এআইচালিত স্মার্টফোন কারখানা চালু; অবৈধ আমদানি দমনে অনড় সরকার

ছবি: বিএসএস, প্রেস রিলিজ ও ডিএসজে
ছবি: বিএসএস, প্রেস রিলিজ ও ডিএসজে

বাংলাদেশে স্মার্টফোন উৎপাদন শিল্পকে পুনরুজ্জীবিত করতে বৈধ স্থানীয় উৎপাদন সুরক্ষিত করতে চাইছে অন্তর্বর্তী সরকার। সে কারণে কঠোর নীতি পরিবর্তনের পথে এগোচ্ছে। এমনটা জানিয়েছেন মঙ্গলবার (২ ডিসেম্বর) ডাক, টেলিযোগাযোগ ও তথ্যপ্রযুক্তি মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বপ্রাপ্ত প্রধান উপদেষ্টার বিশেষ সহকারী ফয়েজ আহমদ তৈয়্যব।

তিনি বলেছেন, “দেশ এখন ডিজিটাল রূপান্তরের এক অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে আছে।” গাজীপুরের কালিয়াকৈর হাইটেক পার্কে বৈশ্বিক স্মার্টফোন ব্র্যান্ড অনারের এআই-প্রযুক্তিনির্ভর উৎপাদন কারখানাসহ তিনটি প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানের বাণিজ্যিক কার্যক্রম ও নির্মাণকাজ উদ্বোধন উপলক্ষে তিনি এ কথা বলেন।

অবৈধ স্মার্টফোন আমদানিতে যে ক্ষতি: ভুল নীতি ও অবৈধ আমদানির ফলে বাংলাদেশের স্মার্টফোন বাজারে বড় ধরনের ধস নেমেছে উল্লেখ করে ফয়েজ আহমদ তৈয়্যব বলেন, “২০২১ সালে দেশে ১০ বিলিয়ন ডলারের স্মার্টফোন বিক্রি হয়েছিল। আজ তা কমে প্রায় ৮ বিলিয়নে নেমে এসেছে, যার বড় অংশই অবৈধ আমদানি ও বাজারবিশৃঙ্খলার ফল।”

তিনি ঘোষণা দেন, আগামী ১৬ ডিসেম্বর থেকে জাতীয় যন্ত্রপাতি পরিচয় নিবন্ধন (এনইআইআর) সক্রিয় হবে, যা কালোবাজারে স্মার্টফোন আমদানি বন্ধে কেন্দ্রীয় ভূমিকা রাখবে। একইসঙ্গে আমদানি শুল্ক কাঠামো পুনর্বিবেচনা করে স্থানীয় উৎপাদনকে আরো প্রতিযোগিতামূলক করার লক্ষ্য রয়েছে সরকারের।

তবে সরকারের এই উদ্যোগকে কেন্দ্র করে দেশের মোবাইল ফোন ব্যবসায়ীরা সম্প্রতি আন্দোলন শুরু করেছে। সর্বশেষ গত ৩০ নভেম্বর ঢাকায় এক মানববন্ধন কর্মসূচিতে তারা বলেছে, কোনো প্রকার পূর্বপরামর্শ ছাড়াই হঠাৎ এনইআইআর প্রয়োগ হলে বাজারে ফোন সরবরাহ জটিল হবে এবং খুচরা বিক্রেতাদের ওপর আর্থিক চাপ বৃদ্ধি পাবে।

ব্যবসায়ীদের ভাষ্য, দেশের প্রায় ২৫ হাজার ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান এবং এর সঙ্গে জড়িত ২০ লাখেরও বেশি মানুষের জীবিকা হুমকির মুখে পড়েছে। বর্তমানে তাদের স্টকে কোটি কোটি টাকার হ্যান্ডসেট রয়েছে। আগামী ১৬ ডিসেম্বরের মধ্যে এ বিপুল পরিমাণ অবিক্রিত হ্যান্ডসেট বিক্রি করা অসম্ভব। তাদের দাবি না মেনে গুটিকয়েক ব্যবসায়ীকে একচেটিয়া ব্যবসার সুযোগ করে দিলে তারা পথে বসে যাবে।

তবে দেশে স্মার্টফোন ব্যবহারের হার এখনো মাত্র ৪১-৪৫ শতাংশ, যা দক্ষিণ এশিয়ার তুলনায় কম উল্লেখ করে ফয়েজ আহমদ তৈয়্যব বলেন, “সঠিক প্রণোদনা পাওয়া গেলে আগামী কয়েক বছরে এটি ৭০ এমনকি ৮০ শতাংশে উন্নীত হতে পারে। এজন্য যন্ত্রের সহজলভ্যতা, দক্ষ মানবসম্পদ তৈরি এবং বৈধ উৎপাদনকে উৎসাহ দেওয়া জরুরি।”

