দেশের শীর্ষস্থানীয় খাদ্য ও পানীয় উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান আকিজ ফুড অ্যান্ড বেভারেজ লিমিটেড (এএফবিএল) পুঁজিবাজার থেকে ৫০০ কোটি টাকা সংগ্রহের জন্য নিয়ন্ত্রক সংস্থা বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (বিএসইসি) থেকে চূড়ান্ত অনুমোদন পেয়েছে। আজ বুধবার (২৫ মার্চ) অনুষ্ঠিত কমিশনের সভায় এই অনুমোদন দেওয়া হয়।
প্রতিষ্ঠানের এই বিশাল অঙ্কের অর্থ সংগ্রহের মূল উদ্দেশ্য হলো তাদের বিদ্যমান ব্যাংক ঋণের বোঝা কমানো। ঢাকা স্ট্রিট জার্নাল বিএসইসি সূত্রে নিশ্চিত হয়েছে যে, বন্ডের মাধ্যমে সংগৃহীত এই অর্থ চারটি নির্দিষ্ট ব্যাংকের উচ্চ সুদের বকেয়া ঋণ পরিশোধে ব্যয় করা হবে। তবে বিনিয়োগকারীদের জন্য বন্ডটি ঠিক কত শতাংশ ডিসকাউন্টে বা কী মূল্যে ইস্যু করা হবে, তা বিএসইসি বা প্রতিষ্ঠানটির পক্ষ থেকে স্পষ্ট করা হয়নি।
বিনিয়োগকারীদের জন্য এই বন্ডের প্রকৃতি বা চরিত্র বোঝা অত্যন্ত জরুরি, কারণ এটি প্রচলিত সাধারণ বন্ডের মতো নয়। এটি একটি ‘জিরো কুপন বন্ড’, যার সহজ অর্থ হলো এই বিনিয়োগ থেকে আপনি নিয়মিত কোনো মাসিক বা বার্ষিক সুদের কিস্তি পাবেন না। সাধারণত অন্যান্য বন্ডে বিনিয়োগ করলে নির্দিষ্ট সময় পরপর সুদ পাওয়া যায়, কিন্তু জিরো কুপন বন্ডের ক্ষেত্রে লাভের পুরো অংশটিই পাওয়া যায় মেয়াদের শেষে। বিনিয়োগকারীকে এই বন্ডটি তার মূল দাম বা ফেস ভ্যালুর চেয়ে কম দামে (ডিসকাউন্টে) কিনতে হবে। উদাহরণস্বরূপ, ১০ লাখ টাকা ফেস ভ্যালুর একটি ইউনিট যদি এখন ৮ লাখ টাকায় কেনা হয়, তবে মেয়াদের শেষে বিনিয়োগকারী পুরো ১০ লাখ টাকাই ফেরত পাবেন। এই মাঝখানের ২ লাখ টাকাই হলো তার লভ্যাংশ।
এই বন্ডটির আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য হলো এটি ‘নন-কনভার্টিবল’ এবং ‘আনসিকিউরড’। নন-কনভার্টিবল হওয়ার অর্থ হলো, বিনিয়োগকারীরা মেয়াদের শেষে কেবল নগদ টাকাই ফেরত পাবেন; এই বন্ডের বিপরীতে আকিজ ফুড অ্যান্ড বেভারেজের কোনো সাধারণ শেয়ার পাওয়ার সুযোগ নেই। অর্থাৎ মালিকানায় কোনো অংশীদারত্ব তৈরি হবে না। অন্যদিকে, ‘আনসিকিউরড’ বা জামানতবিহীন হওয়ার অর্থ হলো—এই ৫০০ কোটি টাকার বিপরীতে কোম্পানি কোনো স্থাবর সম্পত্তি বা জমি বন্ধক রাখেনি। ফলে বিনিয়োগকারীদের সম্পূর্ণ আস্থা রাখতে হচ্ছে প্রতিষ্ঠানের আর্থিক সুনাম এবং ভবিষ্যতে নগদ প্রবাহ বা ক্যাশ-ফ্লোর ওপর। যদি কোনো কারণে প্রতিষ্ঠানটি আর্থিক সংকটে পড়ে, তবে মূলধন ফেরত পাওয়ার ক্ষেত্রে জামানত না থাকায় এক ধরণের ঝুঁকি থেকে যায়।
বন্ডটির ইউনিট মূল্য নির্ধারণ করা হয়েছে ১০ লাখ টাকা এবং এর মেয়াদ হবে ৬ মাস থেকে সর্বোচ্চ ৫ বছর পর্যন্ত। তবে এটি সাধারণ বিনিয়োগকারীদের জন্য উন্মুক্ত নয়। ‘প্রাইভেট প্লেসমেন্ট’-এর শর্তানুযায়ী, কেবল ব্যাংক, আর্থিক প্রতিষ্ঠান, বিমা কোম্পানি, প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারী এবং অত্যন্ত উচ্চ সম্পদশালী ব্যক্তিরাই এটি কিনতে পারবেন।
বন্ডটির ট্রাস্টি হিসেবে দায়িত্ব পালন করবে সেনা ইনস্যুরেন্স পিএলসি এবং ফান্ড অ্যারেঞ্জার হিসেবে কাজ করছে নর্থ স্টার ইনভেস্টমেন্টস (বিডি) লিমিটেড। আকিজ ফুড মূলত তাদের জনপ্রিয় ব্র্যান্ড যেমন স্পিড, মোজো, ফ্রুটিকা এবং ফার্ম ফ্রেশের মাধ্যমে বাজারে শক্তিশালী অবস্থানে থাকলেও, উচ্চ সুদের ব্যাংক ঋণ থেকে মুক্তি পেতেই তারা বাজার থেকে এই বিকল্প অর্থায়নের পথ বেছে নিয়েছে।
বাজার সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, আকিজ ফুড অ্যান্ড বেভারেজের মতো একটি লাভজনক প্রতিষ্ঠানের এই উদ্যোগ পুঁজিবাজারের দীর্ঘমেয়াদি অর্থায়নে ইতিবাচক প্রভাব ফেলবে। তবে যেহেতু এটি একটি জামানতবিহীন এবং শেয়ারে রূপান্তরযোগ্য নয় এমন বন্ড, তাই বড় অঙ্কের এই বিনিয়োগের আগে প্রতিষ্ঠানের বর্তমান আর্থিক স্বাস্থ্য এবং বন্ডের ‘ডিসকাউন্ট রেট’ বা প্রকৃত লাভের হার খতিয়ে দেখা প্রয়োজন। বিএসইসি এই বন্ডের অনুমোদন দিলেও বিনিয়োগের প্রকৃত মূল্য বা ক্রয়মূল্য গোপন থাকায় প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীদের মধ্যে কিছুটা কৌতূহল ও সতর্কতা দুই-ই বিরাজ করছে। শেষ পর্যন্ত উচ্চ সুদের ব্যাংক ঋণের বোঝা নামিয়ে এই বন্ড আকিজ ফুডের উৎপাদন ও বিপণন ব্যবস্থায় কতটা গতি আনে, সেটাই এখন দেখার বিষয়।











