফা দেওয়ার এই নির্দেশনা জানিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক।
ঢাকা স্ট্রিট জার্নাল (ডিএসজে) ‘একীভূত ৫ ব্যাংকে হেয়ারকাট প্রয়োগ নিয়ে প্রশ্ন’ শিরোনামে গত ১৮ জানুয়ারি প্রতিবেদনে জানিয়েছিল, রেজল্যুশন প্রক্রিয়ার নামে সাধারণ মানুষের আমানত থেকে মুনাফা ছেঁটে ফেলা বা ‘হেয়ারকাট’ করা আইনগত ও নৈতিকভাবে প্রশ্নবিদ্ধ।
ডিএসজে উল্লেখ করেছিল, শরীয়াহ অনুযায়ী ব্যবসায়িক স্বাভাবিক কারণে লোকসান হলে আমানতকারী তা বহন করতে বাধ্য। কিন্তু লোকসান যদি ব্যবস্থাপকের (ব্যাংক) অবহেলা, চুক্তি লঙ্ঘন বা প্রতারণার কারণে হয়, তবে শরীয়াহ অনুযায়ী সেই লোকসানের দায় সম্পূর্ণভাবে ব্যাংকের বা ব্যবস্থাপকের।
প্রতিবেদনটি প্রকাশের দুই দিন পর আমানতকারীদের তীব্র অসন্তোষের মুখে কেন্দ্রীয় ব্যাংক তাদের অবস্থান পরিবর্তনের সিদ্ধান্ত নিল। এর আগে ১৪ জানুয়ারি এক নির্দেশনায় তারা জানিয়েছিল, ১ জানুয়ারি ২০২৪ থেকে ২৮ ডিসেম্বর ২০২৫ পর্যন্ত সময়ের জন্য আমানতকারীদের কোনো মুনাফা দেওয়া হবে না। এই ‘জিরো প্রফিট’ নীতি বা ‘হেয়ারকাট’ নিয়ে ব্যাপক বিতর্ক তৈরি হয় এবং সাধারণ আমানতকারীদের মধ্যে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে।
সংশোধিত নির্দেশনা অনুযায়ী, এখন ব্যক্তিগত মেয়াদি ও স্কিমভিত্তিক আমানতকারীরা চার শতাংশ হারে বার্ষিক মুনাফা পাবেন। এর ফলে ২০২৫ সালের ২৮ ডিসেম্বর ভিত্তিক সব ব্যক্তিগত আমানত স্থিতি পুনরায় হিসাব করতে হবে এবং চার শতাংশ মুনাফা যুক্ত করতে হবে। যেসব আমানতে এরই মধ্যে চার শতাংশের বেশি মুনাফা দেওয়া হয়েছে, সেই অতিরিক্ত অর্থ গ্রাহকের ভবিষ্যৎ মুনাফা থেকে ধাপে ধাপে সমন্বয় করবে ব্যাংক।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নির্দেশনা অনুসারে, এই পুনঃহিসাবায়নের ফলে ব্যাংকের আর্থিক কাঠামোতে কী প্রভাব পড়বে, তা তিন কার্যদিবসের মধ্যে ব্যাংক রেজল্যুশন ডিপার্টমেন্টে জমা দিতে হবে।
বাংলাদেশ ব্যাংক সূত্র জানিয়েছে, নতুন সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংকের দীর্ঘমেয়াদি সক্ষমতা নিশ্চিত করা এবং গ্রাহকদের ক্রমবর্ধমান অসন্তোষ প্রশমিত করাই এই ইউ-টার্নের মূল কারণ। ব্যাংক কর্মকর্তারা মনে করছেন, হেয়ারকাট প্রক্রিয়ায় সাধারণ আমানতকারীদের স্বার্থ যেভাবে উপেক্ষা করা হয়েছিল, সংবাদমাধ্যমের চাপে কেন্দ্রীয় ব্যাংক তা মেরামতের চেষ্টা করছে।
যদিও চার শতাংশ হারে মুনাফা দেওয়ার সিদ্ধান্তকে স্বাগত জানানো হয়েছে, তবে অনেক গ্রাহক মনে করছেন এটি বর্তমান মূল্যস্ফীতির তুলনায় অত্যন্ত নগণ্য। তবুও সম্পূর্ণ মুনাফা হারানো থেকে আংশিক সুরক্ষা পাওয়ায় তারা কিছুটা স্বস্তি বোধ করছেন। তবে প্রাতিষ্ঠানিক আমানতের ক্ষেত্রে আগের কঠোর নির্দেশনাগুলো অপরিবর্তিত থাকছে।
সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংকের আর্থিক কাঠামো গঠনের অংশ হিসেবে এই মুনাফা পুনঃহিসাবায়ন প্রক্রিয়াটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বাংলাদেশ ব্যাংক বলেছে, এই নির্দেশনা কঠোরভাবে অনুসরণ করতে হবে। এর মাধ্যমে প্রশ্নবিদ্ধ ‘হেয়ারকাট’ প্রক্রিয়াটি কিছুটা নমনীয় রূপ পেল বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।













