ঋণ দেওয়ার ঝুঁকি কমাবে আগাম প্রভিশন

ডিএসজে
ডিএসজে

আর্থিক প্রতিবেদন তৈরির প্রক্রিয়াকে আন্তর্জাতিক মানে উন্নীত করতে বাংলাদেশ ব্যাংক একটি যুগান্তকারী পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে। আন্তর্জাতিক আর্থিক প্রতিবেদন মান বা আইএফআরএস-৯ অনুসরণে একটি নতুন ‘এক্সপেক্টেড ক্রেডিট লস’ (ইসিএল) বা প্রত্যাশিত ঋণ ক্ষতিভিত্তিক কাঠামো বাস্তবায়নের রোডম্যাপ ঘোষণা করেছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। এটি মূলত ব্যাংকগুলোর আর্থিক স্বচ্ছতা বৃদ্ধির একটি দীর্ঘমেয়াদি কৌশল।

এতদিন ব্যাংকগুলো ‘ইনকার্ড লস’ পদ্ধতিতে চলত। সহজ কথায়, কোনো ঋণ যখন খেলাপি হতো বা সমস্যাগ্রস্ত হতো, তখনই ব্যাংকগুলো তার বিপরীতে প্রভিশন বা নিরাপত্তা সঞ্চিতি রাখত। এই পদ্ধতিতে ঋণের ঝুঁকি অনেক দেরিতে নজরে আসত। কিন্তু নতুন আইএফআরএস-৯ পদ্ধতিতে ব্যাংকগুলোকে ঋণ দেওয়ার মুহূর্ত থেকেই এর ঝুঁকি বিশ্লেষণ করতে হবে এবং সম্ভাব্য ক্ষতির পূর্বাভাস ধরে আগাম প্রভিশন রাখতে হবে। এটি ঝুঁকি শনাক্ত করার একটি ‘প্রো-অ্যাক্টিভ’ বা দূরদর্শী ব্যবস্থা।

নতুন এই ব্যবস্থায় এখন আর ঋণ খারাপ হওয়ার জন্য অপেক্ষা করতে হবে না। নতুন নিয়মে ব্যাংকিং এক্সপোজার বা ঋণসমূহকে তিনটি ধাপে ভাগ করা হবে। প্রথম ধাপে থাকবে স্বাভাবিক ঋণ, যেখানে ১২ মাসের সম্ভাব্য ক্ষতির ভিত্তিতে প্রভিশন রাখতে হবে। দ্বিতীয় ধাপে যে ঋণের ঝুঁকি উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে, সেগুলোর জন্য পুরো মেয়াদের সম্ভাব্য ক্ষতির হিসাব ধরে প্রভিশন করতে হবে। আর তৃতীয় ধাপে থাকবে সেই ঋণগুলো যা ইতিমধ্যে ক্ষতিগ্রস্ত বা সমস্যাগ্রস্ত, সেগুলোর ক্ষেত্রেও পুরো মেয়াদের ক্ষতির ওপর ভিত্তি করে প্রভিশন নির্ধারণ করতে হবে।

নতুন পদ্ধতিতে ঋণ দেওয়ার সময় ব্যাংকগুলো কেবল ঋণগ্রহীতার অতীত রেকর্ড দেখবে না; বরং দেশের সামগ্রিক অর্থনীতির অবস্থাও বিবেচনায় নেবে। যেমন—জিডিপি প্রবৃদ্ধি, মূল্যস্ফীতি, সুদের হার এবং বাজারের সামগ্রিক প্রবণতা বিশ্লেষণ করে ঋণের ঝুঁকি পরিমাপ করা হবে। এতে করে দেশের অর্থনৈতিক পরিবর্তনের সাথে ব্যাংকের ঝুঁকি ব্যবস্থাপনার ভারসাম্য বজায় থাকবে। বর্তমানে অনেক ব্যাংক গ্যারান্টি বা অব্যবহৃত ক্রেডিট লাইনের মতো বিষয়গুলো সরাসরি ব্যালেন্স শিটে না থাকায় সেগুলোর ঝুঁকি অনেক সময় আড়ালে থেকে যায়। নতুন নিয়মে এসব ‘অফ-ব্যালেন্স শিট’ ঝুঁকির বিপরীতেও সম্ভাব্য ক্রেডিট লস হিসাব করতে হবে, যা ব্যাংকের প্রকৃত ঝুঁকির চিত্র তুলে ধরবে।

আন্তর্জাতিক মান অনুসরণ করায় ব্যাংকের আর্থিক প্রতিবেদনগুলোতে আরও স্বচ্ছতা আসবে, যা দেশি-বিদেশি বিনিয়োগকারী ও আমানতকারীদের আস্থা বাড়াবে। ব্যাংকগুলো এখন ঋণ বিতরণের ক্ষেত্রে আগের চেয়ে অনেক বেশি সতর্ক হবে, যা দীর্ঘমেয়াদে খেলাপি ঋণের সংস্কৃতি কমাতে সহায়ক হবে। এই কাঠামো বাস্তবায়নের জন্য ব্যাংকগুলোকে উন্নত ডেটা অ্যানালিটিক্স এবং আধুনিক ঝুঁকি মূল্যায়ন সফটওয়্যার ব্যবহার করতে হবে, যা পুরো খাতের আধুনিকায়নে ভূমিকা রাখবে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের ঘোষিত রোডম্যাপ অনুযায়ী, ২০২৮ সালের ১ জানুয়ারি থেকে সব তফসিলি ব্যাংকে এই নতুন কাঠামো কার্যকর হবে এবং ২০২৯ সাল থেকে এটি পূর্ণাঙ্গভাবে বাস্তবায়িত হবে। রূপান্তরের এই দীর্ঘ সময়ে কেন্দ্রীয় ব্যাংক ব্যাংকগুলোকে প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষণ, কারিগরি সহায়তা এবং তদারকির মাধ্যমে প্রস্তুত করে তুলবে। পরিশেষে, এই সংস্কারের মাধ্যমে বাংলাদেশের ব্যাংকিং খাত ঝুঁকি মোকাবিলার ক্ষেত্রে অনেক বেশি শক্তিশালী ও আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে আরও গ্রহণযোগ্য হয়ে উঠবে।

Share this article

আপনারা চাইলে কাস্টম বিজ্ঞাপন এইখানে দিতে পারেন
বিজ্ঞাপনের ছবি বা ভিডিও সাইজ ৩৩৬x২৮০ পিক্সাল হতে হবে

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Scroll to Top