দক্ষতা বিনিময়, স্থানীয় জনবল উন্নয়ন এবং উদ্যোক্তা তৈরির ক্ষেত্রেও স্মার্ট ডিভাইস শিল্প একটি কৌশলগত খাত হয়ে উঠছে জানিয়ে তিনি বলেন, “অনারের নতুন কারখানাটি কর্মসংস্থান-বান্ধব, প্রযুক্তি স্থানান্তরকেন্দ্রিক এবং স্থানীয় সক্ষমতা বৃদ্ধির জন্য একটি বড় প্ল্যাটফর্ম হয়ে উঠবে।”

অনারের এআইচালিত কারখানার যাত্রা: বৈশ্বিক স্মার্টফোন ব্র্যান্ড অনার তাদের প্রথম বাংলাদেশি উৎপাদন ইউনিট চালু করেছে, যা সম্পূর্ণরূপ এআইচালিত স্বয়ংক্রিয় প্রযুক্তিতে পরিচালিত হবে। শুরুতে একটি লাইন দিয়ে প্রতিদিন ১,৫০০ ইউনিট সংযোজন হবে এবং এক বছরের মধ্যেই ৪টি উৎপাদন লাইন চালুর পরিকল্পনা রয়েছে। বিনিয়োগের পরিমাণ প্রায় ১২০ কোটি টাকা এবং প্রথম ধাপে ৮০০-১,০০০ কর্মসংস্থান সৃষ্টির লক্ষ্য রয়েছে। কারখানাটি স্থানীয় বাজারে ‘মেইড ইন বাংলাদেশ’ লেবেলযুক্ত অনার ডিভাইস সরবরাহ করবে।

অনার দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া অঞ্চলের প্রেসিডেন্ট জর্জ ঝেং বলেন, “এটি শুধু একটি কারখানা নয়—বৈশ্বিক প্রযুক্তিগত সক্ষমতা ও স্থানীয় দক্ষতার একটি কৌশলগত অংশীদারত্ব। আমরা নিরাপত্তা, স্থায়িত্ব ও নৈতিক উৎপাদনে সর্বোচ্চ মান বজায় রাখব।”

স্মার্ট টেকনোলজিসের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মোহাম্মদ জহিরুল ইসলাম বলেন, “স্থানীয় উৎপাদন শুরু হওয়ায় ব্যবহারকারীরা এখন আরও সাশ্রয়ী দামে অনারের স্মার্টফোন পাবে এবং বাংলাদেশ প্রযুক্তি-উৎপাদন কেন্দ্র হিসেবে নিজ অবস্থান আরও শক্ত করবে।”

কালিয়াকৈর, নতুন প্রযুক্তি উৎপাদন কেন্দ্র: একই অনুষ্ঠানে আরও দুটি প্রতিষ্ঠানের কার্যক্রম ঘোষণা করা হয়। একটি হেভেন্স লাইট প্রাইভেট লিমিটেড, যাদের ৫০ কোটি টাকার বিনিয়োগে স্মার্ট লাইটিং ব্যবস্থা উৎপাদনের পরিকল্পনা রয়েছে। যেখানে ৩০০-৪০০ মানুষ কাজ করবে। অন্য প্রতিষ্ঠানটি বাংলা কারস, যা হোসেন গ্রুপের একটি অঙ্গ প্রতিষ্ঠান। দেশীয় ব্র্যান্ডের গাড়ি উৎপাদনে ১৫০ কোটি টাকা বিনিয়োগ ও ৫০০ কর্মসংস্থানের লক্ষ্য রয়েছে।

বাংলাদেশ সংবাদ সংস্থার (বাসস) খবরে বলা হয়েছে, দেশের তথ্যপ্রযুক্তি শিল্পকে উৎপাদনভিত্তিক অর্থনীতির দিকে এগিয়ে নিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে গাজীপুরের কালিয়াকৈর হাইটেক পার্ক। বাংলাদেশ হাইটেক পার্ক কর্তৃপক্ষ (বিএইচটিপিএ)-এর প্রথম ও অন্যতম বৃহৎ প্রযুক্তি-উদ্যোক্তা অঞ্চল সম্পর্কে আইসিটি বিভাগের সচিব শীষ হায়দার চৌধুরী বলেন, “হাইটেক পার্ক ইতোমধ্যেই দেশের প্রযুক্তি উৎপাদন খাতের কেন্দ্রবিন্দু হয়ে উঠেছে।”

Share this article

আপনারা চাইলে কাস্টম বিজ্ঞাপন এইখানে দিতে পারেন
বিজ্ঞাপনের ছবি বা ভিডিও সাইজ ৩৩৬x২৮০ পিক্সাল হতে হবে

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Scroll to Top