ঋণখেলাপির সচিত্র পরিচয় প্রকাশের প্রস্তাব ব্যাংকারদের

ডিএসজে কোলাজ
ডিএসজে কোলাজ

বাংলাদেশের ব্যাংকিং খাতে দীর্ঘদিনের খেলাপি ঋণ সংস্কৃতি ভাঙতে ‘ইচ্ছাকৃত ঋণখেলাপিদের’ বিরুদ্ধে নজিরবিহীন কঠোরতার সুপারিশ করেছে ব্যাংকগুলোর প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তাদের সংগঠন অ্যাসোসিয়েশন অব ব্যাংকার্স, বাংলাদেশ (এবিবি)।

এক চিঠিতে খেলাপিদের নাম ও ছবি গণমাধ্যমে প্রকাশ, বিদেশ ভ্রমণে নিষেধাজ্ঞা, নির্বাচনে অযোগ্যতা এবং কারাদণ্ডের মেয়াদ উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়ানোর প্রস্তাব দিয়েছে সংগঠনটি।

সংগঠনের চেয়ারম্যান এবং সিটি ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও প্রধান নির্বাহী মাসরুর আরেফিন স্বাক্ষরিত ৪ ডিসেম্বরের এ-সংক্রান্ত চিঠিটি ৭ ডিসেম্বর গ্রহণ করেছে বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নরের কার্যালয়। যার প্রতিলিপি ডিএসজে প্রতিবেদকের হাতে রয়েছে।

এবিবি জানিয়েছে, আইনের কঠোর প্রয়োগ ও সামাজিক চাপ একসঙ্গে কার্যকর না হলে এই ‘দুর্বৃত্তচক্র’ ভাঙা সম্ভব নয়। সংগঠনটির মতে, বাংলাদেশে ঋণখেলাপিরা সামাজিকভাবে লজ্জিত হওয়ার বদলে অনেক ক্ষেত্রে প্রভাবশালী হিসেবে পরিচিতি পান। এই সংস্কৃতি বদলাতে তাদের সামাজিক মর্যাদায় আঘাত হানা জরুরি।

এবিবির প্রস্তাবনায় ইচ্ছাকৃত খেলাপিদের বিদেশ গমনের ওপর নিষেধাজ্ঞার পাশাপাশি কোনো ব্যবসায়ী সংগঠন, চেম্বার বা সামাজিক প্রতিষ্ঠানের নির্বাচনে অংশ নেওয়ার সুযোগ বন্ধের দাবি জানানো হয়েছে। এছাড়া রাষ্ট্রীয় বা সামাজিক বিশেষ সুবিধা ও সম্মাননা থেকে তাদের দূরে রাখার সুপারিশ করা হয়েছে। তাদের মতে, খেলাপিদের জীবনযাত্রায় দৃশ্যমান প্রভাব না পড়লে আইনি ব্যবস্থার ভয় তৈরি হয় না।

আইনগত সংস্কারের দাবিতে এবিবি জানায়, বর্তমান অর্থঋণ আইনে খেলাপিদের দেওয়ানি আটকাদেশের সর্বোচ্চ মেয়াদ মাত্র ৬ মাস, যা কার্যত অকার্যকর। ঋণের পরিমাণ ও প্রকৃতি অনুযায়ী এই মেয়াদ সর্বোচ্চ ৭ বছর পর্যন্ত বাড়ানোর প্রস্তাব দিয়েছে তারা । একই সঙ্গে ক্রেডিট ইনফরমেশন ব্যুরোর (সিআইবি) রিপোর্টের বিরুদ্ধে উচ্চ আদালতে ঢালাও স্থগিতাদেশ দেওয়ার সুযোগ সীমিত বা রহিত করার আহ্বান জানানো হয়েছে ।

বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ব্যাংক ম্যানেজমেন্টের (বিআইবিএম) অধ্যাপক ড. শাহ মো. আহসান হাবিব মনে করেন, ঋণ না দিলে জেল হবে—এমন দৃষ্টান্ত না থাকায় খেলাপিদের মধ্যে কোনো ভীতি তৈরি হচ্ছে না। “এটি একটি সমষ্টিগত কাঠামোগত ব্যর্থতা। দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি ছাড়া খেলাপি ঋণ কমানোর সব নীতিই কাগজে-কলমে সীমাবদ্ধ থাকবে,” ডিএসজে প্রতিবেদককে বলেন তিনি।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে একাধিক ব্যাংকের কর্মকর্তারা কথা বলেছেন এই বিষয়টি নিয়ে। তারা জানান, চীন ও ভারতের মতো দেশগুলোতে ঋণখেলাপিদের বিরুদ্ধে অত্যন্ত কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হয়। চীনে খেলাপিদের নাম-ছবি বিলবোর্ডে প্রকাশসহ বিমান ও বুলেট ট্রেনে ভ্রমণে নিষেধাজ্ঞা রয়েছে বলেও উল্লেখ করেন। ভারতেও নতুন ঋণ গ্রহণ ও কোম্পানির পরিচালক হওয়ার ক্ষেত্রে অযোগ্য ঘোষণা করার বিধান আছে।

তাদের মতে, বাংলাদেশেও এমন কঠোর ‘ডিটারেন্স’ বা ভয়ের সংস্কৃতি তৈরি না হলে সাধারণ আমানতকারীদের অর্থ ঝুঁকির মুখেই থেকে যাবে।

মাসরুর আরেফিনের স্বাক্ষরিত এবিবির পত্রে নিলামের মাধ্যমে দ্রুত পাওনা আদায়ে ব্যাংক কর্তৃক ক্রয় বা হস্তান্তরকৃত সম্পত্তির ওপর থেকে সব ধরনের আয়কর ও ভ্যাট প্রত্যাহারেরও দাবি জানানো হয়েছে।

এছাড়া জালিয়াতি রোধে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের মাধ্যমে অনুমোদিত ভূমি জরিপকারী ও মূল্যায়নকারীর তালিকা প্রকাশ এবং সিআইবি ডাটাবেজের মতো বন্ধকি সম্পদের একটি কেন্দ্রীয় ডাটাবেজ তৈরির প্রস্তাব করা হয়েছে।

এবিবির প্রত্যাশা, এসব পদক্ষেপ গ্রহণের মাধ্যমে দেশের ব্যাংকিং খাতে স্বচ্ছতা ও গতিশীলতা ফিরে আসবে।

Share this article

আপনারা চাইলে কাস্টম বিজ্ঞাপন এইখানে দিতে পারেন
বিজ্ঞাপনের ছবি বা ভিডিও সাইজ ৩৩৬x২৮০ পিক্সাল হতে হবে

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Scroll to Top